Published : 26 May 2026, 06:31 PM
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ক্ষমতার চাকা দীর্ঘদিন ধরে মন্ত্রণালয়, দূতাবাস আর পার্লামেন্ট ভবন ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। তবে এর বাইরেও আরেকটি জায়গা ছিল শতবর্ষের আভিজাত্য আর ইতিহাসের মস্ত বড় এক দলিল হয়ে, সেটি হল দিল্লির প্রভাবশালী ‘জিমখানা ক্লাব’।
সফদরজং রোডে এই বিলাসবহুল ক্লাবটি দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল, জ্যেষ্ঠ আমলা এবং পুরোনো ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর এক গোপন জগৎ হিসেবে কাজ করে আসছে।
হুইস্কি আর কাবাবের টেবিলে বসেই এখানে চলে নানা আলোচনা। দিল্লির সাধারণ বাসিন্দা, যাদের সিংহভাগেরই এই ক্লাবে ঢোকার সুযোগ হয়নি, তারাও এই ক্লাবের জাঁকজমক ও আভিজাত্যের গল্প শুনে বড় হয়েছেন।
তবে ১১৩ বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটির ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ক্লাব কর্তৃপক্ষকে জমি ছাড়ার নির্দেশ গত সপ্তাহেই দিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। আগামী ৫ জুনের মধ্যে জায়গাটি খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ২৭ দশমিক ৩ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবের জমিটি এখন ‘প্রতিরক্ষা অবকাঠামো মজবুত করা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ জননিরাপত্তার কাজে প্রয়োজন।
সরকারের নোটিশে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘লোককল্যাণ মার্গ’-এর কাছের এই ক্লাব এলাকাটিকে ‘অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং কৌশলগত’ জোন হিসেবে উল্লেখ করে জাতীয় নিরাপত্তার খাতিরে অবিলম্বে এর ইজারা বা লিজ বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
গত ২২ মে ভারতের আবাসন ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ‘ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট’ কার্যালয়ের পাঠানো নোটিসে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট দিনে ও সময়ে শান্তিপূর্ণভাবে জমির হস্তান্তর না করা হলে ক্লাব কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কড়া আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মূল ইজারা বা লিজ চুক্তির ৪ নম্বর ধারায় এই পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্র সরকার।
কূটনীতিক থেকে শুরু করে আমলা, শিল্পপতি এমনকী সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্তাদের অনেকেরই এই ঐতিহ্যবাহী ক্লাবে যাতায়াত আছে। বর্তমানে তাদের প্রায় ১৪ হাজার সদস্য রয়েছেন বলে দাবি ক্লাবের।
পাশাপাশি এখানে প্রায় ৫০০ কর্মী কাজ করে। নিয়মিত সাংস্কৃতিক এবং খেলাধুলোর আয়োজন করা হয়। হঠাৎ জমি নিয়ে নিলে তারা সবাই বিপাকে পড়বেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ক্লাব কর্তৃপক্ষ।
