Published : 31 Mar 2026, 03:40 PM
২০২৪ সালে মাথায় অস্ত্রোপচার করাতে একবারও দ্বিধা করেননি গ্যালেন বাকওয়াল্টার। তার লক্ষ্য ছিল, পক্ষাঘাতে আক্রান্ত অন্যদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খোলা।
৬৯ বছর বয়সী এই গবেষণা মনোবিজ্ঞানী দীর্ঘদিন ধরেই কোয়াড্রিপ্লেজিক। কৈশোরে ঘটা এক সড়ক দুর্ঘটনায় বুকের নিচ থেকে অবশ হয়ে যায় তার শরীর।
তার মস্তিষ্কে বসানো ব্ল্যাকরক নিউরোটেকের ছয়টি চিপ স্নায়ুর সংকেত পড়ে এবং নড়াচড়ার ইচ্ছা বুঝে নেয়। প্রযুক্তি সাইট ওয়্যার্ডে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এতে তিনি যে শুধু চিন্তা দিয়ে কম্পিউটার চালাতে পারেন, তাই নয়, হারিয়ে যাওয়া আঙুলের অনুভূতিও কিছুটা ফিরে পেয়েছেন।
আর এখন, সেই প্রযুক্তি দিয়েই বানাচ্ছেন সুর।
ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেইস বা বিসিআই নামে পরিচিত এই প্রযুক্তি তৈরি করছে প্যারাড্রোমিকস, সিনক্রন এবং ইলন মাস্কের নিউরালিঙ্কসহ আরও কয়েকটি কোম্পানি। মূল লক্ষ্য গুরুতর শারীরিক অক্ষমতায় ভোগা মানুষের যোগাযোগ ও নড়াচড়া ফিরিয়ে আনা। তবে বাকওয়াল্টারের অভিজ্ঞতা এখন নতুন আশা জাগাচ্ছে, এটি সৃজনশীলতার নতুন পথও খুলে দিতে পারে।
লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক পাঙ্ক ব্যান্ড ‘সিগি’র সদস্য বাকওয়াল্টার। ক্যালটেকের গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী শন ডারসির সঙ্গে কাজ করে তিনি এমন একটি অ্যালগরিদম পেয়েছেন, যা তার চিন্তাকে সুরে রূপ দেয়।
কীভাবে শুরু হলো এই যাত্রা? প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “ইমপ্লান্ট বসানোর আগেই ইউটিউবে মাশরুমে ইলেকট্রোড লাগিয়ে শব্দ তৈরির একটি ভিডিও দেখি। তখনই মনে হয়েছিল, যদি মাশরুম এমন শব্দ করতে পারে, আমার মস্তিষ্কের শব্দ কেমন?”
এই ভাবনা থেকেই গবেষকদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেন তিনি। পরে শন ডারসি এমন সফটওয়্যার তৈরি করেন, যা চিন্তাকে সুর নিয়ন্ত্রণে রূপ দেয়।
এই প্রক্রিয়ায় প্রতিটি নিউরনের একটি নির্দিষ্ট সক্রিয়তার মাত্রা থাকে। বাকওয়াল্টার বলেন, “আমি যদি পায়ের আঙুল নড়ানোর কথা ভাবি, কিছু নির্দিষ্ট চ্যানেল সক্রিয় হয়। সেই সংকেতকে শন একটি সুরের সঙ্গে যুক্ত করেন। আমি সক্রিয় করলে পিচ বাড়ে, কমালে নিচে নামে।”
এখন তিনি একসঙ্গে দুটি সুর তৈরি করতে পারেন। তবে এর বেশি হলে বিষয়টি কঠিন হয়ে যায়। “এটা যেন একসঙ্গে মাথা চুলকানো আর পেট চাপড়ানোর মতো,” বলেন তিনি।
শুধু সুরই নয়, তৈরি হয়েছে এক ধরনের ভার্চুয়াল কিবোর্ড। নির্দিষ্ট মাত্রা পার হলে সুর বাজে, আবার কমলে থেমে যায়। এতে ধীরে ধীরে বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অনুভূতি তৈরি হচ্ছে।
তবে এই প্রক্রিয়া শেখা সহজ নয়। প্রতিদিন একই নিউরন কাজ নাও করতে পারে। তাই নতুন করে খুঁজে নিতে হয় কোন স্নায়ু সক্রিয় হচ্ছে এবং কীভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করবেন।
বাকওয়াল্টার বলেন, “আমাদের মস্তিষ্কের আলাদা আলাদা নিউরন নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এটা ভাবতেই অবাক লাগে।”
সংগীত তার জীবনের বড় অংশ। প্রায় ২৯ বছর ধরে ব্যান্ড ‘সিগি’র সঙ্গে আছেন তিনি। সম্প্রতি তাদের ‘ওয়্যারহেড’ গানটিতে ব্যবহার করা হয়েছে তার মস্তিষ্ক থেকে তৈরি সুর।
তবে বিসিআই গবেষণার বর্তমান ধারা নিয়ে কিছুটা হতাশাও আছে তার। “গবেষকরা নিজেদের পরীক্ষাতেই বেশি মনোযোগ দেন। অংশগ্রহণকারীদের জীবন কীভাবে আরও আকর্ষণীয় করা যায়, সেটাও ভাবা উচিত,” বলেন তিনি।
তার মতে, প্রযুক্তি সফল হতে হলে ব্যবহারকারীদের কাছে তা উপভোগ্য হতে হবে। “মানুষ যেন এই অভিজ্ঞতাকে ভালোবাসে, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
প্রথমবার নিজের মস্তিষ্কের সিগনাল দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন তিনি। “মস্তিষ্কের নিউরন জ্বলছে, আর আমি তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি—এটা অবিশ্বাস্য। যখন ভাবি আর হঠাৎ একটি সুর বাজে, মনে হয়, এটা সত্যিই মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা।”
ভবিষ্যতে পুরো গানই শুধু মস্তিষ্ক দিয়ে তৈরি করতে চান তিনি। ইতিমধ্যে সেই পথে পরীক্ষাও শুরু হয়েছে।
বাকওয়াল্টারের কথায়, “আমি জানি, সারা জীবনই আমি কোয়াড্রিপ্লেজিক থাকব। কিন্তু এই প্রযুক্তি আমাকে নতুনভাবে সৃষ্টিশীল হতে দিচ্ছে।”
“এটা দারুণ শক্তি দেয়।”