Published : 19 Apr 2026, 05:36 PM
হাফ-ম্যারাথনে দৌড়ে মানুষকে পেছনে ফেলে চমক দেখিয়েছে চীনের তৈরি কয়েক ডজন হিউম্যানয়েড রোবট।
রয়টার্স লিখেছে, গেল বছরের ব্যর্থতা কাটিয়ে এবার রোবটগুলো কেবল লক্ষ্যপূরণই করেনি, বরং বিশ্বরেকর্ড গড়ার মতো গতিতে দৌড়ে প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতির প্রমাণ দিয়েছে।
রোববার বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হাফ-ম্যারাথন দৌড়ে চীনের তৈরি কয়েক ডজন হিউম্যানয়েড রোবট এদের অবিশ্বাস্য শারীরিক সক্ষমতা ও চলাচলের পারদর্শিতা দেখিয়েছে। মানুষের পাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে চলা এসব রোবট এ খাতে অভাবনীয় উন্নতিরই প্রমাণ।
গত বছর এ দৌড় প্রতিযোগিতাটি প্রথমবারের মতো শুরু হওয়ার সময় অনেক রোবটই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল এবং বেশিরভাগই দৌড় শেষ করতে পারেনি।
গতবারের চ্যাম্পিয়ন রোবটটি দৌড় শেষ করতে সময় নিয়েছে ২ ঘণ্টা ৪০ মিনিট, যা সাধারণ দৌড়ে জয়ী মানুষের সময়ের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।
তবে এবারের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত বছর ২০টি দল অংশ নিলেও এবার দলের সংখ্যা বেড়ে একশ ছাড়িয়েছে। বেশ কিছু রোবট পেশাদার অ্যাথলেটদের চেয়েও বেশি গতিতে দৌড়েছে এবং মানব বিজয়ীদের চেয়ে ১০ মিনিট আগেই দৌড় শেষ করেছে।
গত বছরের তুলনায় এবার আরেকটি বড় পার্থক্য ছিল ২১ কিলোমিটারের এ দৌড়ে প্রায় অর্ধেক রোবটই রিমোট কন্ট্রোলার ছাড়াই স্বচালিতভাবে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছে। কোনো ধরনের সংঘর্ষ এড়াতে রোবট এবং ১২ হাজার মানব প্রতিযোগীর জন্য আলাদা সমান্তরাল পথের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
চীনা স্মার্টফোন ব্র্যান্ড ‘অনার’-এর তৈরি বিজয়ী রোবটটি কেবল ৫০ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করেছে, যা গেল মাসে লিসবনে আয়োজিত হাফ-ম্যারাথনে উগান্ডার দৌড়বিদ জ্যাকব কিপ্লিমোর গড়া বিশ্বরেকর্ডের চেয়েও কয়েক মিনিট কম।
হুয়াওয়ে থেকে আলাদা হওয়া কোম্পানি ‘অনার’-এর বিভিন্ন দল এ প্রতিযোগিতার প্রথম তিনটি স্থানই দখল করেছে। তাদের সবকটি রোবটই নিজে থেকে পথ চিনে চলেছে।
বিজয়ী দলের প্রকৌশলী ডু জিয়াওদি বলেছেন, এ রোবটটি তৈরি করতে তাদের এক বছর সময় লেগেছে। সেরা দৌড়বিদদের অনুকরণে এতে ৯০ থেকে ৯৫ সেন্টিমিটার লম্বা পা ও স্মার্টফোনে ব্যবহৃত লিকুইড কুলিং প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে।
ডু বলেছেন, এ প্রযুক্তি খাতটি এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তবে তিনি বিশ্বাস করেন, হিউম্যানয়েড রোবটগুলো ভবিষ্যতে উৎপাদন শিল্পসহ অনেক খাতের চিত্র বদলে দেবে।
“দ্রুত দৌড়ানোটা শুরুতে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। তবে দৌড়ানোর মাধ্যমেই রোবটের কাঠামোগত সক্ষমতা ও কুলিং সিস্টেমের মতো প্রযুক্তিগত উন্নতি সম্ভব হয়, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন শিল্পে সরাসরি কাজে লাগানো যাবে।”
রোবোটিক্সের উন্নতি
বিভিন্ন আকার ও চলনভঙ্গির হিউম্যানয়েড রোবটগুলোর এ প্রদর্শনীকে দর্শকরা চীনের রোবোটিক্স খাতের উন্নতির প্রমাণ হিসেবে দেখছেন।
‘বেইজিং ইউনিভার্সিটি অফ পোস্টস অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন’-এর ২৩ বছর বয়সী ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র চু তিয়ানকি বলেছেন, “এসব হিউম্যানয়েড রোবটের দৌড়ানোর ভঙ্গি দেখে আমি সত্যিই মুগ্ধ। এআই খুব অল্প সময় ধরে বিকশিত হলেও এই পর্যায়ের পারফরম্যান্স দেখাতে পেরেছে তা অভাবনীয়।
“ভবিষ্যৎ নিশ্চিতভাবেই এআইয়ের যুগ হতে যাচ্ছে। যারা এখনই এআইয়ের ব্যবহার শিখবে না বা গ্রহণে বাধা দেবে তারা নিশ্চিতভাবেই পিছিয়ে পড়বে।”
আরেক দর্শক ১১ বছর বয়সী স্কুলছাত্র গুয়ো ইয়ুকুন এ দৌড় দেখে ভবিষ্যতে রোবোটিক্স নিয়ে পড়াশোনা করতে অনুপ্রাণিত হয়েছে। গুয়ো বেইজিংয়ের এক নামী স্কুলে নিয়মিত রোবোটিক্স থিওরি ও প্রোগ্রামিং শেখেন।
অর্থিকভাবে লাভজনক প্রয়োগ
এসব হিউম্যানয়েড রোবটের বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ব্যবহার এখনও পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। তবে এ হাফ-ম্যারাথনে তাদের শারীরিক সক্ষমতার যে প্রদর্শনী হয়েছে তা থেকে স্পষ্ট যে, ভবিষ্যতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ থেকে শুরু করে যুদ্ধক্ষেত্র সবকিছুর রূপ বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা এদের রয়েছে।
তবে চীনা বিভিন্ন রোবোটিক্স কোম্পানি এমন উন্নত এআই সফটওয়্যার তৈরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, যা এসব রোবটকে কারখানার একজন মানুষের মতো সক্ষম করে তুলবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাফ-ম্যারাথনে রোবটের যে সক্ষমতা দেখা গেছে তা বিনোদন হিসেবে দারুণ। তবে শিল্পক্ষেত্রে রোবট ব্যবহারের জন্য হাতের সূক্ষ্ম কাজ, আশপাশের পরিবেশ বোঝার সক্ষমতা এবং ছোটখাটো পুনরাবৃত্তিমূলক কাজের বাইরেও জটিল সব দক্ষতা প্রয়োজন, যা এখনও বড় পরিসরে বাণিজ্যিক ব্যবহারের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
চীন এ উদীয়মান শিল্পে বিশ্বজুড়ে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েছে। স্থানীয় কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করতে দেশটি ভর্তুকি দেওয়া থেকে শুরু করে অবকাঠামো প্রকল্প তৈরির মতো নানা ধরনের নীতি গ্রহণ করেছে।