সরকার পক্ষের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে এরই মধ্যে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন ক্লাবের সদস্যরা, যার শুনানি মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়েছে। ক্লাবের সদস্যদের করা আবেদনের প্রেক্ষিতে কেন্দ্র সরকার আদালতকে আশ্বস্ত করেছে যে, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা ছাড়া পুলিশ পাঠিয়ে জোর করে কোনও উচ্ছেদ বা দখলদারিত্ব চালানো হবে না।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দিল্লির অভিজাত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কড়া নজরদারি শুরু করে। জিমখানা ক্লাবকে দেওয়া এই উচ্ছেদ নোটিশটি এখন দিল্লির সাধারণ মানুষের অধিকার, ঐতিহ্য এবং অভিজাততন্ত্রের সুবিধা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
একই সঙ্গে এটি দিল্লির বাসিন্দাদের মধ্যে এক ধরণের নস্টালজিয়া তৈরি করেছে, যার ফলে অনেকে এই ক্লাবের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করছেন, যারা এর আগে ক্লাবটির অভিজাত্য ও নিয়ন্ত্রিত প্রবেশাধিকারের সমালোচনা করতেন বা ঘৃণার চোখে দেখতেন।
জিমখানা ক্লাবের সদস্য হওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল, তবে এখানে প্রবেশাধিকারের বিষয়টি টাকার চেয়েও বেশি নিয়ন্ত্রিত হতো কঠোর ‘গেটকিপিং’ বা ভেতরের যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে। নতুন কাউকে সদস্য হতে হলে পুরোনো সদস্যদের সুপারিশ লাগে, যা মূলত জ্যেষ্ঠ আমলা এবং সামরিক কর্মকর্তাদেরই বেশি সুবিধা দিয়ে আসছিল।
সমালোচকদের মতে, এই নিয়মটি সমাজে এক ধরণের বৈষম্য টিকিয়ে রেখেছে। যদিও এটিই জিমখানাকে দিল্লির সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সদস্যপদে পরিণত করেছে।
তবে অনেকেই মনে করেন, এই জায়গাটি কিছু ছোট ছোট রীতিনীতির মধ্য দিয়ে দিল্লির পুরোনো অভিজাত অতীতকে বাঁচিয়ে রেখেছিল: যেমন গোধূলিলগ্নে উর্দি পরা ওয়েটারদের পরিবেশন, ছায়াঘেরা বারান্দায় বসে জিন ও লাইম (লেবুর রস) খাওয়া, কিংবা নিম গাছের তলায় অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ও কূটনীতিকদের অলস আড্ডা।
দিল্লির একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, যার কোনোদিন এই ক্লাবের সদস্যপদ ছিল না, তিনি বিবিসি-কে বলেন, “ক্লাবটিকে সবসময় ধরাছোঁয়ার বাইরের কিছু মনে হতো। কিন্তু এখন আমার একবার ভেতরে গিয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে। কারণ বাইরের পুরো দিল্লি শহরটা সম্পূর্ণ বদলে গেলেও এটি দিল্লির এমন একটি কাঠামো যা এখনো পুরোপুরি অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।”
জিমখানা ক্লাবের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯১১ সালে ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় দিল্লিতে। এরপর ১৯১৩ সালে ইংরেজ কর্মকর্তাদের আমোদ-প্রমোদের জন্য ক্লাবটি তৈরি করা হয়েছিল। এর নাম ছিল ইম্পেরিয়াল দিল্লি জিমখানা ক্লাব লিমিটেড। ডিজাইন করেছিলেন ব্রিটিশ স্থপতি রবার্ট টি রাসেল।
স্বাধীনতার পর ইম্পেরিয়াল বাদ দিয়ে নাম হয় দিল্লি জিমখানা ক্লাব। সেই সময়ে ক্লাব কর্তৃপক্ষকে পারপেচুয়াল লিজ বা কার্যত অনির্দিষ্টকালের জন্য জমি দিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। তবে মালিকানা ছিল সরকারের হাতেই। ১৯২৮ সালে সফদরজং রোডের বর্তমান জায়গাটি ক্লাবটিকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।
কেবল আভিজাত্যই নয়, ক্লাবটির পরতে পরতে জড়িয়ে আছে ইতিহাস। এই ক্লাব সাক্ষী থেকেছে দেশভাগের এক বড় অধ্যায়েরও। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় ভারত ও পাকিস্তানের সীমানা যখন চূড়ান্ত হচ্ছে, তখন এই ক্লাবের লনেই দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো আড্ডায় একে অপরকে অশ্রুসজল চোখে বিদায় জানিয়েছিলেন হিন্দু, মুসলিম ও শিখ রেজিমেন্টের সেনা কর্মকর্তারা।
