Published : 05 Mar 2026, 01:39 PM
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বড় ধরনের সংকটে পড়েছে বৈশ্বিক প্রযুক্তি জায়ান্টরা। এনভিডিয়া, অ্যামাজন ও অ্যালফাবেট তাদের দুবাই অফিস সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে এবং প্লেন চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় দুবাইতে আটকা পড়েছেন গুগলের বেশ কিছু কর্মী।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, ইরান ও ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বা ওই অঞ্চল দিয়ে যাতায়াতকারী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এনভিডিয়া, অ্যামাজন ও অ্যালফাবেটের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানি কাজ শুরু করেছে।
ইরানের ওপর বড় ধরনের এক হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ আরও কয়েকজন নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইসরায়েলি ও মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে ইরান। এ যুদ্ধের ফলে সাধারণ জনজীবন, ইন্টারনেট সেবা, প্লেনের পথ ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
বিশ্বের চিপ খাতের শীর্ষ কোম্পানি এনভিডিয়া সাময়িকভাবে তাদের দুবাই অফিস বন্ধ করে দিয়েছে এবং সেখানকার কর্মীরা বর্তমানে ঘর থেকে কাজ করছেন। এনভিডিয়া’র সিইও জেনসেন হুয়াংয়ের পাঠানো এক ইমেইল থেকে এমন তথ্য মিলেছে।
বার্তায় হুয়াং বলেছেন, এনভিডিয়া’র ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট টিম’ মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত প্রায় ৬ হাজার কর্মী ও তাদের পরিবারকে সহায়তায় চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করে যাচ্ছে।
২০১৯ সালে এনভিডিয়া প্রায় ৭১৩ কোটি ডলারে ইসরায়েলি কোম্পানি ‘মেলানক্স’ অধিগ্রহণ করেছিল, যা ছিল সেই সময় পর্যন্ত এনভিডিয়া’র সবচেয়ে বড় অধিগ্রহণ চুক্তি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ইসরায়েলই এনভিডিয়া’র সবচেয়ে বড় গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র।
মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুসারে, এ যুদ্ধের কবলে পড়া এনভিডিয়া’র সকল কর্মী ও তাদের নিকটাত্মীয়রা নিরাপদে আছেন বলে হুয়াং নিশ্চিত করেছেন।
“এ অঞ্চলে এনভিডিয়া’র শেকড় অনেক গভীরে। আমাদের হাজার হাজার সহকর্মী সেখানে বাস করেন এবং বিশ্বজুড়ে আরও অনেকের পরিবার ও বন্ধুরা এ ঘটনার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আপনাদের মতো আমিও আমাদের এনভিডিয়া পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়ে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।”
‘অবিলম্বে ত্যাগ করুন’
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সোমবার বলেছে, ‘গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকির’ কারণে আমেরিকানদের উচিত বাণিজ্যিক যানবাহনের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে ‘অবিলম্বে সরে যাওয়া’।
মঙ্গলবার বিকেল নাগাদ সংস্থাটি বলেছে, ক্রমাগত অস্থিরতার মধ্যে তারা ওই অঞ্চল থেকে আমেরিকানদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য সামরিক প্লেন ও চার্টার্ড ফ্লাইটের চেষ্টা করছে।
প্লেন চলাচলে বিঘ্ন ঘটার কারণে দুবাইতে এক সেলস কনফারেন্স শেষে গুগলের কয়েক ডজন কর্মী সেখানে আটকে পড়েছেন। সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে কিছু সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গত সপ্তাহে দুবাইতে গুগলের ক্লাউড ইউনিটের ‘অ্যাকসেলরেইট সেলস কিকঅফ’ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। রোববার সকালে কিছু ক্লাউড কর্মীকে পাঠানো এক মেমোতে গুগল বলেছে, তাদের দলের সদস্যরা এখনও সেখানে অবস্থান করছেন। কর্মীদের মতে, সাম্প্রতিক এসব হামলা ‘উদ্বেগজনক’।
সূত্রগুলো বলেছে, বেশিরভাগ কর্মী ওই অঞ্চল ছাড়তে পারলেও এখনও কয়েক ডজন কর্মী সেখানে আটকে আছেন। ইরানের ওপর হামলার পর বিভিন্ন এয়ারলাইন ব্যাপকহারে ফ্লাইট বাতিল করেছে।
এভিয়েশনডেটা ফার্ম ‘সিরিয়াম’-এর তথ্য অনুসারে, গেল সপ্তাহান্তের হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ১১ হাজারেও বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
