Published : 13 May 2026, 05:12 PM
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জগতের দুই মহারথী ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যানের মধ্য আইনি লড়াই এখন তুঙ্গে। আদালতে দাঁড়িয়ে মাস্কের তোলা বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ অস্বীকার করে অল্টম্যান দাবি করেছেন, মাস্ক নিজেই একসময় ওপেনএআইয়ের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিলেন।
মামলায় মাস্কের দাবি, চ্যাটজিপিটি তৈরির মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে জনকল্যাণের বদলে বাণিজ্যিক স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছেন অল্টম্যান।
জবাবে মঙ্গলবার অল্টম্যান বলেছেন, মাস্ক নিজেই ওপেনএআইয়ের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছিলেন এবং এর থেকে মুনাফা অর্জনের পরিকল্পনাও করেছিলেন।
রয়টার্স লিখেছে, ২০২৪ সালের অগাস্টে দায়ের করা মামলায় মাস্ক অভিযোগ করেছেন, অল্টম্যান ও ওপেনএআই তাকে দিয়ে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করিয়েছিলেন। তবে পরে তারা একে অলাভজনক লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে বাণিজ্যিক কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের ফেডারেল কোর্টে চলমান এ মামলার বিচার এখন তৃতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। এ মামলার রায়ের ওপর ওপেনএআই এবং এর নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। কারণ কোম্পানিটি শেয়ার বাজারে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে, এর ফলে, ওপেনএআইয়ের সম্ভাব্য বাজারমূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলারে যেতে পারে।
আদালতে নিজের আইনজীবীর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে অল্টম্যান মাস্কের এমন দাবিও অস্বীকার করেছেন, যেখানে মাস্ক বলেছিলেন, অল্টম্যান ও ওপেনএআই প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান (যিনি এই মামলার অন্যতম বিবাদী) মিলে একটি ‘দাতব্য কোম্পানি চুরির’ চেষ্টা করছেন।
অল্টম্যান বলেছেন, “পুরো বিষয়টি যেভাবে সাজানো হয়েছে তা মাথায় ঢোকানোও আমার জন্য কঠিন। আমি আশা করি ওপেনএআই যত ভালো করবে এর অলাভজনক বিভাগটিও জনকল্যাণে তত বেশি ভূমিকা রাখতে পারবে।”
এদিকে, মাস্কের আইনজীবীরা অল্টম্যানকে ওপেনএআই সংক্রান্ত পরিকল্পনার বিষয়ে একজন ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
বিচারের শুরুর দিকে মাস্ক সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেছেন, “এআই নিয়ন্ত্রণে যদি এমন কেউ থাকে যাকে বিশ্বাস করা যায় না, তবে আমি মনে করি তা পুরো বিশ্বের জন্যই বড় বিপদে বিষয়।”
এ বিচারটি প্রযুক্তি জগতের মহারথীদের মধ্য ঘটে যাওয়া বড় এক সংঘাতের প্রতিফলন, যেখানে মাস্ক নিজেকে সাধারণ মানুষের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে দাবি করে বলছেন, তিনি এআইয়ের ঝুঁকি ও সিলিকন ভ্যালির সেসব প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বদের হাত থেকে বিশ্বকে বাঁচাতে চান, যারা কি না মানুষের চেয়ে অর্থকে বেশি গুরুত্ব দেন।
ওপেনএআই ও এর অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী মাইক্রোসফটের কাছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রায় ১৫ হাজার কোটি ডলার দাবি করেছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি মাস্ক, যা নিজে না নিয়ে ওপেনএআইয়ের অলাভজনক সত্ত্বাকে দেবেন। একইসঙ্গে তিনি অল্টম্যান ও ব্রকম্যানকে তাদের পদ থেকে অপসারণের দাবিও জানিয়েছেন।
অল্টম্যানের দাবি
২০১৫ সালে মাস্ক ও অল্টম্যানসহ বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা মিলে ওপেনএআই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কোম্পানির পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্য হচ্ছে, ২০১৮ সালে বোর্ড ছাড়ার আগেই মাস্ক এ বাণিজ্যিক বা মুনাফাভোগী পরিকল্পনার বিষয়ে জানতেন।
মাস্ক মামলাটি করছেন কারণ এ বড় আর্থিক সাফল্যের অংশীদার হতে না পারায় তিনি এখন আফসোস করছেন।
