Published : 11 Feb 2026, 11:51 AM
বিজ্ঞানীদের সামনে ১০ লাখ বছর আগের প্রাচীন বনের এক ঝলক দেখার সুযোগ করে দিয়েছে নিউ জিল্যান্ডের নর্থ আইল্যান্ডের এক গুহায় আবিষ্কৃত বিশাল জীবাশ্ম ভাণ্ডার। ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া সেই খণ্ডের গল্প উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
আমেরিকান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ম্যাগাজিন পপুলার মেকানিক্স প্রতিবেদনে লিখেছে, এসব আবিষ্কারের মধ্যে রয়েছে ১২ প্রজাতির প্রাচীন পাখি এবং চার প্রজাতির ব্যাঙের জীবাশ্ম, যার মধ্যে পাখির বেশ কয়েকটি প্রজাতি আগে কখনোই দেখা যায়নি।
সব মিলিয়ে এসব জীবাশ্ম এমন এক প্রাচীন বিশ্বের ছবি তুলে ধরেছে, যা বর্তমান সময়ের তুলনায় একেবারে আলাদা।
অস্ট্রেলিয়া লাগোয়া দ্বীপ দেশটিতে আধুনিক মানুষের আগমন ঘটেছে প্রায় ৭৫০ বছর আগে। তারও আগে সেখানকার প্রাণীরা কীভাবে বিলুপ্ত হয়েছিল সেই বৈজ্ঞানিক তথ্যের বড় এক শূন্যস্থান পূরণ করেছে এ আবিষ্কার।

এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘আলচেরিঙ্গা: অ্যান অস্ট্রেলিয়ান জার্নাল অফ প্যালিওন্টোলজি’তে।
এক বিবৃতিতে এ গবেষণার প্রধান লেখক ও ‘ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটি’র সহযোগী অধ্যাপক ট্রেভর ওয়ার্থি বলেছেন, “গুহাটি নিউ জিল্যান্ডের এমন এক ধরনের পাখির জগৎ, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা আগে জানতাম না। আজ থেকে ১০ লাখ বছর আগে মানুষ যখন নিউ জিল্যান্ডে আসে তখন তারা যে ধরনের পাখি দেখেছিল এ প্রাচীন পাখিরা ছিল তাদের থেকেও একেবারে আলাদা।
“এ বিস্ময়কর আবিষ্কারটি আমাদের ইঙ্গিত দেয়, নিউ জিল্যান্ডের প্রাচীন বিভিন্ন বনে একসময় এমন অনেক বৈচিত্র্যময় পাখির বাস ছিল যারা পরবর্তী ১০ লাখ বছর আর টিকে থাকতে পারেনি।”
আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের দুটি স্তরের মাঝখানে এসব জীবাশ্মের সন্ধান পেয়েছে গবেষক দলটি। এ স্তর দুটি ভিন্ন ধরনের বড় আকারের অগ্নুৎপাত থেকে তৈরি হয়েছিল। যার প্রথমটি ঘটেছিল ১৫.৫ লাখ বছর আগে এবং দ্বিতীয়টি ১০ লাখ বছর আগে। এসব জীবাশ্মের মধ্যে থাকা অনেক প্রজাতিই নিউ জিল্যান্ডে মানুষের পা রাখার আগেই বিলুপ্ত হয়েছিল।
এ গবেষণার সহ-লেখক ও ‘ক্যান্টারবেরি মিউজিয়াম’-এর কিউরেটর পল স্কোফিল্ড বলেছেন, তাদের অনুমান ওই ১০ লাখ বছরে দ্বীপটির প্রায় ৩৩ থেকে ৫০ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। এ ব্যাপক বিলুপ্তির কারণ হিসেবে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন ও ভয়াবহ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতকে দায়ী করেছেন তারা।
ওয়ার্থি বলেছেন, “কয়েক দশক ধরে নিউ জিল্যান্ডের পাখিদের বিলুপ্ত হওয়ার ঘটনাকে ৭৫০ বছর আগে মানুষের আগমনের প্রেক্ষাপটেই দেখা হত। তবে এ গবেষণায় প্রমাণ মেলে, অতি আগ্নেয়গিরি ও নাটকীয় জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তি ১০ লাখ বছর আগেই বন্যপ্রাণীদের এক অনন্য পরিচয় তৈরি করে দিচ্ছিল।”
এসব আবিষ্কারের মধ্যে বিজ্ঞানীরা সবচেয়ে বেশি রোমাঞ্চিত হয়েছেন নতুন প্রজাতির এক তোতা পাখির আবিষ্কার নিয়ে, যা নিউ জিল্যান্ডের ডানাভারী পাখি ‘কাকাপো’র এক প্রাচীন আত্মীয়।
গবেষকদের ধারণা, আধুনিক কাকাপো উড়তে না পারলেও এদের এ পূর্বপুরুষ হয়ত উড়ত। জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ প্রাচীন পাখিটির পা বর্তমানের কাকাপোর চেয়ে দুর্বল। যার মানে আধুনিক কাকাপো যেমন গাছে চড়তে খুব পটু এ প্রাচীন পাখিটি সম্ভবত তেমন ছিল না। তবে এ পাখিটি আসলেই উড়তে পারত কি না তা নিশ্চিতভাবে জানার জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন তারা।
গবেষকরা বর্তমান সময়ের ‘টাকাহে’ পাখির এক পূর্বপুরুষের জীবাশ্মেরও খোঁজ পেয়েছেন, যা এ পাখিটি সম্পর্কে আরও গবেষণার পথ খুলে দিয়েছে। এ ছাড়া, অস্ট্রেলিয়ার ‘ব্রোঞ্জউইং’ কবুতরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত বিলুপ্ত এক প্রজাতির কবুতরের জীবাশ্ম দেখেও বেশ উচ্ছ্বসিত গবেষকরা।
এ পরিবর্তন সম্পর্কে এ গবেষণার সহ লেখক পল স্কোফিল্ড বলেছেন, “বনভূমি ও ঝোপঝাড়ের প্রকৃতির ক্রমাগত পরিবর্তন পাখিদের সংখ্যা ও ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে বাধ্য করেছিল। আমাদের অনুমান, নর্থ আইল্যান্ডের পাখি ও অন্যান্য প্রাণীদের বিবর্তনীয় বৈচিত্র্যের পেছনে এটিই ছিল প্রধান চালিকাশক্তি।”
স্কোফিল্ড বলেছেন, আগের বিভিন্ন খনন কাজে নিউ জিল্যান্ডে দুই কোটি থেকে এক কোটি ৬০ লাখ বছর আগের প্রাণের অস্তিত্ব মিলেছিল। তবে এর বিপরীতে, এসব নতুন আবিষ্কার এক কোটি ৫০ লাখ থেকে ১০ লাখ বছর আগের সময়ের প্রাণের প্রথম প্রমাণ দিচ্ছে।
“এ আবিষ্কার কেবল নিউ জিল্যান্ডের প্রাচীন ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া এক অধ্যায়ই নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া খণ্ডও।”