Published : 20 Jun 2026, 11:47 AM
যুদ্ধক্ষেত্রের গণ্ডি পেরিয়ে বেসামরিক বিমানবন্দর ও তেলক্ষেত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ড্রোনের অনুপ্রবেশ বিশ্বজুড়ে নতুন আতঙ্ক তৈরি করেছে।
ইউরোপের বিভিন্ন বিমানবন্দরে ড্রোনের অনুপ্রবেশ ও মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্রে হামলার ঘটনা বিমানবন্দর ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে আকাশপথে আসা নতুন ধরনের হুমকি থেকে রক্ষার জন্য রেডার, জ্যামার ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের বড় এক বৈশ্বিক বাজার তৈরি হয়েছে, যা প্রতি বছর প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে।
রয়টার্স লিখেছে, ২০২০ সালের আগেও লন্ডনের গ্যাটউইক বিমানবন্দরের মতো অনেক বিমানবন্দর ড্রোনের সতর্কবার্তার কারণে ফ্লাইট স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল। তবে ইউক্রেইন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত ড্রোনের নতুন এক অনুপ্রবেশের ঢেউ এসব উদ্বেগকে চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় সম্প্রতি কিছু নতুন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন সামনে এসেছে। যেমন, মার্কিন কোম্পানি ‘ডেড্রোন’-এর তৈরি বন্দুক আকৃতির সরঞ্জাম, যা ড্রোনকে জ্যাম বা অকেজো করে দিতে পারে।
এ ছাড়া, যুদ্ধবিমানের সঙ্গে উড়তে ও এর পরিবর্তনযোগ্য সম্মুখভাগে ড্রোন-প্রতিরোধী জ্যামার ও অস্ত্র বহন করতে পারে বোয়িংয়ের তৈরি স্বয়ংক্রিয় ‘উইংম্যান’ ড্রোন। এ খাতে এখন শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ আসছে, যার পরিধি কেবল সামরিক খাতেই সীমিত নেই, বরং জ্বালানি, শিপিং, ডেটা সেন্টার, হোটেল ও বিমানবন্দরের মতো বেসামরিক খাতেও বিস্তৃত হচ্ছে।
নরওয়ের ৪৩টি বিমানবন্দরের মালিক ও পরিচালনা কোম্পানি ‘অ্যাভিনর’ এরইমধ্যে নিজেদের কার্যক্রমে ড্রোন শনাক্তকরণ ব্যবস্থা বসিয়েছে, যেন বেসামরিক ড্রোনের অনুপ্রবেশের কারণে আকাশপথে তৈরি হওয়া বিঘ্ন ও বিলম্ব ঠেকানো যায়।
ড্রোন-প্রতিরোধী প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন কোম্পানির একাধিক নির্বাহীর সঙ্গে কথা বলেছে রয়টার্স। তারা বলেছেন, বিভিন্ন দেশের সরকার, বিমানবন্দর ও বেসামরিক অবকাঠামো পরিচালনাকারীদের পক্ষ থেকে এ প্রযুক্তির চাহিদা বর্তমানে ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
নেদারল্যান্ডসভিত্তিক কাউন্টারড্রোন কোম্পানি ‘রবিনরেডার’-এর সিইও সিয়েতে হামিঙ্গা বলেছেন, “অনেকের কাছ থেকে ডাক পাওয়ার সরাসরি একটি প্রভাব আমরা লক্ষ্য করছি।”
রবিনরেডারের এ প্রযুক্তিটি আসলে প্লেনের সঙ্গে পাখির সংঘর্ষের প্রভাব সংক্রান্ত গবেষণা থেকে তৈরি হয়েছিল।
বছরে ২০ শতাংশ বাড়ছে ড্রোন-প্রতিরোধী প্রযুক্তির বাজার
ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে হাইব্রিড যুদ্ধকৌশল বা মিশ্র যুদ্ধরীতির ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বন্দর, তেলক্ষেত্র ও বিমানবন্দরের মতো অর্থনৈতিক ও বেসামরিক ঘাঁটিগুলোকে সুরক্ষিত করার প্রয়োজনীয়তা এখন তীব্রভাবে সামনে এসেছে।
গেল এক বছরে দুবাই বিমানবন্দরে ড্রোন হামলা, বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোতে ড্রোনের অনুপ্রবেশ, ফুজাইরাহ তেল অঞ্চলে ড্রোন ঠেকানোর পর তৈরি ধ্বংসাবশেষ থেকে আগুন লাগা এবং মিউনিখ ও কোপেনহেগেন বিমানবন্দরে ড্রোন সংক্রান্ত সতর্কবার্তার মতো বিভিন্ন ঘটনা ব্যাপক বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে।
ইউরোপের বেশ কয়েকটি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা ড্রোন-প্রতিরোধী প্রযুক্তির ব্যবহার আরও জোরদার করার কথা ভাবছে।
জুন পর্যন্ত প্রযুক্তি কোম্পানি ‘ডেড্রোন’-এর নির্বাহী হিসেবে কর্মরত অ্যাশ-আলেকজান্ডার কুপার পদত্যাগের আগে রয়টার্সকে বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ইরান যুদ্ধ শুরুর পরপরই তাদের কাছে অনেক অনুরোধ আসতে শুরু করে, যেখানে গ্রাহকরা ‘যত দ্রুত সম্ভব’ এ প্রযুক্তি বসাতে চাচ্ছিলেন।
“আমার ধারণা আমাদের মতো আরও অনেক কোম্পানির কাছেই এমন অনুরোধ যাচ্ছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও এখন অনেক দেশের সরকার বুঝতে পারছে তারা কতটা অরক্ষিত, বিশেষ করে যখন রিয়াল-টাইমে ড্রোনের হুমকির ধরন ও পরিধি ক্রমাগত বিবর্তিত হচ্ছে।”
