Published : 21 Jul 2026, 12:50 AM
ঢাকার উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলেও হতাহতদের ক্ষতিপূরণের অর্থ নিয়ে জটিলতা কাটেনি।
অভিভাবকদের বক্তব্য হলো, এ ঘটনায় সরকার যে ক্ষতিপূরণ দিতে চাইছে, তা ‘অপ্রতুল’। আহত অনেক শিক্ষার্থীর চিকিৎসার খরচই এর কয়েক গুণ।
অন্যদিকে, সরকারের তরফ থেকেও নতুন করে এ নিয়ে আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সবমিলিয়ে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দিন কাটছে হতাশা আর বিষণ্ণতায়।
কী ঘটেছিল সেদিন
২০২৫ সালের ২১ জুলাই, দিনটি ছিল সোমবার। দুপুরে সোয়া ১টা নাগাদ ঢাকার উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের একটি ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই মডেলের জঙ্গিবিমান বিধ্বস্ত হয়।
মুহুর্তেই এক মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারণা হয় সেখানে। দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে পুড়ে যায় ছোট্টো শিশুদের কোমল শরীর।

এ ঘটনায় অন্তত ৩৬ জন নিহত হন। আহত হন শতাধিক। হতাহতদের অধিকাংশই শিশু। সেদিন প্রাণ হারান উড়োজাহাজের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও।
সরকারি হিসাবে অবশ্য নিহতের সংখ্যা ৩৫; আহতের সংখ্যা ৬৪।
এ ঘটনার একদিন পর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আনিসুর রহমান রায়হান জনস্বার্থে একটি রিট আবেদন করেন। এই রিট আবেদনে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার পাশাপাশি সরকারকে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছিল।
রিট আবেদন আমলে নিয়ে ঘটনা তদন্তে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে নিহতদের পাঁচ কোটি করে এবং আহতদের এক কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে রুল জারি করা হয়েছিল।
কয়েক দফা বৈঠকের পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ, অর্থসহায়তা ও চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়ে ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর একটি সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
সভায় আহতদের প্রত্যেক পরিবারকে পাঁচ লাখ এবং নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে ২০ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
সে হিসাবে পাঁচ লাখ টাকা করে আহতদের ৬৪ জন পাবে ৩ কোটি ২০ লাখ এবং ২০ লাখ টাকা করে নিহতদের ৩৫ পরিবার পাবে সাত কোটি টাকা।

ক্ষতিপূরণ ‘অপ্রতুল’
রিট চলাকালীন সরকারের এ সিদ্ধান্তের পর বাধ সাধেন ক্ষতিগ্রস্ত অভিভাবকরা। তারা মনে করেন, ক্ষতিপূরণের এই অর্থ ‘বাস্তবসম্মত’ নয়। এ নিয়ে সরকারের তরফেও ‘দেন-দরবার’ চলে। তবে, পুরো বিষয়টি এখন পর্যন্ত অমীমাংসিত।
মাইলস্টোন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির নিহত শিক্ষার্থী মাহতাব রহমানের বাবা মিনহাজ রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “না, আমরা সেটি (ক্ষতিপূরণের অর্থ) নিইনি। আমাদের পৃথিবী, আমাদের স্বপ্ন, আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ চলে গেছে; তার বিনিময় কী ২০ লাখ টাকা হতে পারে? এটা আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন।
“একটা আহত বাচ্চার মূল্য কী ৫ লাখ টাকা হইতে পারে বলেন? এটা কোনোভাবে হয়? এটা কি মানবিক? তাই আমরা নিইনি এবং আমরা আবেদন করেছি সরকারের কাছে।”
তিনি বলেন, “শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে আমাদেরকে চিঠি দিয়েছে, অনুরোধ করেছে যে, আমরা যেন এটা গ্রহণ করি। তো আমরাও উনাদেরকে অনুরোধ করেছি। অনুরোধের মাধ্যমেই আমরা অ্যাপ্লিকেশনটা দিয়েছি।”
“সরকারের কাছে চেয়েছি যে আমাদের একটা রিট আবেদন হয়েছে, এই রিট আবেদনটা যেন সরকার বাস্তবায়ন করে দেন। আমাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া-পাওয়া হচ্ছে, আমাদের ‘মানবিক প্রধানমন্ত্রীর’ সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ। আমরা যেন উনার কাছে আমাদের কথাগুলো তুলে ধরতে পারি, এটা আমাদের বড় চাওয়া এখন।”

