Published : 29 Jul 2025, 06:05 PM
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে টার্বিউলেন্স বা বাতাসের ঘূর্ণি দিনদিন শক্তিশালী হচ্ছে। নতুন উদ্ভাবনী প্রযুক্তি বা কৌশল এ অস্থিরতা কমাতে সাহায্য করবে বলে আশা করছে উড়োজাহাজ নির্মাতা কোম্পানি, বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা।
২০২৪ সালে মিয়ানমারের দক্ষিণ অংশের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় শক্তিশালী এক টার্বিউলেন্সের মুখে পড়ে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট।
“আমরা সিলিংয়ে রক্ত দেখেছি… যা ছিল পুরো এক ধ্বংসযজ্ঞের মতো অবস্থা। অনেক মানুষ মেঝেতে পড়ে ছিল,”— এভাবেই সেই পরিস্থিতির বর্ণনা করেছিলেন ওই প্লেনের একজন যাত্রী।
একই বছরে বসন্তের শুরুতে ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের বোয়িং ৭৮৭-এর একটি ফ্লাইটও ফিলিপিন্সের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময়ও শক্তিশালী টার্বিউলেন্সের কবলে পড়েছিল। ওই সময় প্লেনের একজন কেবিন ক্রু ছাদে গিয়ে আছড়ে পড়েন। ফলে তার মাথা ঘুরে যাওয়ার পাশাপাশি হাত ভেঙে গিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
মানুষের তৈরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের টার্বিউলেন্সের ঘটনা বাড়ছে। ‘ইউনিভার্সিটি অফ রিডিং’য়ের বায়ুমণ্ডল বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক পল উইলিয়ামস বলেছেন, এমন ধরনের টার্বিউলেন্স রয়েছে, যা স্যাটেলাইট বা রেডারে ধরা পড়ে না এবং চোখেও দেখা যায় না। তবে তা খুবই শক্তিশালী প্রকৃতির হয়। ১৯৭৯ সালের পর থেকে এ ধরনের টার্বিউলেন্স বেড়েছে ৫৫ শতাংশ।
২০৫০ সালের মধ্যে গোটা বিশ্বে টার্বিউলেন্স তিন গুণ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে এবং এর বড় প্রভাব পড়বে পূর্ব এশিয়া ও উত্তর আটলান্টিকে থাকা বিভিন্ন প্লেনের রুটে। এ কারণে প্লেনের ওঠার বিষয়ে অনিচ্ছুক হয়ে পড়তে পারেন মানুষ। প্লেন ভ্রমণে মানুষের সবচেয়ে ভয়ের কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নিয়ন্ত্রণ হারানো বা আগে খারাপ অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ভয়।
টার্বিউলেন্স কেবল ঝুঁকিপূর্ণই নয়, বরং এটি প্লেন শিল্পের জন্য আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়েও দাঁড়ায়। প্লেনের যন্ত্রাংশের ঘাটতি ও ক্ষয় বাড়ানোর পাশাপাশি পাইলটদের টার্বিউলেন্স এড়িয়ে যেতে গিয়ে উড়োজাহাজের পথ দীর্ঘ করতে হয়। এর ফলে বেশি জ্বালানি খরচের পাশাপাশি পরিবেশ দূষণও বাড়ে।
সাধারণত টার্বিউলেন্স যাত্রীদের অস্বস্তি তৈরি করতে, আঘাত বা মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে কমই দেখা গিয়েছে। তবে বায়ুমণ্ডলে টার্বিউলেন্সের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এ সমস্যার সমাধান খুঁজতে হচ্ছে প্লেন কোম্পানি, বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের।
