Published : 25 Jun 2026, 07:40 PM
ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত অন্তত ১৬৪ জন নিহত, প্রায় ১ হাজার জন আহত এবং ১০ হাজার মানুষ নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
অনেক ভবন ধসে পড়েছে এবং বিভিন্ন স্থাপনার দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। রিখটার স্কেলে প্রথম ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ এবং দ্বিতীয়টির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৫।
বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার দিকে এক মিনিটেরও কম সময়ের ব্যবধানে এই জোড়া কম্পন অনুভূত হয়। সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় ওই সময়ে বেশিরভাগ মানুষই বাড়িতে ছিলেন।
ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া এসব ভবনে জোর উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা। অনেকেই ধ্বংসস্তুপের মধ্যে প্রিয়জন কিংবা স্বজনদের খোঁজ করছেন।
জীবিত যারা উদ্ধার পাচ্ছেন তাদের কাউকে কাউকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ভূমিকম্প থেকে বেঁচে ফেরা বাসিন্দারা বর্ণনা করছেন তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা।
বেঁচে ফেরা এমনই এক নারী মারিয়া আলেজান্দ্রা ভূমিকম্পের সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের সময় ভবনের ভেতরেই ছিলেন এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
মারিয়া বলেন, “অনেক কষ্টে আমরা দরজা খুলে বাইরে বেরোতে পেরেছিলাম। নিচে নেমে যা দেখেছি, তা ছিল হরর সিনেমার (ভৌতিক সিনেমা) দৃশ্যের মতো। ভবন থেকে বের হতে আমাদের ধ্বংসস্তূপ টপকাতে হয়েছে। আমি মাত্র একটি পরিবারকে সেখান থেকে বের হতে দেখেছি। প্রতিবেশীরা সবাই বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসছিল।”
রাজধানী কারাকাসের পূর্বাঞ্চলের এক বাসিন্দা কোরো মার্টিনেজ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, “বিকট শব্দে ঘরের সব জিনিসপত্র হুড়মুড় করে পড়ে যাচ্ছিল, এমনকি ফ্রিজের ভেতর রাখা জগগুলোও ছিটকে পড়ে। আমি জীবনে আগে কখনও এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি।”
এর আগে ১৯৬৭ সালে কারাকাসে ৬ দশমিক ৩ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই প্রসঙ্গ টেনে অবসরে যাওয়া এক বাসিন্দা মারিয়া রোমেরো বলেন, “এবারেরটি ছিল আগের সেই ভূমিকম্পের চেয়েও আরও ভয়াবহ। চারদিকে শুধু ভেঙে যাওয়া আসবাবপত্র আর কাঁচের টুকরো।”
আরেকজন তার অভিজ্ঞতা বর্ণনায় রয়টার্সকে বলেন, “ভূমিকম্পের তীব্রতায় আমার ভবনের বেশ কিছু দেয়াল ভেঙে পড়েছে। কোথাও কোথাও দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে।” আরেকজন নারী বিবিসি-কে বলেন, “মনে হচ্ছিল আমি মারা যাচ্ছি।”
কারাকাসের আরেক বাসিন্দা রমিরেজ বলেন, “ভূমিকম্প শুরুর পরপর আমরা লোকজনের চিৎকার শুনতে পাই। সবাই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে কারাকাসে ব্যাপক ধ্বংস দেখা গেছে। ভবনের ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধারকাজ চলছে। হাসপাতালগুলোতে আহতদের ভিড়। কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ। বন্ধ রাখা হয়েছে বিদ্যালয় ও রেলসেবা।
কারাকাসের এক সাংবাদিক শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আতঙ্কের বর্ণনা দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “এই ভূমিকম্প সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচণ্ড আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। আমরা সবাই ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি।”
নিজের ভবনেই বড় ধরনের ফাটল ধরেছে জানিয়ে এই সাংবাদিক বলেন, “এ মুহূর্তে আমাদের এখানে বিদ্যুৎ বা ইন্টারনেট সংযোগ নেই। আমি চারিদিকে কেবল ভাঙা জিনিসপত্র আর কাঁচের টুকরো পড়ে থাকতে দেখছি।”
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেন। তবে হতাহতের কোনও সংখ্যা উল্লেখ করেননি।
ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টিভিতে বলেন, “আমাদের অনেক ভবন ও ঘরবাড়ি ধসে পড়েছে। নিরাপত্তা ও বেসামরিক সহায়তার ক্ষেত্রে আমাদের যা কিছু আছে তা দিয়েই আমরা পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছি। দমকল–পুলিশ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।”
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ বলেন, অন্যান্য দেশ থেকে উদ্ধারকর্মীরা শিগগিরই ভেনেজুয়েলায় পৌঁছবে। তিনি এই সহায়তার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ অন্যান্য বিশ্ব নেতাদেরকেও ধন্যবাদ জানান।