০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

৫ হাজার টনেরও বেশি ওজনের স্টারশিপ রকেট কতটা শক্তিশালী?

এত ওজনের পরও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেটটি সফলভাবে মহাকাশে পাড়ি জমাতে নির্ভর করে নিখুঁত স্টেজ বিন্যাস, কার্যকর ইঞ্জিন ও সুনির্দিষ্ট উৎক্ষেপণ পরিকল্পনার ওপর।

৫ হাজার টনেরও বেশি ওজনের স্টারশিপ রকেট কতটা শক্তিশালী?

এযাবৎকালের উৎক্ষেপণ করা বিভিন্ন রকেটের মধ্যে এটাই সবচেয়ে দীর্ঘ ও শক্তিশালী। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 01 Nov 2026, 06:06 PM

Updated : 01 Nov 2026, 06:06 PM

পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু গাছ ও স্ট্যাচু অফ লিবার্টিকেও পেছনে ফেলে পাঁচ হাজার টনেরও বেশি ওজনের স্টারশিপ রকেট বর্তমানে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী রকেট হিসেবে পরিচিত।

স্পেসএক্সের স্টারশিপ রকেটের দুটি অংশ একসঙ্গে যোগ করলে এর মোট উচ্চতা দাঁড়ায় ৪০৭ ফুট, যা পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু গাছ ‘হাইপেরিয়ন’-এর চেয়েও উঁচু ও বিখ্যাত স্ট্যাচু অফ লিবার্টি’র চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ বেশি উঁচু।

এযাবৎকালের উৎক্ষেপণ করা বিভিন্ন রকেটের মধ্যে এটাই সবচেয়ে দীর্ঘ ও শক্তিশালী, যার উৎক্ষেপণ শক্তি বা থ্রাস্ট ১ কোটি ৮০ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড-ফোর্স বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট।

২০২৩ সালের এপ্রিলে রকেটটির প্রথম পূর্ণাঙ্গ উৎক্ষেপণের সময় বুস্টার থেকে নির্গত তীব্র তাপে কংক্রিটের প্যাড চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। ফলে ভূগর্ভস্থ মাটি গভীর পর্যন্ত সরে যায় ও ৩৮৫ একর এলাকাজ জুড়ে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়েছিল।

ওই সময় বুস্টারটির সক্ষমতা ছিল ১ কোটি ৬৭ লাখ পাউন্ড থ্রাস্ট, যা ছিল ২৮ সেপ্টেম্বরের উৎক্ষেপিত রকেটের চেয়ে সামান্য কম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উচ্চতা দুই-স্তরের সম্পূর্ণ রকেটটির সার্বিক উচ্চতাকেই নির্দেশ করে। রকেটটির নিচের অংশটিকে বলে ‘সুপার হেভি’, যা ২৩৬.২ ফুট দীর্ঘ এক শক্তিশালী বুস্টার। উৎক্ষেপণ প্যাড থেকে রকেটটিকে আকাশে তুলতে প্রথম ধাক্কা দেয় এই বুস্টার।

এর ঠিক ওপরে অবস্থান করছে ১৭০.৬ ফুট দীর্ঘ স্টারশিপ মহাকাশযান। রকেটটির আকার ও শক্তি অকল্পনীয় হলেও এর পেছনে রয়েছে এক সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য।

স্পেসএক্স এ সিস্টেমটি এমনভাবে নকশা করেছে, যাতে বড় আকৃতির পণ্য এবং ভবিষ্যতে মানুষ ও বিভিন্ন সরঞ্জাম পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে নিরাপদে পরিবহন করা যায়।

এ ছাড়া, স্পেসএক্সের পরিকল্পনা রয়েছে রকেটের দুটি অংশই সফলভাবে পুনরুদ্ধার করে পুনরায় ব্যবহার করার।

স্টারশিপ কতটুকু শক্তি উৎপন্ন করে?