তাছাড়া ২০১৩ সালে ক্লাবের শতবর্ষ উদযাপনে এসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি স্মরণ করেছিলেন যে, মহাত্মা গান্ধী এবং ভারতের তত্কালীন ভাইসরয় লর্ড আরউইন এই ক্লাবেই গোপনে বৈঠক করেছিলেন, যা পরবর্তীতে ঐতিহাসিক ‘গান্ধী-আরউইন চুক্তি’ নামে পরিচিতি পায়।
২০১৪ সালে ভারতে নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজধানী দিল্লির ইংরেজি জানা উচ্চবিত্ত বা অভিজাতদের হাত থেকে ক্ষমতা সরানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এরপর থেকেই জিমখানা ক্লাবের ওপর চাপ বাড়তে থাকে।
২০১৬ ও ২০১৯ সালে ক্লাবটি খতিয়ে দেখার পর ২০২০ সালে সরকারের একটি ট্রাইব্যুনাল সেখানকার আর্থিক অনিয়ম ও সদস্যপদের নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে। ২০২২ সালে ট্রাইব্যুনাল ক্লাবের নির্বাচিত কমিটি ভেঙে দিয়ে সেখানে সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করে। ক্লাবের অনেক সদস্যই এ পদক্ষেপের সমালোচনা করেন। এবার সর্বশেষ কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্ছেদ আদেশ নিয়ে দিল্লির রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে।
মোদীর দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী ও শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা কিরণ বেদি এই সিদ্ধান্তকে ‘দুর্ভাগ্যজনক এবং বেদনাদায়ক’ বলে অভিহিত করেছেন। ঐতিহাসিক স্বপ্না লিডল বলেছেন, ক্লাবটি বন্ধ না করে এটিকে আরও বেশিসংখ্যক মানুষের জন্য উন্মুক্ত করার সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া যেত।
তবে অনেকেই আবার ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। যেমন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক প্রভু চাওলা জিমখানার মতো ক্লাবগুলোর সমালোচনা করে বলেছেন, এগুলো আসলে বিপুল সরকারি ভর্তুকির জমিতে গড়ে ওঠা সাধারণ মানুষকে বাদ দিয়ে চলা নির্দিষ্ট এক্সক্লুসিভ প্রতিষ্ঠান।
অন্যদিকে, সাবেক কূটনীতিক কেসি সিং বলেন, এই ধরনের ক্লাবগুলো অতীতে সরকারি কর্মকর্তাদের সীমিত বেতনের মধ্যেও বিনোদনের একটি সাশ্রয়ী সুযোগ করে দিত।
তবে বিজেপির মুখপাত্র আরপি সিং এই বৈষম্যের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “এটি সরকারের লিজ দেওয়া সম্পত্তি এবং সবকিছু আইন মেনেই করা হচ্ছে।”
আইনি ও রাজনৈতিক যুক্তির বাইরেও দিল্লির সাধারণ মানুষের মনে এই ক্লাবটি নিয়ে এক ধরণের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।
বিগত কয়েক দশকে দিল্লির অনেক পুরোনো স্মৃতি বিজড়িত জায়গা, যেমন রিগাল সিনেমা, পুরোনো কফি হাউস কিংবা দরিয়াগঞ্জের উর্দু বইয়ের দোকানগুলো হারিয়ে গেছে।
জিমখানা ক্লাবটি এতকাল ঔপনিবেশিক শাসন, রক্তক্ষয়ী দেশভাগ, স্বাধীনতার তুমুল উত্তেজনা এবং দিল্লির মেগাসিটিতে রূপান্তরের পরও টিকে ছিল।
যদি শেষ পর্যন্ত ক্লাবটি তার ঠিকানা হারিয়ে ফেলে, তবে হয়ত দিল্লিতে আরও নতুন ক্লাব, আধুনিক হোটেল আর জাঁকজমকপূর্ণ রেস্তোরাঁ গড়ে উঠবে, কিন্তু পুরনো দিল্লির সেই চিরচেনা রূপটি এবং শেষ অধ্যায়টি চিরতরে হারিয়ে যাবে।