Published : 01 Oct 2025, 04:35 PM
পৃথিবীর উত্তরের আলো অরোরার মতোই জ্বলজ্বল এক ভবঘুরে গ্রহের খোঁজ দিয়েছে নাসার জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ।
এমন এক আবহাওয়ার খবর কল্পনা করুন, যা পৃথিবী থেকে নয়, বরং অদ্ভুত ও একাকী এক গ্রহ থেকে এসেছে। যে গ্রহের কোনো সূর্য নেই, কোনো তারাকে কেন্দ্র করে ঘোরে না। গ্রহটি কেবলই নিঃশব্দে আর নিঃসঙ্গভাবে মহাকাশের অন্ধকারে নিঃসঙ্গ ভেসে বেড়াচ্ছে।
নাসার শক্তিশালী জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের সাহায্যে এ দৃশ্যটিই আমাদের উপহার দিয়েছেন ‘ট্রিনিটি কলেজ ডাবলিন’-এর জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
তাদের পর্যবেক্ষণের বিষয় ছিল পৃথিবীর সৌরজগতের বাইরের নিকটবর্তী ‘এসআইএমপি-০১৩৬’ নামের এক ভবঘুরে বা তারাহীন গ্রহ। বিস্ময়কর অরোরার দেখা মিলেছে এ গ্রহে, যা দেখতে অনেকটা পৃথিবীর উত্তর মেরুর আলো বা বৃহস্পতি গ্রহে দেখা অতি শক্তিশালী অরোরার দৃশ্যের মতোই বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
এটি কোনো সাধারণ গ্রহ নয়। আমাদের সৌরজগতের বিভিন্ন গ্রহ যেখানে সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে, সেখানে এ ‘মুক্তভাসমান’ গ্রহটি মহাকাশে কোনো তারাকে কেন্দ্র না করেই একেবারে একা ঘুরে বেড়ায়।
অত্যন্ত উত্তপ্ত এ গ্রহটির পৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ১ হজার ৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছে যায়, পৃথিবীতে যে তাপমাত্রায় অনেক ধাতুই গলে যায়।
জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের অসাধারণ সংবেদনশীলতা ব্যবহার করে গ্রহটির ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে এর উজ্জ্বলতার ছোট ছোট বিভিন্ন পরিবর্তনও পর্যবেক্ষণ করেছে গবেষণা দলটি।
এসব পরিবর্তন থেকে গ্রহটির বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে অনেক তথ্য মিলেছে, যেমন এর তাপমাত্রা, রাসায়নিক উপাদান, এমনকি ঝড়ের মতো কার্যকলাপের লক্ষণও। আর প্রথমবারের মতো এবারই কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন সরাসরি পরিমাপ করতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘অ্যাস্ট্রোনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স’-এ। এ গবেষণার প্রধান লেখক ড. এভার্ট নাসেডকিন বলেছেন, “আমাদের সৌরজগতের বাইরে থাকা কোনো বস্তু, যেমন এই ভবঘুরে গ্রহের বায়ুমণ্ডল নিয়ে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সঠিক ও বিস্তারিত পরিমাপ করেছি আমরা।
“সঠিক পর্যবেক্ষণের কারণে আমরা পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও ছোট তাপমাত্রার বিভিন্ন পরিবর্তন রেকর্ড করতে পেরেছি। এসব পরিবর্তন গ্রহটির বায়ুমণ্ডলের রাসায়নিক গঠন বদলে যাওয়ার সঙ্গেও জড়িত। এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, বৃহস্পতি গ্রহের গ্রেট রেড স্পটের মতো নতুন গ্রহটিতেও সম্ভবত বড় আকারে কোনো ঝড় হচ্ছে।”
