Published : 26 Jun 2026, 07:57 PM
ইউক্রেইন যুদ্ধে চাপের মুখে পড়ে রাশিয়া পশ্চিমা সামরিক জোট নেটোর ঐক্য পরীক্ষা করার চেষ্টায় বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোতে কিংবা পোল্যান্ডে ‘উসকানিমূলক হামলার’ প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে দুই দেশ।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে লিখেছে, মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের কাছে ইউক্রেইনের সাম্প্রতিক দূরপাল্লার ড্রোন হামলার কারণে ক্রেমলিন চাপের মধ্যে রয়েছে। এই অচলাবস্থা ভাঙতেই রাশিয়া এমন বিপজ্জনক পথ বেছে নিতে পারে বলে পশ্চিমা দেশগুলোর আশঙ্কা।
গত সোমবার লাটভিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছে, রাশিয়া বাল্টিক দেশ বা পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে ‘উসকানিমূলক সামরিক পদক্ষেপের’ প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এটি কোনো পূর্ণমাত্রার সামরিক আক্রমণ হবে না।
নেটোর আরেক সদস্য দেশের এক জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক কর্মকর্তাও গত সপ্তাহে একই ধরনের কথা বলেছেন। তিনি জানান, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বাল্টিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে কোনও পরিকল্পনা করছেন বলে তারা গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছেন।
ইউক্রেইনে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের চাপে রাশিয়া এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, পুতিন হয়ত এখন পরিস্থিতির মোড় ঘোরানোর মরিয়া চেষ্টায় এস্তোনিয়া, লাটভিয়া এবং লিথুয়ানিয়ার মতো ছোট নেটোভুক্ত দেশগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ঠিক কতটা মজবুত, তা পরীক্ষা করতে চাইবেন বলে জানিয়েছেন ওই রাজনৈতিক কর্মকর্তা।
লাটভিয়ার গোয়েন্দা মূল্যায়নে বলা হয়েছে, রাশিয়ার পক্ষে এখনই দ্বিতীয় কোনও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করা সম্ভব নয়। তবে তারা ‘হাইব্রিড হামলা’ চালানোর কথা ভাবছে। এর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, ড্রোন ব্যবহার কিংবা অন্যান্য আরও পদক্ষেপ থাকতে পারে।
এর মূল উদ্দেশ্য হল পশ্চিমা বিশ্বকে এই বার্তা দেওয়া যে, তারা যেন ইউক্রেইনকে সহায়তা করা বন্ধ করে, অন্যথায় তাদের নিজেদের ভূখন্ডেও সমস্যায় পড়তে হবে।
রাশিয়ার প্রস্তুতি সম্পর্কিত সতর্কবার্তাগুলোর মধ্যে মিল আছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে বিস্তারিত গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশ হয়নি। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেইনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযানের আগে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই-সিক্স যেভাবে বিস্তারিত সতর্কবার্তা দিয়েছিল, এবার সে ধরনের তথ্য সামনে আসেনি।
তবে এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইউক্রেইনে রাশিয়ার সামরিক অগ্রগতি থমকে আছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, যুদ্ধক্ষেত্রে অচলাবস্থা কাটাতে কিংবা পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে আনতে রাশিয়া বিকল্প কৌশল নিতে পারে কি না।
ব্রিটিশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান চাথাম হাউজের রাশিয়া বিশেষজ্ঞ কিয়ার গাইলস বলেন, “মস্কো বর্তমান প্রবণতা ভেঙে দেওয়ার উপায় খুঁজবে সংঘাতকে অন্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে অথবা অন্য কোথাও নতুন উত্তেজনা তৈরির মাধ্যমে। তার কথায়, রাশিয়া নিষ্ক্রিয়ভাবে পরাজয় মেনে নেবে, এমন আশা আমাদের করা উচিত নয়।”
রাশিয়ার তুলনামূলক দুর্বল অবস্থান এ সপ্তাহে সামনে এসেছে বেলারুশে। ইউক্রেইন হামলার হুমকি দেওয়ার পর বেলারুশের ড্রোন রিলে স্টেশনগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।
গত শুক্রবার ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বেলারুশকে এক সপ্তাহ সময় দিয়ে সতর্ক করেছিলেন। তিনি অভিযোগ করেন, এসব সরঞ্জাম তার দেশে রাশিয়ার হামলায় সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
ওদিকে, নেটোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গীকার নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে এ মাসে তুরস্কের আঙ্কারায় জোটটির বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইউরোপীয় মিত্ররা নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানে বিমান হামলা চালাতে না দেওয়ায় তিনি হতাশ হয়েছেন।
ইউক্রেইনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই রাশিয়া বিভিন্ন ধরনের নাশকতা ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে যুক্তরাজ্য, পোল্যান্ড ও জার্মানিতে ডিএইচএল এর পার্সেলের ভেতরে রাশিয়ার অগ্নিবোমা স্থাপনের ঘটনা।
গত সেপ্টেম্বরে ১৯টি রুশ ডেকয় ড্রোন পোল্যান্ডের আকাশসীমায় প্রবেশ করে। এরপর নেটো যুদ্ধবিমান পাঠিয়ে সেগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা চালায়।
অন্যদিকে, ইউক্রেইনীয় বাহিনী রাশিয়ার প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার ভেতরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম নিজস্ব দূরপাল্লার ড্রোন প্রযুক্তি তৈরি করেছে। গত সপ্তাহে প্রায় ২০০টি ইউক্রেইনীয় ড্রোন রাশিয়ার রাজধানী মস্কোসহ বিভিন্ন তেল শোধনাগারে ভয়াবহ হামলা চালায়। এর ফলে ক্রেমলিনকে পিছু হটতে হয়েছে।
এক পশ্চিমা সামরিক কর্মকর্তা বলেন, মস্কো ও সেন্ট পিটার্সবার্গের আকাশসীমায় যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় পুতিন যদি নিজেকে কোণঠাসা মনে করেন, তাহলে রাশিয়া নেটো দেশগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে- এমন উদ্বেগ রয়েছে। তার কথায়, “এটি এক বিপজ্জনক সময়।”