আওয়ামী লীগ-বিএনপি দেখতে চাই না, ঢাকাকে ঠিক করব নাগরিক হিসেবে: মির্জা ফখরুল
তার উপলব্ধি, "আমরা এখনো পুরোপুরি নগর-নাগরিক হয়ে উঠতে পারিনি।"
ঢাকাকে সুন্দর ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে নাগরিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তিনি বলেছেন, "আমরা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি বা জামায়াত ইসলামী দেখতে চাই না। আমি বাংলাদেশকে দেখতে চাই, ঢাকার নাগরিক হিসেবে দেখতে চাই। আমরা ঢাকাকে ঠিক করব নাগরিক হিসেবে।"
বুধবার সকালে গুলশানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নগর ভবনে আয়োজিত ‘নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: আমার আপনার সকলের দায়িত্ব’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন বিএনপি মহাসচিব ফখরুল।
তিনি বলেন, রাজধানীর বর্তমান সংকট একদিনের নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হওয়ায় বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আসে। এর ফলে নগরে একই সঙ্গে শহুরে ও গ্রামীণ সংস্কৃতির মিশ্রণ তৈরি হয়েছে।
তার উপলব্ধি, "আমরা এখনো পুরোপুরি নগর-নাগরিক হয়ে উঠতে পারিনি।"
শহর পরিষ্কার রাখতে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, মানুষের মানসিকতার পরিবর্তনের ওপরও জোর দেন মির্জা ফখরুল।
বিদেশের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে মানুষ নিজেরাই নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলে। বাংলাদেশেও স্কুল পর্যায় থেকে শিশুদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতার শিক্ষা গড়ে তুলতে হবে।
নাগরিকদের দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “শুধু সরকার একা পারবে না। নাগরিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। আমি যদি দেখি কেউ রাস্তায় ময়লা ফেলছে, তাকে ভদ্রভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে।”
ঢাকাকে সুন্দর নগরী হিসেবে গড়ে তোলা যে কেবল সিটি করপোরেশনের একার পক্ষে সম্ভব নয়, সেই বাস্তবতা তুলে ধরে রাজউক, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার তাগিদ দেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী।
তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনকে যদি কার্যকর ‘নগর সরকারে’ পরিণত করা না যায়, তাহলে ঢাকার সমস্যার স্থায়ী সমাধান সহজ হবে না।
বর্ষা মৌসুম এলেই বিভিন্ন সংস্থার রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হওয়ার সমালোচনা করেন মির্জা ফখরুল।
তিনি বলেন, অর্থবছরের বরাদ্দ তখন ছাড় হয় বলেই এ পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা নাগরিক দুর্ভোগ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এ থেকে উত্তরণে সমন্বিত পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন দরকার।
নাগরিক সচেতনতার অভাবকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করলেও আইন প্রয়োগের ইতিবাচক দিক তুলে ধরেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার শুরু হওয়ার পর মানুষ নিয়ম মানতে শুরু করেছে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতা সৃষ্টি করলেই নাগরিক আচরণে পরিবর্তন আনা সম্ভব।
ঢাকার অনেক খাল ভরাট হয়ে যাওয়ার কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, খালগুলো পুনরুদ্ধার করে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে পারলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে নদী দখল ও ভরাট বন্ধে জনসচেতনতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি।
রাজধানীতে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে এখনও দুর্বলতা রয়েছে, সে দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে এ খাতে আরও উন্নয়নের কথা বলেন তিনি।
ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে এ সেমিনারে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম এবং যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকও উপস্থিত ছিলেন।
মীর শাহে আলম বলেন, “নগর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যার কাছে থাকার কথা, তার অধীনেই সব গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ নেই। ফলে নগরের কোনো সমস্যা হলে সবাই সিটি মেয়র বা প্রশাসককে দায়ী করলেও বাস্তবে ট্রাফিক পুলিশ, ওয়াসা, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কিংবা বিদ্যুৎ বিভাগ সিটি করপোরেশনের অধীনে নয়।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ কারণেই দেশে দীর্ঘদিন ধরে 'সিটি গভর্নমেন্ট' প্রতিষ্ঠার দাবি রয়েছে।
তার মতে, এসব বিভাগ ও সংস্থাকে সিটি করপোরেশনের অধীনে আনা গেলে সব সমস্যার সমাধান না হলেও অন্তত ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে এবং নগর ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আসবে।
এছাড়া রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম, ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিনুল ইসলাম, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নগরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নাগরিকদের করণীয় ও টেকসই সমাধানের উপায় নিয়ে আয়োজিত এই সেমিনারে অংশ নেন।