বিশ্লেষকদের অনুমান, বিশ্বজুড়ে ড্রোন-প্রতিরোধী প্রযুক্তির বাজার বর্তমানে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার থেকে ৭০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ, যা প্রতি বছর প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে।
‘মার্কেটস-অ্যান্ড-মার্কেটস’ প্রতিবেদনে লিখেছে, এ বাজার বর্তমানের ৪৫০ কোটি ডলার থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ১ হাজার ৪৫০ কোটি ডলারে গিয়ে পৌঁছাবে।
ড্রোন শনাক্তকারী রেডার নির্মাতা কোম্পানি ‘ইকোডাইন’-এর সিইও ইবেন ফ্রাঙ্কেনবার্গ বলেছেন, এ বছরে তাদের কোম্পানি নতুন এক কারখানা খুলতে যাচ্ছে। এ নতুন বিনিয়োগের ফলে তাদের বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে ৩০ হাজার ইউনিটেরও বেশিতে দাঁড়াবে।
নিজের কোম্পানির প্রবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, “রেডারের চাহিদার ক্ষেত্রে আমরা গত বছর ১০০ শতাংশেরও বেশি প্রবৃদ্ধি দেখেছি এবং এই ধারা মোটেও মন্থর হচ্ছে না।”
বেসামরিক ক্ষেত্রে ড্রোন-প্রতিরোধী প্রযুক্তি ব্যবহারের কঠোর নিয়ম
এ প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহ থাকার পরও সামরিক ক্ষেত্রের বাইরে ড্রোন-প্রতিরোধী প্রযুক্তির সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এখনও বিভিন্ন আইনি ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন বড় বাধা হয়ে রয়েছে, বিশেষ করে বেসামরিক বিমানবন্দরগুলোতে ড্রোনের বিরুদ্ধে কোন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা যাবে, তা নিয়ে কঠোর নিয়মকানুন রয়েছে। ফলে এসব জায়গায় কেবল ড্রোন শনাক্তকরণ বা ডিটেকশন টুলের ওপরই বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।
এর অন্যতম কারণ জ্যামিং ও জিপিএস সিগনালে হস্তক্ষেপের মতো নানা বিষয় বিমানবন্দরের নিজস্ব যোগাযোগ ও ন্যাভিগেশন বা দিকনির্দেশনা ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে। ফলে এ ধরনের ব্যবস্থা বিমানবন্দরের আশপাশে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সাধারণ বেসামরিক পরিবেশে ড্রোন গুলি করে নামানোর জন্য সাধারণত কোনো অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতিও থাকে না।
জার্মান রেডার নির্মাতা কোম্পানি ‘হেনসোল্ড’-এর এক মুখপাত্র বলেছেন, “আপনি বেসামরিক অবকাঠামোর কাছাকাছি কোনোভাবেই মেশিনগান বা এ জাতীয় কোনো ‘কাইনেটিক এফেক্টিভ’, অর্থাৎ সরাসরি আঘাত করে, এমন অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবেন না।”
যুদ্ধক্ষেত্রে কার্যকর এসব ব্যবস্থা কীভাবে বেসামরিক ক্ষেত্রে আইনগত ও নিরাপদ উপায়ে ব্যবহার করা সম্ভব সেই সিদ্ধান্তের বড় অংশই এখন নির্ভর করছে স্ব-স্ব দেশের জাতীয় কর্তৃপক্ষের ওপর।
এ প্রসঙ্গে জার্মান ড্রোন ও এআইভিত্তিক কোম্পানি ‘হেলসিং’-এর এয়ার ডিভিশনের প্রধান স্টিফানি লিঙ্গেম্যান বলেছেন, “কোন বিষয়টির অনুমতি দেওয়া হবে তা নীতিগত প্রশ্ন এবং এর উত্তর দিতে হবে সরকারকেই। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার আমাদের নেই।”
‘ইঁদুর-বিড়াল খেলা’
এদিকে, এসব ড্রোনের সংখ্যা যেমন ক্রমাগত বাড়ছে তেমনই এগুলো প্রযুক্তির দিক থেকেও দিন দিন আরও বেশি আধুনিক ও জটিল হয়ে উঠছে।
রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি সেন্সিং প্রযুক্তির ড্রোন-প্রতিরোধী ব্যবস্থা তৈরি করা কোম্পানি ‘ড্রোনশিল্ড’-এর বাণিজ্যিক পরিচালক মাইক শ্যুট বলেছেন, “বিষয়টা আসলে সবসময়ই একটা ইঁদুর-বিড়াল খেলার মতো। কেউ একজন নতুন কোনো ড্রোন তৈরি করছে আর আমাদের নিশ্চিত করতে হচ্ছে যেন আমরা প্রযুক্তির দিক থেকে তাদের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকতে পারি।”
তবে সার্বিক বাজারের কথা বিবেচনা করে বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের অতি-আধুনিক প্রযুক্তির দাম বেশি, যা লাখ লাখ ডলারে পৌঁছাতে পারে এবং এগুলো যে সবসময় সঠিকভাবে কাজ করে তা-ও নয়।
‘কর্নেল ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক গ্রেগ ফ্যালকো বলেছেন, “এ মুহূর্তে চারদিকে কেবল এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে। প্রত্যেকেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে একটু বাড়তি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আশায় তাদের অস্ত্রাগারে পাওয়া সম্ভব এমন প্রতিটি সরঞ্জামই সংগ্রহের চেষ্টা করছে। তবে আমি এখানে অনেক ভুয়া ও অকার্যকর জিনিসের ছড়াছড়িও দেখতে পাচ্ছি।”