গুগল বলেছে, আক্রান্ত কর্মীদের বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী নন, বরং তারা ওই অঞ্চলেরই স্থানীয় কর্মী। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের কর্মীদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এবং কর্মীদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
কোম্পানিটির একজন মুখপাত্র বলেছেন, “মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং আমরা তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। আমাদের মূল লক্ষ্য, ওই অঞ্চলে আমাদের কর্মীদের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা।”

প্রযুক্তি খাতের মধ্যপ্রাচ্য হাব
দুবাই হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা জুড়ে গুগলের ক্লাউড ও বিক্রয় কার্যক্রমের আঞ্চলিক কেন্দ্র। গেল বছর দুবাইয়ের ক্রাউন প্রিন্স শেখ হামদান বিন মোহাম্মদ গুগলের অফিস পরিদর্শন এবং কোম্পানির সর্বশেষ বিভিন্ন এআই উদ্যোগ পর্যবেক্ষণ করেছেন।
ইসরায়েলের প্রধান শহর তেল আবিব বর্তমানে হামলার শিকার হয়েছে, সেটিও গুগলের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এ সার্চ জায়ান্টটি বর্তমানে ‘টুহ্যা২’ টাওয়ারে নিজেদের বিশাল এক নতুন সদর দপ্তর খোলার প্রক্রিয়ায় রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে গুগলের বৃহত্তম সাইটগুলোর একটি হতে যাচ্ছে।
তবে, ইরান যুদ্ধের ফলে তেল আবিবভিত্তিক কার্যক্রম ও কর্মীরা কীভাবে প্রভাবিত হয়েছে সে বিষয়ে সিএনবিসির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি গুগল।
অ্যামাজন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের উপস্থিতি ব্যাপকহারে বাড়িয়েছে, ক্রমাগত যুদ্ধের প্রেক্ষিতে তারাও সেখানে নিজেদের কার্যক্রম পরিবর্তন করছে।
কোম্পানিটি মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সকল কর্পোরেট কর্মীকে ঘরে বসে কাজ করার এবং ‘স্থানীয় সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার’ নির্দেশ দিয়েছে।
এক বিবৃতিতে অ্যামাজনের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “আমাদের কর্মী ও পার্টনারদের নিরাপত্তা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাদের সহায়তা নিশ্চিত করতে আমরা স্থানীয় দল ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি।”
সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, মিশর, তুরস্ক ও ইসরায়েলে অ্যামাজনের কর্পোরেট অফিস রয়েছে। এ ছাড়া, পুরো অঞ্চল জুড়ে তাদের গুদামঘর, ডেটা সেন্টার ও আরব আমিরাতে ১৫ মিনিটে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য ‘কুইক কমার্স আউটলেট’ও রয়েছে।
রোববার তাদের এই বিশাল ডেটা সেন্টার নেটওয়ার্কটি যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি ডেটা সেন্টারে সরাসরি ড্রোন হামলা এবং বাহরাইনের একটি স্থাপনাও নিকটবর্তী ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এসব স্থাপনার কাঠামোগত ক্ষতি, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ও পানির লাইনে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সাইটগুলো বর্তমানে অফলাইনে রয়েছে এবং অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস-এর কিছু জনপ্রিয় অ্যাপ্লিকেশন যেমন ভার্চুয়াল সার্ভার ও ডেটাবেস পরিষেবাগুলো সমস্যার মুখে পড়ছে।
এডব্লিউএস নিজেদের গ্রাহকদের ডেটা ব্যাকআপ রাখা বা কার্যক্রম অন্য অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
তারা বলেছে, “আমরা এসব স্থাপনা সচলের চেষ্টা করলেও চলমান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনও অনিশ্চিত।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোম্পানি স্ন্যাপ বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যে তাদের চারটি অফিসের কর্মীদের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঘরে বসে কাজ করতে এবং কর্মীদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা বা দেশ ত্যাগের নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে।