Published : 19 Mar 2026, 11:58 AM
গিজার বিশালাকার পিরামিডগুলো কি সত্যিই প্রাচীন মিশরের ফারাওদের তৈরি, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও প্রাচীন কোনো রহস্য? একজন মিশরতত্ত্ববিদ দাবি করেছেন, এসব পিরামিড মানুষের ধারণার চেয়েও হাজার হাজার বছর আগে এক উন্নত সভ্যতা তৈরি করেছিল।
‘অটোনমাস ইউনিভার্সিটি অফ বার্সেলোনা’র একজন স্বতন্ত্র গবেষক আন্তোনিও আমব্রোসিও কিছু রহস্যময় সূত্রের বর্ণনা দিয়েছেন। এসব সূত্র থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, গিজার তিনটি প্রধান পিরামিড প্রায় ১২ হাজার বছরের পুরানো হতে পারে, যা কি না প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতারও কয়েক হাজার বছর আগের।
ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ডেইলি মেইল প্রতিবেদনে লিখেছে, আমব্রোসিওর তত্ত্বটি সত্যি প্রমাণিত হলে তা আধুনিক মানুষের ইতিহাসকে নতুন করে লিখবে। তার এ তত্ত্ব পৃথিবীতে এমন এক অজানা ‘সুপার সভ্যতা’র অস্তিত্ব প্রকাশ করবে যারা পিরামিডের মতো বিশালাকার স্থাপনা গোটা বিশ্বেই তৈরি করেছিল।
গবেষক আমব্রোসিও ও অন্যান্য পণ্ডিতদের দাবির মূলে রয়েছে পিরামিড নিয়ে কিছু বড় ধরনের অসঙ্গতি। তাদের মতে, মিশরীয়রা গিজার আসল তিনটি পিরামিড তৈরি করেনি, বরং তারা এগুলো খুঁজে পাওয়ার পর সেগুলোকে নকল করে আরও নতুন কিছু পিরামিড বানিয়েছিল।
এ নতুন গবেষণাপত্রটি এখনও অন্য বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে যাচাই বা ‘পিয়ার রিভিউ’ হয়নি। তবে এ গবেষণায় আমব্রোসিও যুক্তি দিয়েছেন, গিজার পিরামিডগুলোর ভেতরে কোনো রাজকীয় মমি বা কবরের সরঞ্জাম পাওয়া যায়নি। অথচ প্রাচীন মিশরীয়রা দাবি করত, এগুলো খুফু, খাফরে ও মেনকাউরে এই তিন ফারাওয়ের সমাধি।
এ ছাড়া, গিজার মূল পিরামিডগুলো, যাকে বর্তমানে ৪ হাজার ৬০০ বছরের পুরানো মনে করা হয় তা বিস্ময়কর প্রকৌশল দক্ষতা দিয়ে তৈরি। এগুলোর গঠন মহাকাশের তারাপুঞ্জের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। এগুলোর পাথরগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কাটা ও এগুলোর ভিত্তি বা চারদিকের তল ছিল একদম নিখুঁতভাবে সমান।
আমব্রোসিও বলেছেন, গিজার পিরামিডগুলোতে যে বিস্ময়কর প্রকৌশল বা কারিগরি দক্ষতা দেখা যায় তার ধারেকাছেও যেতে পারেনি মিশরীয়দের তৈরি করা পরবর্তী ছোট ছোট বিভিন্ন পিরামিড, যেগুলো খ্রিস্টপূর্ব ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ১৫০ অব্দের মধ্যে নির্মিত বলে প্রমাণিত।
