Published : 08 Feb 2026, 03:04 PM
স্বপ্ন কেবল অবচেতন মনের কল্পনা নয়, বরং মনের অসুখ সারানোর উপায়ও হতে পারে বলে দাবি বিজ্ঞানীদের। তারা বলছেন, স্বপ্নের ওপর নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের মানসিক ট্রমা ও দুঃস্বপ্ন কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
আমেরিকান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ম্যাগাজিন ‘পপুলার মেকানিক্স’ প্রতিবেদনে লিখেছে, যারা কখনো দুঃস্বপ্ন থেকে সচেতনভাবে নিজেকে জাগিয়ে তুলতে পেরেছেন তারা আসলে ‘লুসিড ড্রিমিং’-এর স্বাদ পেয়েছেন। এ ধরনের স্বপ্নে স্বপ্নদ্রষ্টা বুঝতে পারেন যে তিনি স্বপ্ন দেখছেন এবং অনেক সময় স্বপ্নের ভেতরে কী ঘটছে তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও তার থাকে।
এখন গবেষকদের একটি দল বলছে, মানুষের এ বিশেষ মানসিক অভিজ্ঞতাটি একসময় চিকিৎসার বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’ বা পিটিএসডি ও অন্যান্য কারণে দীর্ঘস্থায়ী দুঃস্বপ্নে ভোগা রোগীদের ওপর করা আগের বিভিন্ন গবেষণা পর্যালোচনা করেছেন আন্তর্জাতিক গবেষকদের একটি দল, যেখানে কোনো এক ধরনের স্বপ্ন কি অন্য ধরনের স্বপ্নের গতিপথ বদলে দিতে পারে? এমন প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজেছেন তারা।
‘লুসিড ড্রিম’-এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এ স্বপ্ন দেখার সময় স্বপ্নদ্রষ্টা সচেতন থাকেন। তবে এর মধ্যে কেবল একটি বিশেষ ধরন রয়েছে, যেটিকে ‘লুসিড কন্ট্রোল ড্রিম’ বলা হয়। এখানে স্বপ্নদ্রষ্টা নিজের কাজ ও স্বপ্নের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
গবেষকরা বলছেন, এ বিশেষ ধরনের লুসিড ড্রিমকেই চিকিৎসার ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেতে পারে।
“পিটিএসডি ও উদ্বেগের বিভিন্ন লক্ষণ দূর করতে, বিশেষ করে দুঃস্বপ্ন কমাতে লুসিড কন্ট্রোল ড্রিমিং আশাব্যঞ্জক চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, যেখানে স্নায়ুবিজ্ঞান ও নিজের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে একত্রও করা হয়েছে। এ পদ্ধতির বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসাগত বিভিন্ন সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে আরও গবেষণা ও জনসচেতনতার প্রয়োজন।”
মস্তিষ্কের কয়েকটি নির্দিষ্ট অংশের সক্রিয়তার কারণে ‘লুসিড কন্ট্রোল ড্রিমস’ ঘটে। যার মধ্যে রয়েছে ‘ডরসোল্যাটারাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’ বা মস্তিষ্কের অন্যতম প্রধান অংশ, যা চিন্তাভাবনা বা কগনিশন নিয়ন্ত্রণ করে। আরেকটি হচ্ছে, মস্তিষ্কের ‘ভেন্ট্রোমিডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স’, যা মানুষের ‘ডিফল্ট মোড নেটওয়ার্ক’ বা বিশ্রামের সময় সক্রিয় থাকা স্নায়বিক নেটওয়ার্ক ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত।
আত্মসচেতনতার জন্য প্রয়োজনীয় মস্তিষ্কের আরও কিছু অংশ এতে কাজ করে। যেমন, ‘টেমপোরোপ্যারাইটাল জাংশন’, যা হঠাৎ কোনো অপ্রত্যাশিত বিষয়ের দিকে মনোযোগ দিতে সাহায্য করে। আরেকটি হচ্ছে ‘প্রিকিউনিয়াস’, যা মানুষের মনোযোগের পরিবর্তন, ব্যক্তিগত পরিচয়, স্মৃতি রোমন্থন ও অতীত অভিজ্ঞতার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করে।
তবে ‘লুসিড ড্রিমিংয়ের’ এ অবস্থাটি মূলত শুরু হয় ‘অ্যামিগডালা’ ও ‘হিপোক্যাম্পাস’-এর যৌথ কার্যক্রমের মাধ্যমে। মস্তিষ্কের এ দুটি অংশই মানুষের স্মৃতিকে শক্তিশালী করতে এবং কোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িত আবেগীয় স্মৃতি তৈরিতে কাজ করে।
মস্তিষ্কের এসব অংশ যখন একসঙ্গে কাজ করে তখন স্বপ্নদ্রষ্টা যা দেখছেন তাকে কেবল হ্যালুসিনেশন বা অবাস্তব কল্পনা হিসেবে মেনে না নিয়ে বরং সেটির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগণিত গবেষণা পর্যালোচনার সময় গবেষকরা খতিয়ে দেখেছেন, মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের এক চমৎকার সমন্বয়ের মাধ্যমে ‘লুসিড ড্রিমিং’কে দুঃস্বপ্ন ঠেকানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব।
তারা বলছেন, ‘লুসিড ড্রিমিং’য়ের বিভিন্ন প্রভাব অনেকটা ‘সাইকেডেলিক’ বা এক ধরনের চেতনা পরিবর্তনকারী উপাদান বা ওষুধের প্রভাবের মতোই। কিছু সাইকেডেলিক ওষুধও ট্রমা বা মানসিক আঘাতের প্রভাব কমানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
‘লুসিড ড্রিমিং’ মানুষের আবেগীয় স্থিতিস্থাপকতা ও চিন্তার সচেতনতা বাড়াতে পারে। ফলে গবেষক দলটি একে ‘পিটিএসডি’-এর কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে দেখছেন, যা রোগীকে তাদের দীর্ঘস্থায়ী দুঃস্বপ্ন ও তার ফলে তৈরি দুশ্চিন্তা কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা সরাসরি নিজের হাতে তুলে দেয়।
তবে বিষয়টিকে বিভিন্ন ক্লিনিককে ট্রমা সেন্টারের সঙ্গে একীভূত করার আগে আরও অনেক গবেষণার প্রয়োজন। এ ছাড়া, যাদের বিচ্ছিন্নতা বোধ বা মানসিক বিভ্রমের প্রবণতা রয়েছে, তাদের জন্য লুসিড ড্রিমিং এড়িয়ে চলাই ভালো, বিশেষ করে যাদের বাস্তব ও কল্পনার মধ্যে পার্থক্য করতে সমস্যা হয় তাদের জন্য এমনটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
গবেষকরা বলেছেন, “ভবিষ্যতের গবেষণায় দেখা উচিত কীভাবে ইইজি সহায়তা লুসিড ড্রিম ট্রেনিং পিটিএসডিজনিত দুঃস্বপ্নে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সাহায্য করতে পারে, বিশেষ করে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও নিউরোডাইভারজেন্ট বা যাদের মস্তিষ্কের গঠন বা কাজের ধরন সাধারণের চেয়ে আলাদা সেসব ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তা কতটা কার্যকর সেদিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।”
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘জার্নাল অফ মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি’তে।