Published : 09 Nov 2025, 10:29 PM
পাকিস্তান সরকার ২৭তম সংবিধান সংশোধনী বিল এনেছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়ার পর রোববার বিলটি নয়ে পাকিস্তানের সিনেট এবং জাতীয় পরিষদের আইন ও ন্যায়বিচার বিষয়ক কমিটি ইসলামাবাদে আলোচনা করেছে।
সংশোধনী এই বিলে নতুন সাংবিধানিক আদালত গঠন,উচ্চ আদালতের বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের মতো বিষয়গুলো ছাড়াও সামরিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ভারতের সঙ্গে বরাবরই উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান মূলত এই বিলের মধ্য দিয়ে তাদের সামরিক কমান্ডের সাংবিধানিক ভিত্তিই জোরদার করতে চাইছে। সেকারণে বিলটিতে মূল বিষয় হিসাবে উঠে এসেছে সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্ব কাঠামোয় পরিবর্তনের প্রস্তাব, যা নিয়ে ঘোর বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।
খসড়া বিলটিতে সংবিধানের ২৪৩ অনুচ্ছেদে সংশোধন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে বর্তমানে বলা আছে ‘সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্ব ফেডারেল সরকারের হাতে থাকবে এবং সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ড প্রেসিডেন্টের হাতে ন্যস্ত থাকবে’।
প্রস্তাবিত সংশোধনী বিলে ‘চেয়ারম্যান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি’ (সিজেসিএসসি) পদ বিলুপ্ত করে নতুন পদ ‘চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস’ (সিডিএফ) সৃষ্টির প্রস্তাব করা হয়েছে।
এই পরিবর্তনের ফলে বর্তমানে যিনি চিফ অফ আর্মি স্টাফ বা সেনাবাহিনীর প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন, তিনিই সংবিধানস্বীকৃত নতুন এই পদের দায়িত্বে আসীন হবেন।
ফলে তিনিই একসঙ্গে সামরিক বিভাগের সব বাহিনী পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে যাবেন, হয়ে উঠবেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।
পাকিস্তানের পত্রিকা ‘দ্য ডন’ জানায়, চার দশক ধরে‘ চেয়ারম্যান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি’ (সিজেসিএসসি) সশস্ত্র বাহিনীর প্রতীকী প্রধান হিসাবে কাজ করে এসেছে, যাতে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা যায়।
প্রয়োগিক দিক থেকে এই পদের ভূমিকা ছিল অনেকটাই অলঙ্কারিক। সামরিক বাহিনীতে আড়াইদশক ধরে অন্যান্য শাখায় এর পালাবদলের কোনও তাগিদ ছিল না।
এখন প্রস্তাবিত সংশোধনী বিলটি পাস হলে এবছর ২৭ নভেম্বরের মধ্যেই বিলুপ্ত হবে এই পদ। আবার একই সময়ের মধ্যে সিজেসিএসসি পদে থাকা জেনারেল শের শামশাদ মির্জাও অবসরে যাচ্ছেন।
ফলে পাকিস্তানের চিফ অব আর্মি স্টাফ একইসঙ্গে হয়ে উঠবেন চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস অর্থাৎ, প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান। সেনা, নৌ ও বিমান- তিন বাহিনীই তখন চলে আসবে তার কর্তৃত্বে।
বিলের সমালোচকরা একে প্রতিষ্ঠানিক দখলদারিত্ব আখ্যা দিচ্ছেন। অবসারপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিফ ইয়াসিন মালিক সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “একজন সেনা কর্মকর্তাকে বিমান এবং নৌ বাহিনীর ওপর কর্তৃত্ব দিয়ে প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান করার প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করবে এবং বিপর্যয় ডেকে আনবে।”
তার কথায়, “প্রতিরক্ষা কাঠামোকে শক্তিশালী করা নয়, বরং একজন বিশেষ ব্যক্তিকে সুবিধা দিতে এই সংশোধনী আনা হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে।”
নতুন বিল পাস হলে আরও যেসব পরিবর্তন আসবে তা হল- এর আওতায় চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস এর সুপারিশে প্রধানমন্ত্রী ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড’ এর কমান্ডার নিয়োগ দেবেন।
কমান্ডার অফ ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড পদে যিনি থাকবেন, তিনি দেশের পরমাণু এবং কৌশলগত সম্পদে নজরদারি করবেন।
তাছাড়া, ফিল্ড মার্শাল, মার্শাল অফ দ্য এয়ার ফোর্স এবং অ্যাডমিরাল অফ দ্য ফ্লিটের মতো সেনাবাহিনীর পাঁচ তারকা পদে থাকা কর্মকর্তারা ‘জাতীয় বীরের’ মর্যাদা পাবেন।
তারা আজীবন সুবিধা পাবেন। তাদের উপাধিও আজীবন বহাল থাকবে। ২৪৮ অনুচ্ছেদের আওতায় এই কর্মকর্তারা প্রেসিডেন্টের মতো ফৌজদারি মামলা বা গ্রেপ্তারি থেকে অব্যাহতি পাবেন।
কেবলমাত্র পার্লামেন্টে অভিশংসনের মতো পদক্ষেপের মধ্য দিয়েই তারা পদ থেকে অপসারিত হতে পারেন। মেয়াদ শেষে রাষ্ট্রের স্বার্থে এই কর্মকর্তাদের ভবিষ্যৎ দায়িত্ব সরকার নির্ধারণ করবে।
অন্যদিকে, বিচার ব্যবস্থারক্ষেত্রে সংশোধনী বিল অনুযায়ী, ‘ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্ট’ নামের নতুন আদালত গঠিত হবে। যেখানে সব প্রদেশের সমান প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
বিচারপতি নিয়োগে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা থাকবে। এছাড়া, বিচারপতিদের মেয়াদ, সংখ্যা নির্ধারণসহ প্রেসিডেন্টের আদেশ নিয়েও একাধিক প্রস্তাব রয়েছে বিলে।