পিরামিডের কাছেই অবস্থিত ‘স্ফিংস’ মূর্তিতে অনেক বৃষ্টির কারণে হওয়া ক্ষয়ের চিহ্ন মিলেছে। অথচ মিশরে এ ধরনের ভারী বৃষ্টিপাত খ্রিস্টপূর্ব ৫ হাজার থেকে ৩ হাজার অব্দের পর আর হয়নি। এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, খ্রিস্টপূর্ব ৩১০০ অব্দে যখন মিশরীয় সভ্যতার সূচনা হয়েছিল তার অনেক আগে থেকেই এ এলাকাটি প্রাচীন ও প্রাকৃতিক কারণে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছিল।
‘পিরামিডস অফ গিজা: লিগাসি অফ অ্যান আননৌন সিভিলাইজেশন’ নামের এ গবেষণাপত্রে আমব্রোসিও বলেছেন, “গিজার বিভিন্ন পিরামিড চতুর্থ রাজবংশের ফারাওরা তৈরি করেননি, বরং তারা এগুলো আগে থেকেই সেখানে পেয়েছিলেন ও নিজেদের বলে দাবি করেছিলেন।”
তার দাবি, প্রচলিত ইতিহাসের সময়রেখা অনুসারে আগে বা পরে তৈরি করা অন্যান্য পিরামিডগুলো আসলে আগের সেই প্রাচীন স্থাপনাগুলোকে অনুকরণের শিশুসুলভ এক চেষ্টা মাত্র। প্রাচীন আমলের এমন কোনো অকাট্য লিখিত প্রমাণ নেই, যা সরাসরি ফারাওদের এই পিরামিড নির্মাণের সঙ্গে যোগ করে।
বর্তমানে ফারাওদের সঙ্গে পিরামিডের প্রধান যোগসূত্র হচ্ছে ‘খুফু কার্তুশ’। এটি গিজার গ্রেট পিরামিডের কিংস চেম্বারের উপরে গোপন এক কক্ষে লাল রঙের খনিজ কালিতে লেখা একটি হায়ারোগ্লিফিক লিপি, যাতে ফারাও ‘খুফু’র নাম রয়েছে।
অধিকাংশ মূলধারার মিশরতত্ত্ববিদ এ লিপিটিকে আসল বলে মনে করলেও স্কট ক্রাইটন ও জেকারিয়া সিচিনের মতো সংশয়বাদীরা দাবি করেছেন, ১৮৩৭ সালে কর্নেল হাওয়ার্ড ভাইজ লিপিটি জালিয়াতি বা নকল করে সেখানে লিখেছিলেন।
আমব্রোসিও বলেছেন, “গিজার পিরামিডগুলোর ভেতরে কোনো মমি কখনোই পাওয়া যায়নি। ফারাও খুফুর তথাকথিত যে শবাধারটি মিলেছিল সেটিও ছিল খালি। এ বিষয়টি প্রমাণ করে না যে তিনি পিরামিডটি তৈরি করেছিলেন, বরং এর থেকে প্রমাণ মেলে, তিনি কেবল এটির মালিকানা দাবি করেছিলেন।”
গিজার মূল পিরামিডগুলোর উৎস নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব বিশাল স্থাপনা তৈরির জ্ঞান ও দক্ষতা মিশরের পঞ্চম ও ষষ্ঠ রাজবংশের সময় হারিয়ে গিয়েছিল।
নতুন এ গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, গিজার পরে তৈরি করা মিশরীয় পিরামিডগুলো আকারে অনেক ছোট ছিল। সেগুলোতে নির্মাণের অনেক ত্রুটি ছিল, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহৃত হয়েছিল এবং সেগুলো তারার অবস্থানের সঙ্গেও সঠিক মিল রেখে তৈরি হয়নি।
এদিকে, আমব্রোসিও লক্ষ্য করেছেন, গিজার পিরামিডগুলোর মতো বিশাল স্থাপনা গোটা বিশ্বজুড়েই আবিষ্কৃত হয়েছে। একই কোনো উন্নত সভ্যতা তাদের এসব উচ্চমানের নির্মাণ কৌশল বিশ্বের অন্যান্য আদিম মানবগোষ্ঠীর সঙ্গে শেয়ার বা ভাগ করে নিয়েছিল।
