Published : 03 Jun 2026, 07:12 PM
গত ৮ এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির পর দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনা চলতে থাকার মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ মুজতবা খামেনির অবস্থান ও ভূমিকা নিয়ে নতুন তথ্য সামনে এনেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
রুবিওর দাবি, মুজতাবা জীবিত। কেবল তা-ই নয়, তিনি জনসমক্ষে না আসলেও, অন্তরালে থেকে ইরানের অভ্যন্তরীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন।
মঙ্গলবার মার্কিন সেনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় রুবিও বলেন, যুদ্ধের প্রথম দিনে মার্কিন বিমান হামলায় মুজতাবা খামেনির বাবা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
তবে মুজতাবা জীবিত আছেন। দেশের অভ্যন্তরীন ও কূটনৈতিক বিষয়ে তিনি আরও গভীরভাবে যুক্ত হচ্ছেন এবং ক্রমবর্ধমানভাবে যোগাযোগ রক্ষা করছেন বলে লক্ষণ দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ এই কূটনীতিক বলেন, “আমার মনে হয় এমন কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, তিনি নির্দিষ্ট স্তরে যোগাযোগ বাড়িয়ে চলেছেন, যদিও তার সমস্ত যোগাযোগ এ পর্যন্ত লিখিতভাবে এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়েছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে দেওয়া সর্বশেষ প্রস্তাবের খসড়াটি তেহরান যখন পর্যালোচনা করছে, ঠিক তখনই রুবিও এই মন্তব্য করলেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এই প্রস্তাবের শর্তগুলো আরও কঠোর করেছেন।
ইরানের আধা-সরকারি মেহর নিউজ এজেন্সি দেশটির আলোচনাকারী দলের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, তেহরান এখনো সর্বশেষ প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখছে এবং গত কয়েক দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি।
ওই কর্মকর্তা জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধবিরতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি ভঙ্গ এবং সাধারণ অবিশ্বাসের কারণে ইরান এই বিষয়ে অত্যন্ত ‘কঠোর’ অবস্থান নিচ্ছে।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে তার প্রধান অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে, ইরানকে কখনই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করতে হবে।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হতো।
মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আলোচনা স্থগিতের সিদ্ধান্তের খবর নাকচ করে দেন। তিনি দাবি করেন, “আমাদের মধ্যে কথাবার্তা অনবরত চলছে।”
নিজের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প লেখেন, “এই আলোচনা কোন দিকে যাবে তা কেউ জানে না, তবে আমি ইরানকে যেমনটা বলেছি, যেকোনো উপায়েই হোক, এখন আপনাদের একটি চুক্তিতে আসার সময় হয়েছে।”
আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও বলেন, ইরানের সঙ্গে মার্কিন আলোচনায় এখন “তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির এমন কিছু দিক” অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, যা নিয়ে দেশটি মাত্র এক মাস আগেও আলোচনা করতে রাজি ছিল না।
তবে এটি শেষ পর্যন্ত কোনো গ্রহণযোগ্য চুক্তির দিকে নিয়ে যাবে কি না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই বলে সতর্ক করেছেন রুবিও।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের সামনে একটি সম্ভাবনা রয়েছে, যা আজ হতে পারে, আগামীকাল হতে পারে, আবার আগামী সপ্তাহেও হতে পারে।”
ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারও দায়িত্বে থাকা রুবিও বলেন, আলোচনার প্রথম শর্তই হলো ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে এবং তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে আলোচনায় বসতে রাজি হতে হবে।
ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিলে তার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে রুবিও বলেন, কেবল এটিই যথেষ্ট হবে না।
রুবিও বলেন, “এই বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি এবং এমন কোনো প্রস্তাবও দেওয়া হয়নি।”
তিনি স্পষ্ট করেন, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিষয়ে বড় ধরনের ছাড় দেওয়ার পরেই কেবল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি প্যাট্রি কুলহানে জানান, রুবিও’র এই বক্তব্য থেকে এতদিনের আলোচনা আসলে কোন বিষয়গুলোর ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল, তার সবচেয়ে স্পষ্ট আভাস পাওয়া গেছে।
কুলহানে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র এখানে কোনো ইতিবাচক টোপ বা সুবিধা দিচ্ছে না। তিনি (রুবিও) মূলত কঠোর শর্তের কথাই বলেছেন।
যার মধ্যে রয়েছে, ইরানিদের প্রথমে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে হবে এবং এরপর তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস ও ভবিষ্যতে ইউরেনিয়ামের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।”
এদিকে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রধান রাফায়েল গ্রোসি জানিয়েছেন, ইরান ইতোমধ্যে তাদের আগের অনেক পারমাণবিক কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাতে গ্রোসি বলেন, ইরানের ওপর যুদ্ধ অবসানের যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী যাচাইকরণ এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকা অত্যন্ত জরুরি।