তাপমাত্রা ও রাসায়নিক গঠনে পরিবর্তন থাকলেও, গ্রহটির মেঘ নিয়ে বিস্ময়কর তথ্য মিলেছে। পৃথিবীর মেঘ সবসময় বদলায়, যেমন– কখনো আকাশ পরিষ্কার হয়, আবার কখনো মেঘ জমে। তবে নতুন গ্রহটিতে মেঘের আচ্ছাদনে প্রায় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
গবেষণা দলটি বলেছে, পুরো গ্রহটি জড়েই মেঘ স্থির রয়েছে। এসব মেঘ আমাদের পৃথিবীর মতো জলীয় বাষ্প দিয়ে তৈরি নয়, বরং সিলিকেট অণু দিয়ে গঠিত, যা মূলত গরম বায়ুমণ্ডলে ভাসমান ছোট ছোট বালি কণার মতো।
গ্রহটিতে সবচেয়ে বিস্ময়কর আবিষ্কারের মধ্যে একটি ছিল এর অরোরা বা আলো ঝলমলে কার্যকলাপ। ঠিক যেমনটি দেখা যায় পৃথিবীর উত্তর মেরুর আলোয়। এসব আলো তখনই দেখা যায় যখন কোনো গ্রহের চৌম্বক ক্ষেত্র ও এর বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে।
গ্রহটির অরোরা এতটাই শক্তিশালী যে তা এর উপরিভাগের বায়ুমণ্ডলকেও গরম করে তোলে, এ প্রক্রিয়াটি বৃহস্পতি গ্রহেও ঘটে। তবে নতুন গ্রহটিতে এমন ঘটনা আরও তীব্র মাত্রায় ঘটছে।
ট্রিনিটি কলেজের নতুন গবেষণা দল ‘এক্সো-আইমসি’-এর প্রথম প্রকাশনা এ গবেষণা। দলটি পরিচালনা করছেন অধ্যাপক জোহানা ভস। আমাদের সৌরজগতের বাইরের আবহাওয়া নিয়ে গবেষণার জন্য দলটিতে একসঙ্গে মিলে কাজ করছেন গবেষক ও পিএইচ.ডি. গবেষণার্থীরা।
তাদের এ কাজ ‘বস্টন ইউনিভার্সিটি’র আগের এক গবেষণার উপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও নতুন গবেষণাটি আরও এক ধাপ এগিয়ে উন্নত বিশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রহটির বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে।
গবেষণা দলটি বলেছে, আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য বায়ুমণ্ডলের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য প্রকাশ করে, বিষয়টি পৃথিবীর আকাশের রঙের পরিবর্তন দেখে আমরা মেঘ বা বাতাসের অবস্থা সম্পর্কে যেমন ধারণা পাই তেমনই।
এসব রঙের পরিবর্তনকে উন্নত মডেলের সঙ্গে মিলিয়ে গ্রহটির তাপমাত্রা, রাসায়নিক গঠন ও মেঘের বিন্যাসের মানচিত্র তৈরি করেছেন গবেষকরা।
অধ্যাপক ভস বলেছেন, “এ গবেষণা খুবই রোমাঞ্চকর, কারণ এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, জেমস ওয়েব থেকে পাওয়া অসাধারণ তথ্যের ওপর অত্যাধুনিক মডেলিং কৌশল প্রয়োগ করে আমরা সৌরজগতের বাইরের বিভিন্ন জগতের আবহাওয়া কীভাবে কাজ করে তা বোঝার পথ তৈরি করতে পারি। এসব প্রক্রিয়া বোঝা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা যখন ভবিষ্যতে আরও গভীরভাবে এক্সোপ্ল্যানেট বা বাইরের বিভিন্ন গ্রহ নিয়ে গবেষণা করব তখন আমাদের পথ দেখাবে এসব তথ্য।
তবে এই মুহূর্তে নতুন গ্রহটি আমাদের সেই ভিনগ্রহের আবহাওয়ার রহস্যময় রূপেরই ঝলক দেখাচ্ছে, যা গাঢ় অন্ধকারে একা ভেসে বেড়ানো বিভিন্ন অজানা গ্রহে ঘটছে, যেগুলোর একমাত্র আলো হচ্ছে এদের নিজস্ব অরোরা।