Published : 21 May 2026, 05:11 PM
শেয়ার বাজারে আসার আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্স। ওয়াল স্ট্রিটের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এই আইপিও’র হাত ধরে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার বা লক্ষ কোটি ডলারের মালিক হতে যাচ্ছেন মাস্ক।
বিবিসি লিখেছে, স্পেসএক্স যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারে আসার আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা ঘোষণার ফলে এখন থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বাজারের মাধ্যমে কোম্পানিটির শেয়ার কেনাবেচা করতে পারবেন।
রকেট তৈরির পাশাপাশি স্পেসএক্সের রয়েছে বিশ্বজুড়ে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা। মাস্কের আলোচিত ও বিতর্কিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই স্টার্টআপ ‘এক্সএআই’-এর মালিকানাও রয়েছে এই স্পেসএক্সের অধীনেই।
যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ার বাজারে স্পেসএক্সের এ আইপিও বা প্রাথমিক গণপ্রস্তাব হতে যাচ্ছে ওয়াল স্ট্রিটের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা। আগামী মাসেই ‘এসপিসিএক্স’ কোড নাম নিয়ে শেয়ার বাজারে কোম্পানিটির লেনদেন শুরু হতে পারে।
স্পেসএক্সের সিংহভাগ শেয়ারের মালিক বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ ধনী মাস্ক। ফলে এ আইপিও’র হাত ধরে তিনি পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ট্রিলিয়নেয়ার হতে পারেন।
স্পেসএক্স নিজেদের বাজারমূল্য প্রায় ১.৭৫ ট্রিলিয়ন থেকে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের মধ্যে নির্ধারণ করেছে। সেই হিসাবে কোম্পানিতে মাস্কের যে শেয়ার রয়েছে তার মূল্যই দাঁড়াবে প্রায় ৬০ হাজার কোটি ডলারের বেশি।
গত বছরই ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ৫০ হাজার কোটি ডলারের পাহাড়সম সম্পদের মালিক হওয়ার রেকর্ড গড়েছিলেন বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি টেসলা প্রধান। ফলে, স্পেসএক্সের এ নতুন যাত্রা তার মোট সম্পদকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের গণ্ডি পার করিয়ে দেবে।
এ আইপিও আবেদনের মধ্য দিয়ে স্পেসএক্সের আসল আর্থিক চিত্রটি সবার সামনে এল, যা দেখার জন্য বিশ্ববাজার দীর্ঘদিন ধরেই অপেক্ষায় ছিল।
কোম্পানিটির অফিসিয়াল বা প্রাতিষ্ঠানিক নাম ‘স্পেস এক্সপ্লোরেশন টেকনোলজিস’ বা স্পেসএক্স, এবং গত বছর কোম্পানিটি ১ হাজার ৮৬০ কোটি ডলার আয় করেছিল।
তবে বছর শেষে তাদের নিট লোকসান দাঁড়িয়েছিল ৪৯০ কোটি ডলারে। এ বছরের প্রথম তিন মাসে কোম্পানিটি ৪৭০ কোটি ডলারের বিক্রি করলেও এই সামান্য সময়েই তাদের লোকসান হয়েছে ৪৩০ কোটি ডলার।
অন্যদিকে, স্পেসএক্সের হিসাবের খাতা খতিয়ে দেখলে দেখা যায়, রকেট ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি মিলিয়ে তাদের মোট সম্পদের পরিমাণ ১০ হাজার ২০০ কোটি ডলার। এর বিপরীতে কোম্পানিটির কাঁধে রয়েছে ৬ হাজার ৫০ কোটি ডলারের মোটা অংকের ঋণ।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেঞ্চার ক্যাপিটাল কোম্পানি ‘সিট্রিন ভেঞ্চার পার্টনার্স’-এর ম্যানেজিং পার্টনার রুথ ফক্স-ব্লেডার বলেছেন, “আইপিও’তে যাওয়ার মুহূর্তেও এই ধরনের মেগা প্রজেক্ট বা প্রকল্প লোকসানে থাকাটা মোটেও অবাক হওয়ার মতো কোনো বিষয় নয়।”
তিনি বলেছেন, শেয়ার বাজারে আসার এ পরিকল্পনাটি আগে থেকেই অনুমান করা যাচ্ছিল। তবে বিষয়টি নিঃসন্দেহে ‘চরম উত্তেজনাপূর্ণ’ ঘটনা।
“স্পেসএক্স আসলে বড় ও সুদূরপ্রসারী প্রজেক্ট, যার অনেকগুলো আকর্ষণীয় দিক রয়েছে এবং এর প্রতিটি দিকই আমাদের ভবিষ্যতের পথ দেখায়।”
