Published : 15 Feb 2026, 03:37 PM
চারজন নভোচারীকে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে বা আইএসএসে নিয়ে গেছে স্পেসএক্স। আট মাসের এই দীর্ঘ অভিযানে অংশ নিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও রাশিয়ার অভিজ্ঞ নভোচারীরা।
রয়টার্স লিখেছে, শুক্রবার ভোরে ফ্লোরিডার আটলান্টিক উপকূল থেকে কক্ষপথের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে স্পেসএক্সের ‘ফ্যালকন ৯’ রকেটটি। এ অভিযানে অংশ নেওয়া চারজন নভোচারীর মধ্যে রয়েছেন নাসার দুইজন, ফ্রান্সের একজন ও রাশিয়ার একজন। আইএসএসে আট মাস ওজনহীন পরিবেশে বিভিন্ন গবেষণা করবেন তারা।
এ অভিযানটির নাম ‘ক্রু-১২’। দুই স্তরওয়ালা ‘ফ্যালকন ৯’ রকেটটি ফ্লোরিডার আটলান্টিক উপকূলে অবস্থিত কেপ ক্যানাভেরাল স্পেস ফোর্স স্টেশন থেকে স্থানীয় সময় ভোর ৫ টা ১৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪:১৫ মিনিট) উৎক্ষেপিত হয়।
রকেটটির মাথায় রয়েছে ‘ফ্রিডম’ নামের স্বয়ংক্রিয় এক ‘ক্রু ড্রাগন’ ক্যাপসুল, যা স্থানীয় সময় শনিবার বিকেল ৩ টা ১৫ মিনিটে মহাকাশ স্টেশনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডকিং করেছে।
এ মিশনটি সরাসরি সম্প্রচার করেছে নাসা ও স্পেসএক্স, যেখানে দেখা যাচ্ছে, নয়টি মার্লিন ইঞ্জিনের গর্জনে আকাশ কাঁপিয়ে উঠে গেছে ২৫ তলা সমান উঁচু রকেটটি। এসব ইঞ্জিন প্রতি সেকেন্ডে সাড়ে ২৬ লাখ লিটার জ্বালানি ব্যবহার করেছে, যা থেকে প্রচুর ধোঁয়া ও আগুনের গোলা তৈরি হয়ে ভোরের অন্ধকার আকাশকে আলোকিত করে দিয়েছিল।
‘দারুণ এক যাত্রা’
উৎক্ষেপণের নয় মিনিটের মাথায় ফ্যালকন ৯ রকেটের ওপরের অংশটি ঘণ্টায় ২৭ হাজার ৩৬০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে ‘ক্রু ড্রাগন’ ক্যাপসুলটিকে কক্ষপথে পৌঁছে দিয়েছে। ঠিক সেই সময়ে রকেটটির পুনরায় ব্যবহারযোগ্য বুস্টারটি সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসে ও কেপ ক্যানাভেরালের ল্যান্ডিং প্যাডে অবতরণ করে।
৩৪ ঘণ্টার এক দীর্ঘ যাত্রা শেষে শনিবার বিকেলে এই চারজন মহাকাশচারী মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছেছেন। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪২০ কিলোমিটার উপরে অবস্থিত এ ভাসমান গবেষণাগারে তাদের মহাকাশযানটি নোঙর করেছে।
২০২০ সালের মে মাস থেকে নভোচারী পাঠানো শুরু করে ২০০২ সালে ধনকুবের ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠিত রকেট কোম্পানি স্পেসএক্স। সেই থেকে নাসার হয়ে মহাকাশ স্টেশনে দীর্ঘমেয়াদী মিশনের জন্য কোম্পানিটির ১২তম দল ‘ক্রু-১২’।
এ অভিযানের নেতৃত্বে রয়েছেন ৪৮ বছর বয়সী জেসিকা মেয়ার। একজন অভিজ্ঞ নভোচারী ও সমুদ্রজীব বিজ্ঞানী তিনি। মহাকাশ স্টেশনে তার দ্বিতীয় সফর। এর আগে সহকর্মী ক্রিস্টিনা কোচের সঙ্গে ইতিহাসের প্রথম ‘সম্পূর্ণ নারী দল’ হিসেবে স্পেসওয়াক বা মহাকাশে হেঁটে ইতিহাস গড়েছিলেন মেয়ার।