২০১৯ সালের মার্চে ওপেনএআই এক বাণিজ্যিক সত্তা গঠন করে। অল্টম্যানের আইনজীবী উইলিয়াম স্যাভিট যখন তাকে প্রশ্ন করেন যে, মাস্ক কি এ বাণিজ্যিক পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন, অল্টম্যান উত্তরে বলেছেন, “একেবারে উল্টোটা ঘটেছে।”
অল্টম্যান স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, মাস্ক একবার ওপেনএআইয়ের ৯০ শতাংশ মালিকানা দাবি করেছিলেন। মাস্ক পরবর্তীতে তার দাবির পরিমাণ কিছুটা কমালেও কোম্পানির অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণ তার হাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে তিনি ‘চরম অস্বস্তি’ বোধ করেছিলেন।
নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে অল্টম্যান বলেছেন, “স্টার্টআপ নিয়ে আমার অনেক ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে এবং আমি অনেক নিয়ন্ত্রণের লড়াই দেখেছি।”
উদাহরণ হিসেবে মাস্কের রকেট কোম্পানি স্পেসএক্সের কথা উল্লেখ করে অল্টম্যান বলেছেন, এখানে সফল কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতারা স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে সব ধরনের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখেন।
অল্টম্যান আরও বলেছেন, তিনি ও ওপেনএআইয়ের অন্যান্য নেতারা মাস্কের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে চাইলেও মাস্কের বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি টেসলা’র সঙ্গে ওপেনএআইয়ের একীভূত হওয়ার প্রস্তাবে তিনি অসম্মতি জানান।
“আমার মনে হয় না টেসলার সঙ্গে যোগ হলে আমাদের মূল লক্ষ্য বা মিশন অনুসারে কাজ করার সক্ষমতা থাকত। কারণ, টেসলার প্রধান কাজ তাদের গ্রাহকদের সেবা দেওয়া ও গাড়ি বিক্রি করা।”
অল্টম্যানের সততা নিয়ে মাস্কের আইনজীবীর চ্যালেঞ্জ
উত্তপ্ত জেরার মধ্যে মাস্কের আইনজীবী স্টিভেন মোলো সরাসরি অল্টম্যানের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি ওপেনএআইয়ের একজন সাবেক বোর্ড সদস্যের সাক্ষ্য তুলে ধরেন, যেখানে বলা হয়েছিল, অল্টম্যান ওপেনএআইতে ‘মিথ্যাচারের বিষাক্ত সংস্কৃতি’ তৈরি করেছেন।
এ ছাড়া সাতজন সাবেক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে মাস্কের আইনজীবী বলেছেন, অল্টম্যান মোটেও বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তি নন।
মোলো অল্টম্যানকে প্রশ্ন করেন, “ব্যবসা করার সময় আপনি কি মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন?” অল্টম্যান জবাবে বলেন, “আমি বিশ্বাস করি আমি একজন সৎ ও নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়ী।”
মোলো পাল্টা প্রশ্ন করেন, “আমার প্রশ্ন তা ছিল না। আমি জানতে চেয়েছি ব্যবসা করার সময় আপনি কি মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন?” অল্টম্যান বলেছেন, “আমি তেমনটা মনে করি না।”
২০২৩ সালে ওপেনএআই থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কারের ঘটনা নিয়েও সাক্ষ্য দিয়েছেন অল্টম্যান। ওই সময় বোর্ড তার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল এবং কোম্পানির জনকল্যাণমূলক লক্ষ্য রক্ষার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিল।
অল্টম্যান বলেছেন, সেই সময় তিনি আর ফিরে না আসার এবং মাইক্রোসফটে যোগ দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন। তবে ওপেনএআই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেছেন, “আমি ওপেনএআইকে বাঁচানোর জন্য জ্বলন্ত ভবনের ভেতরে দৌড়ে যাওযার জন্যও প্রস্তুত ছিলাম।”
অল্টম্যান সরাসরি ওপেনএআইয়ের কোনো শেয়ারের মালিক না হলেও একটি ফান্ডের মাধ্যমে কোম্পানিতে তার বিনিয়োগ রয়েছে।
আইনজীবী মোলো জুরিদের সামনে একটি নথি উপস্থাপন করেছেন, যেখানে বিভিন্ন কোম্পানিতে অল্টম্যানের বিনিয়োগের তালিকা রয়েছে। যার মধ্যে ফিউশন পাওয়ার উৎপাদনকারী কোম্পানি ‘হেলিওন এনার্জি’তে অল্টম্যানের ১৭০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে।
মোলো এসব কোম্পানির সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে অল্টম্যানের ভূমিকার সমালোচনা করে অভিযোগ তোলেন, এখানে স্বার্থের সংঘাত রয়েছে।