এজন্য ছোট ছোট ‘ফ্ল্যাপলেট’ তৈরি করেছে অস্ট্রিয়ার বাদেনে অবস্থিত ‘টার্বিউলেন্স সলিউশনস’ নামের এক প্রতিষ্ঠান। এসব ‘ফ্ল্যাপলেট’ প্লেনের ডানার বড় ফ্ল্যাপ বা অ্যাইলেরন-এ যোগ করা যায়।
এসব ফ্ল্যাপলেট সামান্য কোণ পরিবর্তন করে বাতাসের গতিতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন পরিবর্তনকে সামলাতে সাহায্য করে, যা ডানার সামনের অংশ থেকে চাপের তথ্য নিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফলে বাতাসে ওড়ার সময় প্লেন স্থিতিশীল রাখা সহজ হয়, ঠিক যেমন পাখিরা নিজেদের পাখার ছোট ছোট অংশ সামঞ্জস্য করে ভারসাম্য বজায় রেখে উড়ে বেড়ায় বিষয়টি তেমনই।
কোম্পানিটি বলেছে, যাত্রীদের অনুভূত টার্বিউলেন্সের চাপ ৮০ শতাংশের বেশি কমিয়ে আনতে পারে এই প্রযুক্তি। এখন পর্যন্ত এ প্রযুক্তি নিয়ে কেবল তারা ছোট আকারের প্লেনের ওপর পরীক্ষা করেছে। তবে কোম্পানিটির সিইও আন্দ্রাস গ্যালফি নিজেও একজন অ্যারোব্যাটিক্স পাইলট। তিনি বলেছেন, বড় আকারের প্লেনের ক্ষেত্রেও সফলভাবে ব্যবহার করা যাবে এ প্রযুক্তি।
“সাধারণ ধারণা হচ্ছে, আপনি হয় টার্বিউলেন্স এড়াতে পারবেন নয়ত মানিয়ে নেবেন। এক্ষেত্রে প্লেনের সিটবেল্ট বাঁধা ও ডানাকে মজবুত করা ছাড়া উপায় নেই। তবে আমরা বলছি, এটা মানতে হবে এমন কোনও কথা নেই। কেবল সঠিক প্রতিসংকেতের প্রয়োজন। হালকা প্লেনের জন্য বিষয়টি সবসময়ই সমস্যার। তবে এখন বাণিজ্যিক বিভিন্ন প্লেনেও গুরুতর হয়ে উঠেছে এ বিষয়টি। কারণ, পরিবেশে টার্বিউলেন্স ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।”

স্টকহোমের ‘কেটিএইচ রয়্যাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’র তরলগতিবিদ্যা, প্রকৌশল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষক রিকার্ডো ভিনুয়েসা বলেছেন, “বহু মাত্রিক জটিল ডেটার ভেতরে প্যাটার্ন খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে খুবই ভাল মেশিন লার্নিং। এক্ষেত্রে টার্বিউলেন্স হতে পারে এআইয়ের জন্য একেবারে উপযোগী এক প্রয়োগ ক্ষেত্র।”
সম্প্রতি এক পরীক্ষায় একটি এআই সিস্টেম নিয়ে পরীক্ষা করেছেন ‘বার্সেলোনা সুপারকম্পিউটিং সেন্টার’ ও ‘টিইউ ডেলফট’-এর ভিনুয়েসা এবং তার সহকর্মীরা, যেখানে এআই সিস্টেমটি সিমুলেটেড এক প্লেনের ডানার ওপর ‘সিনথেটিক জেট’ বা কৃত্রিম বায়ু প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করেছে।
এআই সিস্টেমটি প্রশিক্ষিত হয়েছে ‘ডিপ রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং’ পদ্ধতিতে, যেখানে মডেলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে শেখে, যেমন– একটি ছোট শিশু ধাক্কা খেতে খেতে হাঁটতে শেখে তেমন।
