Published : 05 Aug 2025, 07:06 PM
সাদা সুরক্ষামূলক পোশাক ও মুখে মাস্ক পরে নিকোলাস চুয়েহ খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছেন একজন গাইডের কথা, যিনি তাকে দেখাচ্ছেন ও বোঝাচ্ছেন কীভাবে তাইওয়ানে উন্নতমানের সেমিকন্ডাক্টর তৈরির জন্য রূপালি রঙের কিছু বিশেষ মেশিন ব্যবহার করা হয়।
১৬ বছর বয়সী ওই শিক্ষার্থী আটটি দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন, যারা তাইওয়ানে আয়োজিত একটি গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে অংশ নিয়েছিলেন।
ভবিষ্যতের সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ শিল্পের জন্য বিদেশ থেকে আসা তরুণ প্রতিভাদের এভাবেই উন্নত প্রশিক্ষণ দিচ্ছে তাইওয়ান। এজন্য গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প ও ইউনিভার্সিটি কোর্স চালু করেছে দেশটি, যাতে তরুণরা চিপ ডিজাইন ও উৎপাদনের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন।
গ্রীষ্মকালীন এ ক্যাম্পটি তাইওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ চিপ শিল্পে আগ্রহ বাড়ানোর জন্য তৈরি হয়েছে। দেশটিতে জন্মহার দ্রুত কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে হাজার হাজার চাকরির পদ ফাঁকা থাকতে পারে। এ ক্যাম্পের মাধ্যমে নতুন দক্ষ তরুণ প্রজন্ম তৈরি করতে চায় দেশটি।
চুয়েহ বলেছেন, “আমি নিজে ভিডিও গেইম খেলতে খুব পছন্দ করি। তাই সব সময়ই এসব চিপওয়ালা পণ্য ব্যবহার করেছি।” চিপের প্রতি তার আগ্রহ দেখেই মা-বাবা তাকে এ ক্যাম্পে ভর্তি করে দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
এ ক্যাম্পটির আয়োজন করেছে মার্কিন চিপ ডিজাইন সফটওয়্যার কোম্পানি ‘সিনোপসিস’। ঠিক এমন আরও অনেক প্রশিক্ষণ ক্যাম্প সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চালু করেছে তাইওয়ানের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি ও চিপ কোম্পানি। কারণ বর্তমানে গোটা বিশ্বেই বেড়ে চলেছে চিপের চাহিদা।
এ বছর প্রথমবারের মতো গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্পে ম্যান্ডারিন বা চীনা ভাষা ও ইংরেজি উভয় ভাষার আয়োজন করেছে সিনোপসিস। দেশটিতে সেমিকন্ডাক্টর শিল্প খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এখন বিদেশ থেকেও মেধাবী তরুণদের আকর্ষণ করতে চাইছে তাইওয়ান।
“শৈশব থেকেই স্টেম বা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত শিক্ষাকে জোরদার করা খুব জরুরি,” বলেছেন সিনোপসিস-এর তাইওয়ান চেয়ারম্যান রবার্ট লি। তিনি মনে করেন, এসব ক্যাম্প চিপ শিল্পের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে পারে ও ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত দক্ষ জনশক্তি গঠনে সাহায্য করবে।
“এ কারণেই আমরা তাইওয়ানে এ উদ্যোগ শুরু করছি। তাইওয়ান একদিকে যেমন সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে খুব শক্তিশালী, অন্যদিকে দেশটিতে জন্মহার কমে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে কর্মী সংকট হতে পারে। সবকিছু মিলিয়ে এটা স্পষ্ট যে, আমাদের প্রথমে এখানেই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।”
লি বলেছেন, তাইওয়ানের বয়স বাড়তে থাকা প্রজন্ম যে সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে তা বিবেচনা করে এখন আন্তর্জাতিকভাবে ক্যাম্প আয়োজনের কথাও ভাবছে সিনোপসিস, যাতে চিপ তৈরি ও ডিজাইনের প্রতি আগ্রহ বাড়ানো যায়।

কোম্পানিটি ইংরেজি সংস্করণের জন্য ৩৩ হাজার তাইওয়ান ডলার ও ম্যান্ডারিন সংস্করণের জন্য ১০ হাজার ৯০০ তাইওয়ান ডলার ফি নিচ্ছে।
সিঙ্গাপুরে বসবাসকারী তাইওয়ান-বেলজিয়ামের দ্বৈত নাগরিক চুয়েহ বলেছেন, সেমিকন্ডাক্টরকে আকর্ষণীয় পেশা হিসাবে দেখেন তিনি।
“আমি কিছুটা হলেও এই দিকে এগোতে চাই। কারণ আমার মনে হয়, ভবিষ্যতে এআইয়ের ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এই শিল্প।”
জন্মহার কমে যাওয়া