গবেষণাপত্রটিতে বিশেষভাবে এমন কিছু বিশালাকার পাথুরে স্থাপনার কথা বলা হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে গিজার পিরামিডগুলোর অদ্ভুত মিল রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে পেরুর প্রাচীন ইনকা দুর্গ ‘সাকসাহুয়ামান’ এবং লেবাননের ‘বালবেক’ শহর।
আমব্রোসিওর তত্ত্ব অনুসারে, “গিজার পিরামিডগুলো হয়ত কোনো এক অজানা প্রাচীন সভ্যতার উত্তরাধিকার, যারা এমন কিছু উন্নত প্রযুক্তি আয়ত্ত করেছিল, যা এখন হারিয়ে গেছে।
“চতুর্থ রাজবংশের শাসকরা এসব পুরানো স্থাপনা পুনরায় ব্যবহার করেছিলেন মাত্র। আর পরের রাজবংশগুলো সেগুলোকে নকলের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল।”
গবেষক আরও বলেছেন, প্রাচীন মিশরীয়দের নিজস্ব এক পৌরাণিক ধারণা ছিল, যাকে তারা বলতেন ‘জেপ টেপি’ বা ‘প্রথম সময়’।
বিষয়টি আদি ‘স্বর্ণযুগ’কে বোঝায়। এ সময় পৃথিবী তৈরি হয়েছিল ও বিশৃঙ্খলা থেকে দেবতারা আবির্ভূত হয়েছিলেন। তারা পৃথিবীতে মহাজাগতিক নিয়ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং মানুষের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে সরাসরি পৃথিবী শাসন করতেন।
তবে গ্রেহাম হ্যানকক ও রবার্ট শকের মতো গবেষকরা বিকল্প একটি তত্ত্বকে সমর্থন করেছেন। তাদের মতে, ‘জেপ টেপি’ কেবল একটি কল্পনা নয়, বরং তা ছিল এক বাস্তব ঐতিহাসিক সময়। যখন প্রায় ১২ হাজার বছর আগে হারানো এ উন্নত সভ্যতাটি টিকে ছিল।
গবেষক ম্যাথিউ লাক্রোইস বলেছেন, এ উন্নত জাতিটি হয়ত জ্যামিতি, প্রতীক ও স্থাপনার নকশার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে জটিল এক কোড বা সংকেত লুকিয়ে রেখেছে। বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ধ্বংসলীলার হাত থেকে তাদের জ্ঞান রক্ষার জন্যই তারা এমনটা করেছিল।
মিশরে সাম্প্রতিক আরেকটি আবিষ্কারের ফলে নতুন করে আলোচনার জন্ম হয়েছে, যেখানে প্রাচীন পাথরে খোদাই করা বিশাল ‘টি আকৃতি’, তিন স্তরের খাঁজ ও ধাপওয়ালা পিরামিডের মতো চিহ্ন পাওয়া গেছে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এসব প্রতীকের সঙ্গে মহাদেশগুলোর এক অদ্ভুত যোগসূত্র মিলে যাচ্ছে, যা ‘জেপ টেপি’র চেয়েও পুরনো, প্রায় ৩৮ হাজার থেকে ৪০ হাজার বছর আগের।
লাক্রোইসের মতে, এ সভ্যতা মহাজাগতিক চক্র বা তারার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করত। তারা মহাবিশ্বের গঠন সম্পর্কিত নিজেদের শিক্ষাগুলো বিভিন্ন স্মৃতিস্তম্ভ ও পবিত্র স্থানে গেঁথে দিয়ে গেছে। ঠিক যেভাবে গিজার পিরামিডগুলো মহাকাশের ‘অরিয়ন বেল্ট’ বা কালপুরুষ মণ্ডলীর তিনটি তারার সঙ্গে নিখুঁতভাবে সারিবদ্ধ হয়ে আছে বিষয়টি তেমনই।