ভিনুয়েসা বলেছেন, “আগে আমাদের বাতাসের গতিপথ আগেভাগে মাপতে হত, তবে এখন আমরা এআইয়ের মাধ্যমে প্লেনের ডানার ওপরে সরাসরি নেওয়া বাতাসের পরিমাপের ভিত্তিতে খুবই সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল সিমুলেশন তৈরি করতে পারি, যা বাতাসের আচরণ বুঝাতে সাহায্য করেছে আমাদের।”
গত বছর একটি উইন্ড টানেলে অত্যন্ত শক্তিশালী টার্বিউলেন্স তৈরি করে ড্রোনের জন্য এআইচালিত সেন্সিং ও পূর্বাভাস ব্যবস্থা পরীক্ষা করে ইতিবাচক ফলাফল পেয়েছে ক্যালটেক ও মার্কিন চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার একটি দল।
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ‘ল্যাংলি রিসার্চ সেন্টার’-এর গবেষকরা বিশেষ এক মাইক্রোফোন নিয়ে পরীক্ষা করেছেন, যা চারশ ৮০ কিলোমিটার দূর থেকে বাতাসের টার্বিউলেন্সের কারণে তৈরি অতি-নিম্ন মাত্রার ইনফ্রাসাউন্ড ফ্রিকোয়েন্সি শনাক্ত করতে পারে।
২০১০ সাল থেকে সক্রিয়ভাবে বিকাশাধীন আরেকটি পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে ‘লাইট ডিটেকশন অ্যান্ড রেঞ্জিং’ বা লাইডার, যেটি ব্যবহার করে যানবাহনের আশপাশে বাতাসের থ্রিডি মানচিত্র তৈরি করা যায়। ঠিক যেমন স্বয়ংচালিত বিভিন্ন গাড়ি আশপাশের বস্তু ও যানবাহনের একটি পয়েন্ট ক্লাউড তৈরি করে এদের পরিবেশে চলাচল করে তেমনই প্লেনের জন্য ব্যবহৃত হয় এ প্রযুক্তি।
২০২৩ সালের এক চীনা গবেষণায় ‘ডুয়াল-ওয়েভলেংথ’ লাইডার সিস্টেম প্রস্তাব করা হয়েছিল। এতে গবেষকরা দাবি করেছেন, সাত থেকে ১০ কিলোমিটার দূর থেকে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বাতাসের টার্বিউলেন্স শনাক্ত করতে পারবে এই সিস্টেম। তবে উচ্চ উচ্চতায় বাতাসের অণুর ঘনত্ব কম হওয়ায় এসব যন্ত্র এত বড়, ভারী ও বেশি শক্তি খরচ করে যে, বাণিজ্যিক প্লেনে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
উৎপাদন প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নতুন বিভিন্ন সেন্সরের সমন্বয়ে ২১ শতকের দ্বিতীয় ভাগে প্লেন চলাচল শিল্পে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু বর্তমানে কী ঘটছে?
উড়ান শুরুর আগে আবহাওয়া সম্পর্কিত তথ্য পরীক্ষা ও বিভিন্ন জেট স্ট্রিমের চার্ট দেখেন পাইলটরা। তারা ফ্লাইট প্ল্যানিং সফটওয়্যার ব্যবহার করেন ও এমন বিভিন্ন পূর্বাভাস দেখে নেন, যার মধ্যে রয়েছে ‘গ্রাফিক্যাল টার্বিউলেন্স গাইডেন্স’ বা জিটিজি, যেটিতে অবদান রয়েছে গবেষক পল উইলিয়ামসের।
তিনি বলেছেন, “প্রায় ২০ বছর আগে প্রায় ৬০ শতাংশ টার্বিউলেন্সের পূর্বাভাস দিতে পারতাম আমরা। বর্তমানে তা প্রায় ৭৫ শতাংশের কাছাকাছি এবং আমার ক্যারিয়ারের লক্ষ্য হচ্ছে এ সংখ্যা আরও বাড়িয়ে নেওয়া।”
অগ্রগতির পথে বাধা কী– এমন প্রশ্নের জবাবে উইলিয়ামস বলেছেন, “বাধা হচ্ছে প্লেনের মাধ্যমে নেওয়া টার্বিউলেন্সের ডেটায় সীমিত প্রবেশাধিকার রয়েছে আমাদের। গবেষকদের এসব ডেটা কিনে নিতে হয় এবং বিষয়টি এখনও সাশ্রয়ী পর্যায়ে পৌঁছায়নি।”