Published : 26 Apr 2026, 08:45 AM
প্রায় থেমে যাওয়া ইরান ও লেবানন যুদ্ধ আবার যখন শুরু হয়েছে, তখন তা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে জনমতের ‘চাপ’ তৈরি হয়েছে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর।
কিন্তু এ যুদ্ধের ফলাফল শেষ পর্যন্ত নেতানিয়াহু নির্ধারণ করতে পারবেন? ইসরায়েলের বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যা চাইবেন তাই হবে।
শুক্রবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা লিখেছে, অনিশ্চয়তার মধ্যেই ইরানের সঙ্গে আরেক দফা শান্তি আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার পাকিস্তান যাচ্ছেন। কিন্তু সে আলোচনায় ইসরায়েলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প তার দূতদের পাকিস্তান সফর বাতিল করেছেন।
অন্যদিকে ট্রাম্প লেবানন-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ তিন সপ্তাহ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন, যদিও ইসরায়েল একাধিকবার সেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, লেবানন ও ইরানের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রভাব তার অংশীদার ইসরায়েলের চেয়ে বেশি।

যদিও ইসরায়েলের নেতৃত্ব–বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন যে ইরান ও তাদের মিত্র লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।
গত বছর জুনে যুদ্ধ ১২ দিন স্থায়ী হয়। আর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানের ওপর হামলা শুরুর পর প্রায় দুই মাস হয়ে গেছে। কিন্তু ইরানকে নতি স্বীকার করাতে পারেনি।
দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত বাড়িয়েছেন ট্রাম্প। ফের শান্তি আলোচনা শুরু করার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি পাকিস্তানের ইসলামবাদে পৌঁছেছেন।
কিন্তু বহু বছর ধরেই ইরান ও লেবানন যুদ্ধের পক্ষে নেতানিয়াহুর অবস্থান। কিন্তু সেই যুদ্ধের ফলাফল এখন তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তাদের মতে, নেতানিয়াহু ইসরায়েলি জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ইরানে ‘আয়াতুল্লাহ শাসনব্যবস্থা’ থেকে হুমকির অবসান ঘটাবেন এবং চূড়ান্তভাবে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করবেন। কিন্তু এখন লেবাননের সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতির আলোচনা এবং ইরানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার ক্ষেত্রে ডনাল্ড ট্রাম্পের জোরালো অবস্থান ইসরায়েলি জনগণের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইসরায়েল সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেবি বলেন, “ইরান ও লেবাননের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনকে প্রভাবিত করার নেতানিয়াহুর চেষ্টা ছিল কিছুটা অহংকারপ্রসূত এবং সুযোগসন্ধানী। তবে এতে খুব বেশি বিস্ময়ের কিছু নেই।”
গাজায় ইসরায়েলের অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থনের সঙ্গে তুলনা করে তিনি এই মন্তব্য করেছেন।
বর্তমানে ইসরায়েলের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত লেবি বলেন, ওয়াশিংটনের ওপর প্রভাব বিস্তার কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে পুরো অঞ্চলকে কব্জায় রাখার সক্ষমতা নিয়ে নেতানিয়াহু তার নিজের প্রচারে অতিরিক্ত আস্থাবান হলেও বাস্তবে তা ঘটেনি।
যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে জনমত
আল জাজিরা লিখেছে, হিজবুল্লাহ ও ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পুরোপুরি দুর্বল না হওয়ায় ট্রাম্পের ঘোষিত দুই যুদ্ধবিরতি নেতানিয়াহুকে দেশের ভেতর রাজনৈতিক চাপে ফেলেছে।
লেবাননের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েকদিন আগে ‘ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট’ এর এক জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ ‘ইহুদি ইসরায়েলি’ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে, এমনকি এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েন তৈরি হলেও।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতিও ইসরয়েলের মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। জেরুজালেমের হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা যায়, দুই-তৃতীয়াংশ ইসরায়েলি এই যুদ্ধবিরতির বিরুদ্ধে।
মার্কিন-ইসরায়েলি রাজনৈতিক পরামর্শক ও জরিপ বিশ্লেষক ডালিয়া শেইন্ডলিন বলেন, তিনি মনে করেন যে ইসরায়েলিরা, ‘ইহুদি ইসরায়েলিরা’ ইরান ও লেবাননকে সেই কাতারেই ফেলে যে ‘সব শত্রুই ইসরায়েলের বিপক্ষে’।
সাংবাদিক শেইন্ডলিন বলেন, “আমরা নিজেদের এমন এক অঞ্চলে বসবাসকারী মনে করি, যেখানে চারদিকেই শত্রু ঘিরে আছে—এটি ইসরায়েলিদের সামগ্রিক আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে।”
তিনি বলেন, পরিস্থিতির ওপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, এমন জনআস্থা কম। বিশেষ করে একজন খামখেয়ালি মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রভাবে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হতে পারে, এই শঙ্কা তাদের মধ্যে আছে।
শেইন্ডলিনের ভাষায়, “যুক্তরাষ্ট্র অনেক বেশি শক্তিশালী অংশীদার। তাই ইসরায়েলিদের মধ্যে এই ধারণা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে যে শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনই ঘটনাপ্রবাহ নির্ধারণ করবে। ইসরায়েলের প্রভাব থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তার হাতে নেই।”
নেতানিয়াহুর সমালোচকরা
লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর সাবেক সেনাপ্রধান ও মধ্যপন্থী ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকট বলেন, গত আড়াই বছরে ইসরায়েলের ওপর ‘চাপিয়ে দেওয়া’ যুদ্ধবিরতিগুলোর ধারাবাহিকতাই এটি।
যদিও সমালোচকদের মতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে কমই সংযত করেছে, বরং অনেক ক্ষেত্রে হামলায় সমর্থন দিয়েছে। আইজেনকট বেশি জোর দিয়েছেন নেতানিয়াহুর ব্যর্থতার ওপর। তিনি বলছেন, সামরিক সাফল্যকে কূটনৈতিক অর্জনে রূপ দিতে পারেননি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
বিরোধী নেতা ইয়াইর লাপিদও সমালোচনা করে সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, “এবারই প্রথম নয়, এই সরকারের সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবতার মুখে ভেঙে পড়ছে।”
সাবেক ইসরায়েলি কূটনীতিক অ্যালন পিঙ্কাস বলেন, “ইরানের শাসনব্যবস্থা বহাল রয়েছে, ইউরেনিয়াম সে দেশেই আছে এবং আইআরজিসি (ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর) আগের চেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চান।”
তার মতে, সামরিক সাফল্য অর্জন হয়ে থাকলেও, এটি ইসরায়েলের জন্য কৌশলগত পরাজয়ের ইঙ্গিত দেয়।
“ট্রাম্প আদৌ নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ নিয়ে কতটা চিন্তিত, তা স্পষ্ট নয়,” বলেন পিঙ্কাস।
তিনি বলেন, ট্রাম্পকে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছেন নেতানিয়াহু, এ ধরনের খবর সামনে আসার পর তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রাজনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারেন।
“তিনি (ট্রাম্প) ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে চান, এ চুক্তির ফলে ইসরায়েল ক্ষতিগ্রস্ত হলেও আমার ধারণা তিনি তা মেনে নেবেন।”