Published : 19 Jul 2026, 07:33 PM
১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক অ্যাপোলো ১১ মিশনে চাঁদে আটকে পড়ার হাত থেকে নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিনকে বাঁচিয়েছিল সাধারণ এক প্লাস্টিকের কলম। মহাকাশ ইতিহাসের রোমাঞ্চকর এ স্মারকটি সম্প্রতি নিউ ইয়র্কে এক নিলামে বিক্রি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে অনুষ্ঠিত এক নিলামে বাজ অলড্রিনের ব্যবহৃত সেই ঐতিহাসিক রুপালি প্লাস্টিকের ‘ডিউরো রকেট’ কলমটি ৮ লাখ ৫৭ হাজার ৬০০ ডলারে বিক্রি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
বিখ্যাত নিলামঘর ‘সোথবিস’ এ কলমটির আনুমানিক মূল্য ধরেছিল ৮ লাখ থেকে ১২ লাখ ডলারের মধ্যে। নিলামে পাঁচজন ক্রেতার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর ৮ লাখ ৫৭ হাজার ৬০০ ডলারে বিক্রি হয় কলমটি।
বিজয়ী ক্রেতা কলমটির পাশাপাশি সেই ভাঙা সার্কিট ব্রেকারের অংশটিও পেয়েছেন। দুটি জিনিসই বাজ অলড্রিনের নিজস্ব সংগ্রহশালা থেকে এসেছে।
১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে চাঁদের বুকে মানুষের প্রথম হাঁটার ঐতিহাসিক অধ্যায় শেষে নিল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন লুনার মডিউলের কেবিনে একটু ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ওই সময় অলড্রিনের চোখে পড়ে মেঝের ওপর ছোট একটি কালো সুইচ ভেঙে পড়ে আছে।
২০০৯ সালে প্রকাশিত নিজের আত্মজীবনী ‘ম্যাগনিফিসেন্ট ডেসোলেশন’-এ অলড্রিন সেই মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন, “আমার বুকটা ধক করে উঠেছিল... ওটা ছিল ইঞ্জিন-আর্ম সার্কিট ব্রেকারের ভাঙা অংশ। লুনার মডিউলটিকে চাঁদের বুক থেকে উৎক্ষেপণ করিয়ে আমাদের আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার জন্য আরোহন ইঞ্জিনে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল ওই ব্রেকারটি। সেটি ভেঙে যাওয়ার মানে, আমরা চিরতরে চাঁদে আটকে যেতে পারতাম।”
নিলামের সঙ্গে দেওয়া অলড্রিনের একটি সনদের চিঠিতে তিনি কৌতুক করে লিখেছেন, “নিলের ধারণা ছিল, সুইচটি আমি ভেঙেছি, আর আমি মনে করতাম ওটা নিল ভেঙেছে।”
তবে ২০১৬ সালে প্রকাশিত নিজের ‘নো ড্রিম ইজ টু হাই’ বইটিতে অলড্রিন নিজেই এর দায় স্বীকার করেছেন।
তিনি লিখেছেন, “সার্কিট ব্রেকারটি ক্যাপসুলের আমার পাশের অংশে থাকায়, সম্ভবত চাঁদে হাঁটার আগে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার সময় বা ফিরে আসার পর আমার পিঠের ভারী স্পেসস্যুটের ব্যাগের ধাক্কায় ওটা ভেঙে গিয়েছিল।”
এদিকে, নিলামের নথিতে বাজ অলড্রিন স্পষ্ট করেই বলেছেন, “দিনশেষে সবচেয়ে বড় কথা ছিল, আমাদের যে কোনো উপায়ে ওই ভাঙা সুইচের সমস্যার সমাধান করতে হত, যাতে আমরা চাঁদের পৃষ্ঠ ছেড়ে পৃথিবীর বুকে ফিরে আসতে পারি।”
