Published : 20 Mar 2026, 12:07 PM
শত শত বছর ধরে নাবিক ও অভিযাত্রীদের পথ দেখানো পৃথিবীর চৌম্বকীয় উত্তর মেরু এখন আর আগের জায়গায় স্থির নেই। গত কয়েক দশকে তা কানাডার সীমানা ছেড়ে বিস্ময়কর গতিতে সাইবেরিয়ার দিকে ছুটে চলেছে।
দীর্ঘ গবেষণার পর এই রহস্যময় দৌড়ের আসল কারণ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
আমেরিকান বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তি সাইট পপুলার মেকানিক্স প্রতিবেদনে লিখেছে, ১৮৩১ সালে ব্রিটিশ মেরু অভিযাত্রী জেমস ক্লার্ক যখন কানাডার নুনাভাট অঞ্চলের বুথিয়া উপদ্বীপে প্রথমবারের মতো চৌম্বকীয় উত্তর মেরু শনাক্ত করেন তখন থেকেই অনেক সতর্কতার সঙ্গে এর অবস্থান মেপে আসছেন বিজ্ঞানীরা।
যুক্তরাজ্য ও ডেনমার্কের গবেষকরা এ স্থান পরিবর্তনের কারণ খুঁজে বের করেছেন। তাদের দাবি, এর কারণ পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছে থাকা দুটি শক্তিশালী চৌম্বকীয় তরঙ্গের মধ্যে চলা এক অদৃশ্য লড়াই।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার জিওসায়েন্স’-এ।
গবেষণাপত্রে গবেষকরা লিখেছেন, “পৃথিবীর চৌম্বকীয় মেরুর এই বিচরণ বা ঘুরে বেড়ানো বিজ্ঞানীদের কাছে দীর্ঘকাল ধরেই এক আকর্ষণীয় গবেষণার বিষয়।”
পৃথিবীর কেন্দ্রের বাইরে থাকা গলিত লোহার মাধ্যমেই এর চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি হয়। এ তরল লোহার প্রবাহই কোনো গ্রহের চৌম্বক মেরুগুলোর অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে।
পৃথিবীর দীর্ঘ ইতিহাসে এসব মেরু বহুবার এদের অবস্থান বদলেছে, উল্টেও গেছে, অর্থাৎ উত্তর মেরু দক্ষিণে ও দক্ষিণ মেরু উত্তরে অবস্থান নিয়েছে।
তবে এবারের পরিবর্তনের বিশেষত্ব হচ্ছে, এর অস্বাভাবিক গতি। ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে পৃথিবীর চৌম্বকীয় উত্তর মেরুর সরে যাওয়ার গতি বছরে সর্বোচ্চ ৯ মাইল থেকে বেড়ে এক লাফে বছরে ৩৭ মাইল পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এ গবেষণায় ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির ‘সোয়ার্ম’ স্যাটেলাইট মিশনের ২০ বছরের তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, গত দুই দশকে উত্তর চৌম্বকীয় মেরুর অবস্থান কানাডা ও সাইবেবিয়ার নিচে ‘কোর ম্যান্টল বাউন্ডারি’ বা পৃথিবীর কেন্দ্রের বাইরের স্তরে থাকা দুটি বিশাল চৌম্বকীয় শক্তির ওপর নির্ভর করছে।
১৯৭০ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে পৃথিবীর কেন্দ্রে বাইরের থাকা গলিত চৌম্বকীয় পদার্থের প্রবাহে পরিবর্তন আসে।
গবেষকরা বলছেন, এ পরিবর্তনের কারণে কানাডার নিচে থাকা বিশাল চৌম্বকীয় ক্ষেত্রটি ২০০০ সালের শুরুর দিকে ধীরে ধীরে লম্বাটে হয়ে যায়, যা পৃথিবীর উপরিভাগে ওই অঞ্চলের চৌম্বকীয় শক্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে।
অবশেষে কানাডার নিচে থাকা সেই গলিত পদার্থের পিণ্ডটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে এর শক্তিশালী অংশটি ধীরে ধীরে সাইবেরিয়ার নিচে থাকা পিণ্ডটির দিকে সরে যায়। এ ঘটনাই চৌম্বকীয় উত্তর মেরুকে সাইবেরিয়ার আরও কাছে ঠেলে দেয়। কারণ সেখানে চৌম্বকীয় আকর্ষণ শক্তি তখন বেশি ছিল।
২০১৭ সালে চৌম্বকীয় উত্তর মেরুটি প্রকৃত ভৌগোলিক মেরুর কেবল ২৪০ মাইলের মধ্যে চলে আসে। সম্প্রতি ‘ওয়ার্ল্ড ম্যাগনেটিক মডেল ২০২৫’ প্রকাশের মাধ্যমে এনওএএ ও ব্রিটিশ জিওলজিক্যাল সার্ভে একটি হালনাগাদ মডেল তৈরি করেছে।
এ মডেলে প্রথমবারের মতো ‘হাই রেজুলিউশন’ সংস্করণও এনেছেন গবেষকরা, যাতে দিকনির্ণয় ব্যবস্থা পৃথিবীর এ পরিবর্তনশীল চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে এবং মেরু অঞ্চলের ‘ব্ল্যাকআউট জোন’ বা তথ্যহীন বিভিন্ন এলাকার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়।
বর্তমানে উত্তর মেরুটি কানাডিয়ান আর্কটিক ছেড়ে বছরে প্রায় ২৮ মাইল বেগে সাইবেরিয়ার দিকে নিজের যাত্রা অব্যাহত রেখেছে।
ভবিষ্যতে এ মেরু কোন দিকে যেতে পারে তা বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর কেন্দ্রের কতগুলো গাণিতিক মডেল তৈরি করেছেন।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ লিডস’-এর ভূ-পদার্থবিদ ফিল লিভারমোর বলেছেন, “আমাদের পূর্বাভাস বলছে, উত্তর মেরু সাইবেরিয়ার দিকেই এগিয়ে যাবে। তবে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আগাম ধারণা দেওয়াটা বেশ চ্যালেঞ্জিং ও এ বিষয়ে আমরা একদম নিশ্চিত হতে পারছি না।”
এ স্থান পরিবর্তনের ফলে বৈশ্বিক দিকনির্ণয় ব্যবস্থা বা ন্যাভিগেশন সিস্টেমে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।
সমুদ্রের জাহাজ থেকে শুরু করে মানুষের পকেটে থাকা স্মার্টফোন, যে কোনো যন্ত্র যা কম্পাস ব্যবহার করে সবকিছুর ওপরই পৃথিবীর এই চৌম্বকীয় ‘রশি টানাটানি’ খেলার প্রভাব পড়ছে।