আইপিও’র নথিতে স্পেসএক্স বলেছে, তাদের বিরুদ্ধে চলমান একগুচ্ছ মামলার খরচ মেটাতেই আগামীতে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বেশি খরচ হতে পারে। যার মধ্যে বেশ কিছু মামলা হয়েছে মাস্কের এআই স্টার্টআপ এক্সএআইয়ের চ্যাটবট গ্রক-এর বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, এ চ্যাটবট ব্যবহার করে আসল নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের আপত্তিকর বা যৌন বিকৃত ডিপফেইক বা নকল ছবি ও ভিডিও তৈরি করা হচ্ছে।
মাস্ক বলেছেন, তিনি এক্সএআই পুরোপুরি বিলুপ্ত করে স্পেসএক্সের অধীনেই নিজের এআই নিয়ে বিভিন্ন স্বপ্ন পূরণ করতে চান।
২০২২ সালে মাস্কের কিনে নেওয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এর মালিকানাও এখন স্পেসএক্সের অধীনেই রয়েছে।
আইপিও আবেদনের তথ্য অনুসারে, স্পেসএক্সের বিরুদ্ধে অন্যান্য চলমান মামলার তালিকায় রয়েছে, পেটেন্ট বা স্বত্বাধিকার লঙ্ঘন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কনটেন্ট মডারেশন বা তথ্য নিয়ন্ত্রণ আইন অমান্য করা, মিউজিক বা গানের কপিরাইট লঙ্ঘন এবং গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁসের মতো গুরুতর সব অভিযোগ।

এআই প্রতিদ্বন্দ্বী ও ব্যবসায়িক চুক্তি
বুধবার জমা দেওয়া আইপিও নথিতে আরেকটি বড় তথ্য ফাঁস হয়েছে।
এআই বাজারে স্পেসএক্সের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ও জনপ্রিয় চ্যাটবট ‘ক্লড’-এর নির্মাতা কোম্পানি অ্যানথ্রপিক-এর সঙ্গে স্পেসএক্সের বড় এক আর্থিক চুক্তি হয়েছে।
চুক্তি অনুসারে, স্পেসএক্সের সদ্য অধিগ্রহণ করা কোম্পানি এক্সএআইয়ের বিভিন্ন ডেটা সেন্টার ব্যবহারের জন্য অ্যানথ্রপিক প্রতি বছর দেড় হাজার কোটি ডলার পরিশোধ করবে। আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে এসব ডেটা সেন্টার অবস্থিত।
নানা বিতর্কের কারণে এআই নিয়ে মাস্কের বিভিন্ন পরিকল্পনা কিছুটা ধাক্কা খেলেও স্পেসএক্সের মূল রকেট ব্যবসা ও স্যাটেলাইট ইন্টারনেট স্টারলিংক পুরো বিশ্বে নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছে। এ দুটি খাতেই কোম্পানিটি তাদের সব প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে অনেকখানি এগিয়ে রয়েছে।
শেয়ার বাজারে আসার এ আবেদনটি এমন এক সময়ে এল যার কেবল কয়েকদিন আগেই মাস্ক তার প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি ওপেনএআই ও এর প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে এক হাইপ্রোফাইল আইনি লড়াইয়ে হেরেছেন।
মাস্কের অভিযোগ ছিল, তিনি শুরুতে লাখ লাখ ডলার অনুদান দেওয়ার পর চ্যাটজিপিটি’র নির্মাতা কোম্পানি ওপেনএআইকে অলাভজনক থেকে লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তর করে চুক্তি ভঙ্গ করেছেন অল্টম্যান।
তবে আদালতের জুরি বোর্ড সর্বসম্মতিক্রমে মাস্কের এ মামলাটি খারিজ করে দিয়েছে। আদালত বলেছে, ২০২৪ সালে মামলাটি দায়ের করতে মাস্ক অনেক দেরি করে ফেলেছেন। যার ফলে আইনি সময়সীমা পার হয়ে গেছে।
মামলার শুনানিতে মাস্ক নিজে স্বীকার করেছিলেন, ওপেনএআইয়ের তুলনায় তার নিজের এআই স্টার্টআপ এক্সএআই এখনও অনেক ছোট। ওপেনএআই’ও খুব শিগগিরই শেয়ার বাজারে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এ সপ্তাহেই স্পেসএক্সের তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে বড় রকেট স্টারশিপের ‘ভার্সন ৩’ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করার কথা রয়েছে।
তবে এরইমধ্যে নিজেদের কারখানায় কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা ও তাদের ঝুঁকিতে ফেলার কারণে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে কোম্পানিটি।
পাশাপাশি, মাস্কের ডানপন্থী রাজনীতি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা নিয়েও সমালোচনা কম হচ্ছে না। গেল সপ্তাহেই মাস্ক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে চীন সফরে গিয়েছিলেন।