এ অভিযানে মেয়ারের সঙ্গে আরও রয়েছেন ৪৩ বছর বয়সী জ্যাক হ্যাথওয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর একজন সাবেক ফাইটার পাইলট ও এবারই প্রথম মহাকাশে যাচ্ছেন তিনি। আরও রয়েছেন ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার ৪৩ বছর বয়সী ফরাসি পাইলট সোফি আদিনো ও রুশ নভোচারী আন্দ্রে ফেদিয়ায়েভ। এর আগেও একবার আইএসএসে কাজ করেছেন ফেদিয়ায়েভ।
নাসা বলেছে, মহাকাশ স্টেশনে ওজনহীন পরিবেশে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসা সংক্রান্ত ও কারিগরি গবেষণা কাজ করবেন নভোচারীরা। এ অভিযানের গবেষণার মধ্যে রয়েছে নিউমোনিয়ার ব্যাকটেরিয়া নিয়ে বিশেষ পরীক্ষা, যা পৃথিবীতে এ রোগের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে। মহাকাশে খাবারের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে উদ্ভিদ ও নাইট্রোজেন অণুজীবের মিথস্ক্রিয়া নিয়েও পরীক্ষা চালাবেন তারা।
এ বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমের একটি বড় অংশই হচ্ছে সেইসব প্রযুক্তিকে নিখুঁত করা, যা নাসা তাদের আগামী দিনের চাঁদ ও মঙ্গল অভিযানে ব্যবহার করতে চায়। আর এসবই নাসার ‘আর্টেমিস’ প্রোগ্রামের অংশ, যা প্রায় অর্ধশতাব্দী আগের বিখ্যাত ‘অ্যাপোলো’ মিশনেরই উত্তরসূরি।

আগামী মাসেই উৎক্ষেপণ করার কথা রয়েছে আর্টেমিস ২ মিশন। ১০ দিনের সেই পরীক্ষামূলক অভিযানে চারজন নভোচারী চাঁদকে প্রদক্ষিণ করে পুনরায় পৃথিবীতে ফিরে আসবেন।
মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছানোর পর ক্রু-১২ সদস্যদের স্বাগত জানাবেন সেখানে আগে থেকেই অবস্থানরত তিনজন সদস্য, যাদের মধ্যে রয়েছেন নাসার নভোচারী ক্রিস উইলিয়ামস ও রাশিয়ার মহাকাশ গবেষণা সংস্থা রসকসমস-এর দুই নভোচারী সার্গেই কুদ স্ভেরচকভ ও সার্গেই মিকাভ।
‘ক্রু-১১’-এর চারজন সদস্যের ‘ক্রু-১২’ আসা পর্যন্ত মহাকাশ স্টেশনে থাকার কথা ছিল। তবে গত জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তাদের একজনকে জরুরিভিত্তিতে চিকিৎসার জন্য পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনে।
আইএসএস
আয়তনে ফুটবল মাঠের সমান এ স্টেশনটি মহাকাশে মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় বস্তু, যা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নেতৃত্বে এক কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যেখানে কানাডা, জাপান ও ইউরোপের ১১টি দেশও রয়েছে।
মহাকাশ স্টেশনের প্রথম অংশটি ২৫ বছরেরও বেশি সময় আগে মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে স্নায়ুযুদ্ধের রেষারেষি শেষ হওয়ার পর ওয়াশিংটন ও মস্কোর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে এ উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছিল।
নাসা বলেছে, ২০৩০ সালের শেষ নাগাদ এ মহাকাশ স্টেশনটির কার্যক্রম চালিয়ে যাবে তারা।