Published : 20 Jun 2026, 02:45 PM
ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কারণে শিশুদের যে ক্ষতি হচ্ছে, সেই সংক্রান্ত আইনি দায় থেকে মুক্তি পেতে মার্কিন কংগ্রেসের কাছে জোর তদবির বা লবিয়িং চালাচ্ছে মার্কিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্ট মেটা।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হাতে আসা এক গোপন খসড়া প্রস্তাবনা থেকে মেটার এ মরিয়া চেষ্টার তথ্য সামনে এসেছে।
এদিকে, শিশুদের ওপর হওয়া ক্ষতির অভিযোগে বর্তমানে মেটার বিরুদ্ধে হাজার হাজার তরুণ ব্যবহারকারী ও তাদের পরিবার মামলা করে রেখেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
বর্তমানে মার্কিন সেনেটে ‘কিডস অনলাইন সেইফটি অ্যাক্ট’ বা কেওএসএ বা শিশু অনলাইন নিরাপত্তা আইনের খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে। আইনপ্রণেতারা যদি মেটার প্রস্তাবটি মেনে নিয়ে তা আইনের অন্তর্ভুক্ত করেন তবে মেটা ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে চলমান হাজার হাজার মামলা এক নিমেষেই ভেস্তে যেতে পারে।
এ বছরের শুরুতে এমনই এক মামলার বিচারে হেরে গিয়ে মেটা ও ইউটিউবের মূল কোম্পানি গুগল যৌথভাবে ৬০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণের মুখে পড়েছে।
মার্কিন আইনপ্রণেতারা মেটার এ প্রস্তাব মেনে নেওয়ার কোনো ইঙ্গিত না দিলেও ঘটনাটি স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, নব্বইয়ের দশকের পর সামাজিক মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে আমেরিকার সবচেয়ে বড় উদ্যোগের মুখে দাঁড়িয়ে মেটা আসলে ঠিক কতটা আইনি সুরক্ষা পেতে মরিয়া।
রয়টার্সের পর্যালোচিত খসড়া অনুসারে, মেটার প্রস্তাবিত আইনটি পাস হলে ‘১৮ বছরের কম বয়সী টিনএজারদের অনলাইন নিরাপত্তা বা প্রাইভেসি সংক্রান্ত যে কোনো ক্ষতি বা মামলার ক্ষেত্রে অনলাইন কোম্পানিগুলো সম্পূর্ণ দায়মুক্তি পাবে’।
এ ধারার পাশাপাশি সেখানে এমন কিছু প্রস্তাবও রাখা হয়েছে, যা শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব কঠোর আইনগুলোকে বাতিল বা দুর্বল করে দিতে পারে।
মেটার এ তদবির ও প্রস্তাবিত আইনি ভাষা নিয়ে জানতে চাওয়া হলে কোম্পানিটির মুখপাত্র স্টেফানি ওটওয়ে বলেছেন, এ ধারাটি “চলমান বিভিন্ন মামলাকে বাতিল করে না বা বিষয়টি কোনো ঢালাও দায়মুক্তিও নয়।
“এর পরিবর্তে এমনটা তরুণদের অনলাইন নিরাপত্তার জন্য অভিন্ন এক জাতীয় মানদণ্ড তৈরি করবে। ফলে এসব সংবেদনশীল বিষয় কোনো মামলার আইনজীবী বা একেক রাজ্যের একেক রকম খণ্ডিত আইনের বদলে সুনির্দিষ্ট এক কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল আইনের অধীনে পরিচালিত হবে।”
আইনজীবীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ‘আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর জাস্টিস’-এর জুলিয়া ডানকান বলেছেন, এ ধারা পাস হলে আইনটি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমের বিরুদ্ধে চলমান সব মামলা বাতিল হয়ে যাবে।
“এ খসড়ার ভাষাটি একেবারে স্পষ্ট, যেখানে এমন এক ঢালাও দায়মুক্তি দেওয়া হবে, যা শিশুদের ক্ষতির জন্য কোনো এআই বা সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে চাওয়া প্রত্যেক অভিভাবক ও স্কুল ডিস্ট্রিক্টের হাত সম্পূর্ণ বেঁধে দেবে। এ ধারার অন্য কোনো ব্যাখ্যা হতে পারে না।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রটি রয়টার্সকে বলেছে, ‘কিডস অনলাইন সেইফটি অ্যাক্ট’ আইনের প্রতি নিজেদের বিরোধিতা তুলে নেওয়ার শর্ত হিসেবে মেটা এ প্রস্তাবটি সামনে এনেছে।
এদিকে, রিপাবলিকান সেনেটর মার্শা ব্ল্যাকবার্ন ও ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথালের উত্থাপিত বিলে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোম্পানির জন্য একটি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে, যাতে তারা অপ্রাপ্তবয়স্কদের সুরক্ষায় ও তাদের প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রতি আসক্তির মতো সুনির্দিষ্ট বিভিন্ন ক্ষতি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।
বর্তমানে বিলটি নিয়ে সিনেটর ব্ল্যাকবার্ন ও হোয়াইট হাউজের মধ্যে আলোচনা চলছে। তাদের লক্ষ্য, শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিলের সঙ্গে এমন এক ধারা জুড়ে দেওয়া, যা এআই নিয়ে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নিজস্ব কিছু আইনকে বাতিল বা শিথিল করতে পারে।
রয়টার্সের হাতে আসা মেটার এ সুনির্দিষ্ট দায়মুক্তির ধারাটি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে ব্ল্যাকবার্নের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা এ ধরনের কোনো প্রস্তাবিত খসড়া দেখিনি এবং এমন কিছু কখনোই বিবেচনা করব না।”
‘কিডস অনলাইন সেইফটি অ্যাক্ট’ আইনের অধীনে বিভিন্ন কোম্পানির জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট ফিচার ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা বাধ্যতামূলক হবে। যার মধ্যে রয়েছে, অবিরত স্ক্রলিংয়ের সুবিধা, ঘন ঘন নোটিফিকেশন ও চেহারা পরিবর্তনকারী ফটো ফিল্টার।
এ বছরের শুরুতে ক্যালিফোর্নিয়ার মেটা ও ইউটিউবের বিরুদ্ধে করা মামলায় জয়ী হয়েছেন একজন নারী। তার আইনজীবীরা প্রমাণ করেছিলেন, এসব ফিচার তরুণদের জন্য আসক্তি তৈরি করে ও ক্ষতিকর। আর বিষয়টি জানার পরও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম কোম্পানি এগুলো ব্যবহার করেছে। তবে কোম্পানি দুটি এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের পরিকল্পনা করছে।
২০২৪ সালে মার্কিন সেনেটে ৯১-৩ ভোটের বড় ব্যবধানে ‘কিডস অনলাইন সেইফটি অ্যাক্ট’ বিলটি পাস হলেও পরবর্তীতে ‘হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস’-এ তা আটকে যায়।
এ বছর রিপাবলিকান সেনেট মেজরিটি লিডার জন থুন ও ডেমোক্র্যাট সেনেট মাইনোরিটি লিডার চাক শুমার উভয় পক্ষের শীর্ষ নেতার সমর্থনে বিলটি পুনরায় উত্থাপিত হয়েছে।