সুপার হেভি বুস্টারে ব্যবহৃত হয়েছে ৩৩টি র‍্যাপ্টর ইঞ্জিন। এসব ইঞ্জিন তরল মিথেন ও তরল অক্সিজেন পুড়িয়ে ১ কোটি ৮০ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড-ফোর্স বুস্টার থ্রাস্ট বা শক্তি উৎপন্ন করে।

নাসার ‘স্পেস লঞ্চ সিস্টেম’ বা এসএলএস রকেট যেখানে সর্বোচ্চ ৮৮ লাখ থেকে ৯৪ লাখ পাউন্ড থ্রাস্ট উৎপন্ন করতে পারে, সেখানে সুপার হেভি বুস্টার আলাদা হয়ে যাওয়ার পর স্টারশিপ এর যাত্রা ধরে রাখে তিনটি র‍্যাপ্টর ইঞ্জিন ও মহাকাশে কাজ করার উপযোগী তিনটি র‍্যাপ্টর ভ্যাকিউম ইঞ্জিনের সাহায্যে।

Image

স্পেসএক্সের পরিকল্পনা রয়েছে রকেটের দুটি অংশই সফলভাবে পুনরুদ্ধার করে পুনরায় ব্যবহার করার। ছবি: রয়টার্স

স্পেসএক্সের তথ্য অনুসারে, এর ওপরের অংশের থ্রাস্ট বা শক্তি প্রায় ৩৫ লাখ পাউন্ড-ফোর্স। যার মধ্যে কেবল বুস্টারের শক্তিটিকেই উৎক্ষেপণ থ্রাস্ট হিসেবে বিবেচিত হয়।

ভারী বোঝা বহনের জন্য কেবল মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করাই এ রকেটের একমাত্র কাজ নয়। সুপার হেভি বুস্টারের নিজস্ব জ্বালানি ধারণসক্ষমতা ৩ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন ও স্টারশিপ অতিরিক্ত ১ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন জ্বালানি ধারণ করতে পারে।

সবমিলিয়ে এ যানের সঙ্গে আরও ৫ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন জ্বালানি যোগ হয়।

এত ভারি হওয়ার পরও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেটটি সফলভাবে মহাকাশে পাড়ি জমাতে নির্ভর করে নিখুঁত স্টেজ বিন্যাস, কার্যকর ইঞ্জিন ও সুনির্দিষ্ট প্রাক-উৎক্ষেপণ পরিকল্পনার ওপর।

স্টারশিপ কি রিফুয়েলিং ছাড়াই চাঁদে যাবে?

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতির পরও নাসার পরিকল্পনা অনুসারে, চাঁদের পৃষ্ঠে নামা বিভিন্ন মিশনের ক্ষেত্রে স্টারশিপকে অবশ্যই পৃথিবীর কক্ষপথে পুনরায় জ্বালানি নিতে হবে।

এর কারণ, স্পেসএক্সের তৈরি চন্দ্রযানটি কেবল কক্ষপথে পৌঁছাতেই এর জ্বালানির বড় একটি অংশ খরচ করে ফেলে, যে কারণে পরবর্তীতে তাকে পুনরায় জ্বালানি সংগ্রহ করতেই হয়।

স্পেসএক্স ও নাসা যৌথভাবে এ জটিল অভিযানের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে। এ পরিকল্পনায় কয়েকটি বিশেষায়িত যান ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

এর মধ্যে সবার আগে মহাকাশে পাঠানো হবে একটি ‘প্রপেল্যান্ট ডিপো’ বা জ্বালানি ভাণ্ডার। এরপর একাধিক ট্যাংকার স্টারশিপ মহাকাশে গিয়ে ওই ডিপোতে জ্বালানি সরবরাহ করবে।

সবশেষে চাঁদের ল্যান্ডারটি উৎক্ষেপিত হবে, যা ওই ডিপোর সঙ্গে যোগ হয়ে প্রয়োজনীয় জ্বালানি নেবে।

নাসা’র আর্টেমিস কর্মসূচির অংশ হিসেবে নভোচারীরা যখন ওরিয়ন মহাকাশযানে চড়ে রওনা দেবেন, এর আগে এ পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে।

নভোচারীরা পৃথিবীর কক্ষপথে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা স্টারশিপ ল্যান্ডারের সঙ্গে যোগ হবেন ও এরপর স্টারশিপ উভয় মহাকাশযানকে টেনে চাঁদের কক্ষপথে নিয়ে যাবে।

পরবর্তীতে স্টারশিপ ল্যান্ডারটিই দুজন ক্রু বা সদস্যকে চাঁদের পৃষ্ঠে নামাবে ও সেখান থেকে আবার ফিরিয়ে আনবে।

মহাকাশের চরম ঠাণ্ডা পরিবেশে জ্বালানি সংরক্ষণ ও তা এক যান থেকে অন্য যানে স্থানান্তর করা অনেক কঠিন প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ।

এ কারণেই পূর্বপরিকল্পিত ধাপগুলো মেনে চলা, রিফুয়েলিং করা ও জটিল সহায়ক ব্যবস্থা ধরে রাখা জরুরি।