নভোচারীরা সঙ্গে সঙ্গেই সমস্যাটি পৃথিবীতে থাকা মিশন কন্ট্রোলকে বলেছেন। প্রকৌশলীরা বিকল্প উপায়ে সার্কিটটিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের চেষ্টা করেছিলেন। তবে সকালের মধ্যে হিউস্টনের কন্ট্রোল রুম ব্যর্থ হয় এবং অলড্রিন ও আর্মস্ট্রংকে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছেন, “বিদ্যুৎ সংযোগের বিকল্প কোনো পথ আর খোলা নেই।”
অলড্রিন তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “আমি ভাবলাম, লুনার মডিউলের ভেতরে এমন কিছু যদি পাওয়া যায়, যা দিয়ে সার্কিটের ভেতর চাপ দিয়ে রাখা সম্ভব, তবে হয়ত কাজ হতে পারে। তবে এমনটা বৈদ্যুতিক বিষয়টি ছিল বলে আমি আঙুল ঢোকানো বা অগ্রভাগে ধাতু আছে এমন কিছু ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিই।”
ঠিক তখনই অলড্রিনের মনে পড়ে কালো ফেল্ট-টিপ কলমের কথা, যা তিনি তার ‘পার্সোনাল প্রেফারেন্স কিট’ বা ব্যক্তিগত ব্যাগের অংশ হিসেবে সঙ্গে এনেছিলেন। মহাকাশযানের অফিশিয়াল তালিকায় না থাকলেও কলমটি তখন তার স্পেসস্যুটের কাঁধের পকেটে ছিল।
সেই রোমাঞ্চকর মুহূর্তের বর্ণনা দিয়ে অলড্রিন বলেছেন, “আমি সাবধানে কলমটি দিয়ে সার্কিট ব্রেকারের ভেতর চাপ দিলাম। আমি সঙ্গে সঙ্গেই কলমের ডগাটি সরিয়ে নিতে চাচ্ছিলাম না, মনে মনে কেবল প্রার্থনা করছিলাম যেন এটি আটকে থাকে। এরপর খুব ধীরে, প্রায় অনিচ্ছাসত্ত্বেও হাত আলগা করে কলমটি সরিয়ে নিলাম। কলমটি ম্যাজিকের মতো কাজ করে ও সার্কিট ব্রেকারটি আটকে যায়। আমরা শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে ফেরার ছাড়পত্র পাই!”
৯৬ বছর বয়সি বাজ অলড্রিন বর্তমানে সফল চন্দ্রাভিযান সম্পন্ন করা জীবিত কেবল চার জনের একজন। চাঁদের বুকে পা রাখা প্রথম মানুষ নিল আর্মস্ট্রং ২০১২ সালে মারা গিয়েছেন।
মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ২০২৮ সালের মধ্যে আবারও চাঁদের বুকে মানুষ পাঠানোর পরিকল্পনা করছে। এরই অংশ হিসেবে সম্প্রতি সফল এক লুনার ফ্লাইবাই মিশনও সম্পন্ন করেছে তারা। পাশাপাশি চীনও ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে মানববাহী মিশন পাঠানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
তবে, অলড্রিন নিজে নাসার এই চাঁদে ফেরার অভিযানের চেয়ে মঙ্গল গ্রহে মানব বসতি বসানোর পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে প্রচারণা চালিয়ে আসছেন।
২০১৩ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসে এক নিবন্ধে অলড্রিন লিখেছিলেন, “দ্বিতীয়বার ‘চাঁদে যাওয়ার প্রতিযোগিতা’ আসলে আমার মতে এক কানাগলি। যুক্তরাষ্ট্রের উচিত মঙ্গলে মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিতের পেছনে সম্পদ ও মনোযোগ দেওয়া।”
২০১৬ সালে অলড্রিন লিখেছিলেন, “অ্যাপোলো ১১ মিশনের সেই ভাঙা সার্কিট ব্রেকার ও আমাদের রক্ষা করা কলমটি এখনো আমার কাছে আছে।”
সেই অমূল্য কলম ও সার্কিট ব্রেকারটিই এবার এক মোটা অংকের বিনিময়ে চলে গেল নতুন এক মালিকের সংগ্রহে।