কেবল দুই কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যা থাকার পরও বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যবস্থায় বিশাল প্রভাব রয়েছে তাইওয়ানের। এর পেছনে রয়েছে দেশটির বিভিন্ন চিপ কোম্পানি। যেমন– বিশ্বের সবচেয়ে বড় চুক্তিভিত্তিক চিপ নির্মাতা ‘তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি’ বা টিএসএমসি, মিডিয়া টেক ও ইউএমসি।
রয়টার্স লিখেছে, তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর শিল্প যদি কোনোভাবে পিছিয়ে পড়ে তাহলে সেটি দেশের অস্তিত্বের জন্য বড় ঝুঁকি হতে পারে। কারণ, বর্তমানে চীনের সামরিক হুমকির মুখে রয়েছে তাইওয়ান এবং বিশ্বমঞ্চে দেশটির গুরুত্বের বড় অংশ হচ্ছে এসব চিপ কোম্পানি।
তাইওয়ানের মানবসম্পদ কোম্পানি ‘১০৪ কর্পোরেশন’-এর তথ্য অনুসারে, দেশটির সেমিকন্ডাক্টর খাতে চাকরির সুযোগ ২০২০ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১৯ হাজার চারশ এক থেকে বেড়ে এ বছরের একই সময়ে ৩৩ হাজার সাতশ ২৫ জনে দাঁড়িয়েছে।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে এখন দুই ধরনের কর্মীর অভাব দেখা দিচ্ছে। একদিকে রয়েছে, যারা জটিল ডিজাইন ও গবেষণার কাজ করেন এমন কর্মী। অন্যদিকে যারা মেশিন চালানো ও পণ্য তৈরির কাজে নিয়োজিত বা উৎপাদন কর্মী। এ ঘাটতি শিল্পের জন্য বড় সমস্যা।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুসারে, তাইওয়ানে ২০১৪ সালে বার্ষিক শিশু জন্ম দুই লাখ ১০ হাজারের বেশি ছিল, যা ২০২৪ সালে প্রায় এক লাখ ৩৫ হাজারে নেমে এসেছে। ফলে স্থানীয়ভাবে এসব চাকরি পূরণ করা প্রতি বছর কঠিন হয়ে পড়ছে।
এদিকে, দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বলছে, একই সময়ে স্টেম বা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ের স্নাতকদের সংখ্যাও কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ।
তাইওয়ানভিত্তিক চিপ নির্মাতা ‘ভ্যানগার্ড ইন্টারন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর’-এর চেয়ারম্যান লেউ ফাং বলেছেন, “তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বৃদ্ধি খুবই দ্রুত হয়েছে। প্রতি বছর যত ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীর সংখ্যা স্কুল থেকে বের হয় তা এই শিল্পের চাহিদার তুলনায় কম।”
‘ভবিষ্যতের কর্মীশক্তি’
গত বছর বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর স্নাতক প্রোগ্রাম শুরু করেছে ‘ন্যাশনাল তাইওয়ান ইউনিভার্সিটি’। যার মধ্যে ম্যান্ডারিন ভাষার কোর্সও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যাতে তাইওয়ানে থেকে কাজ করতে ও থাকতে প্রয়োজনীয় ভাষাগত দক্ষতা অর্জন করতে পারেন শিক্ষার্থীরা।
এ কোর্সে এখন ১০টিরও বেশি দেশ থেকে ৪০টির বেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন।
এখন বিদেশি মেধার দিকে নজর দিতে শুরু করেছে টিএসএমসি। এজন্য জার্মানির স্যাক্সনি রাজ্যের এক প্রোগ্রামকে সাহায্য করছে তারা, যেখানে জার্মান শিক্ষার্থীরা প্রথমে তাইওয়ানের ইউনিভার্সিটিতে এক সেমিস্টার পড়বে ও এরপর টিএসএমসি’তে ইন্টার্নশিপ করবে। অন্যান্য উদ্যোগ এমনভাবে পরিকল্পিত যাতে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যেও প্রযুক্তি বা চিপ শিল্প সম্পর্কে আগ্রহ জন্মানো যায়।
জুলাইয়ে টিএসএমসি’র সঙ্গে মিলে এক আউটরিচ প্রোগ্রাম শুরু করেছে তাইওয়ানের ‘ন্যাশনাল ইয়াং মিং জিয়াও টং ইউনিভার্সিটি’। এ প্রোগ্রামের লক্ষ্য হচ্ছে, চিপ বিজ্ঞানকে মজাদার করে তোলা, যেখানে ইন্টারঅ্যাক্টিভ শিক্ষামূলক উপকরণ ও অনলাইন গেইমস ব্যবহার করছে তারা।
‘ন্যাশনাল ইয়াং মিং জিয়াও টং ইউনিভার্সিটি’-এর প্রেসিডেন্ট চি-হুং লিন বলেছেন, “এখন সবার আলোচনার বিষয় হচ্ছে ভবিষ্যতের কর্মীশক্তি কোথা থেকে আসবে?
“ছোটদের মধ্যে যদি এখনই এ কাজ নিয়ে আগ্রহ তৈরি করা যায় তবে ভবিষ্যতে এর প্রতি ইতিবাচক হতে পারে তারা এবং কেউ কেউ হয়ত এ ধরনের কাজ পছন্দও করতে শুরু করবে।”