নিহত চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসনিম আফরোজ আয়মানের মা আয়েশা আক্তার কানন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের কাছে সরকারের পক্ষ থেকে ২০ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু আমরা এক টাকাও ছুঁই নাই। স্কুলের ওই গাফিলতির পর তারা টাকার অঙ্ক ধরে মীমাংসা করতে চাইছিল।
“কিন্তু টাকা দিয়ে আমি কী করব? সারা দুনিয়া এনে দিলেও কি আমার আয়মান ফিরে আসবে? আমি তো বলেছিলাম, আমি উল্টো টাকা দেই, আমার আয়মানকে এক সেকেন্ডের জন্য আমার বুকে এনে জড়িয়ে ধরতে দেন!”
এ ঘটনায় আহত চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আবিদুর রহিম আবিদের বাবা মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আসলে এটা অনেক আগে থেকেই সরকারের থেকে ঘোষণা আসছে, এবং লাস্ট ২৪ তারি খে আমাদের স্কুল থেকে ডেকেছিল যে, সরকার থেকে এই টাকাটা দেওয়া হবে।
“আপনারা যদি নিতে চান, তাহলে আজকের মধ্যেই কনফার্ম করতে হবে। না হলে এটা আবার রিটার্ন যাবে, ব্যাক যাবে। তো যাইহোক, এটা আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের একটা সংগঠন আছে। তো আমাদের সবার পক্ষ থেকেই এইটা গ্রহণ করা হয়নি। সমস্ত অভিভাবকের পক্ষ থেকে এটা নেওয়া হয়নি।”
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “আসলে ওদের ওদের ক্ষতির তুলনায় এটা সামান্য। এই যে পাঁচ লাখ টাকা, এটা হয়ত ওর কয়েক দিনের চিকিৎসার খরচ। এসব দিক বিবেচনা করে এটা নেওয়া হয়নি। কারণ আমাদের একটা টার্গেট ছিল যে, একটা রিট আবেদন যে করা আছে, সেটার বাস্তবায়ন আমরা চাচ্ছিলাম।”
রিটে বিষয়গুলো আমলে নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “তো আসলে সরকার এটা ঘোষণা করছে এটা এককালীন দেওয়া হবে। এককালীন সরকার দিয়েই এটা পার পেয়ে যাবে, আমরা আসলে এভাবে চাইনি। তো আমরা আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে, আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে একটা দাবি যে, এটা রিট আবেদনটা যেন বাস্তবায়ন হয়। রিট আবেদনের যেসব পয়েন্ট আছে, সেটা যেন বাস্তবায়ন হয়।”

একজনও ক্ষতিপূরণ নেয়নি
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল নুরুন নবী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে সবাই আন্তরিক ছিলেন এবং সহমর্মিতা, সমবেদনা সবকিছু জানিয়েছেন। কিন্তু একটা কমিটি করে দিয়েছিল, সেখানে আমি বেশ কয়েকবার উনাদের সঙ্গে দেখা করেছি। যে আর্থিক সাহায্যটা করা হয়েছে, সেটা পর্যাপ্ত নয়। অভিভাবকরা তো সন্তুষ্ট হয় নাই, বিশেষ করে আহত বাচ্চাদের বেলায়।”
তিনি বলেন, “যে এয়ারক্রাফটটা ক্র্যাশ করেছে, এটার ডিজেল ইজ সো পাওয়ারফুল। যেখানে লেগেছে, জ্বলে গেছে একবারে। একবার অপারেশন করলে ঠিক হয়ে গেল, তিন মাস পরে আবার ওই জায়গায় পচন ধরে, আবার অপারেশন করা লাগে। ইটস ভেরি এক্সপেন্সিভ, ভেরি এক্সপেন্সিভ।”
তিনি বলেন, “শিক্ষা মন্ত্রণালয় আমাদেরকে অনেকবার বলেছে টাকাটা গ্রহণ করার জন্য, কিন্তু অভিভাবকরা যেহেতু টাকাটা নিতে রাজি হয় নাই, যার ফলে আমরা টাকাটা গ্রহণ করি নাই। একজনও গ্রহণ করে নাই।”
ক্ষতিপূরণ দেবে কোন মন্ত্রণালয়?
দুর্ঘটনার পর শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ দিতে যে কমিটি হয়েছিল, তাতে নেতৃত্ব দেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমার জানামতে আমাদের ধার্য্য করা ক্ষতিপূরণ কম বিবেচনায় ভুক্তভোগীরা তা নিতে চাননি। তাদের সঙ্গে আমাদের শেষ পর্যায়ে আর আনুষ্ঠানিকভাবে বসা হয় নাই। ফলে বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে গিয়েছিল। নতুন সরকার এই বিষয়ে আর কিছু করেছে কিনা আমার জানা নেই। আমরা কিন্তু চিকিৎসার ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।”
প্রাথমিকভাবে অর্থমন্ত্রণালয় থেকে নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় অর্থছাড়ের সিদ্ধান্ত নিলেও পরে অভিভাবকরা নিতে না চাওয়ায় সেটি নিয়ে অস্পষ্টতা রয়েই যায়৷
কোন মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে কারা ক্ষতিপূরণের অর্থ দেবেন জানতে চাইলে রিজওয়ানা বলেন, “কে দিবে এটা নিয়ে কনক্লুসিভ কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অভিভাবকরা শিক্ষা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে গিয়েছিল। আমার নেতৃত্বে সেসময় শিক্ষা ও অর্থ মন্ত্রণালয় মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে এটুকু দেওয়া হবে।
“কিন্তু, টাকাটা কোন মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হবে, সেরকম কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে আমার মনে পড়ছে না। প্রথম তো আর্থিক অঙ্কটাতে সম্মতিতে দিতে হবে, তারপরে তো সিদ্ধান্ত হবে।”

নতুন সরকারও কোনো উদ্যোগ নেয়নি
‘মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার’ নামে নিহত-আহত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের একটি সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, “আমাদের চাওয়াটা হচ্ছে মূলত, এখন যদি বলি, যে রিট আবেদনটা করা আছে, রিটের বাস্তবায়নটা করুক সরকার। অথবা তদন্ত কমিশন থেকে যে রিপোর্টটা দিয়েছিল, ওটা পূর্ণাঙ্গ রূপে প্রকাশ করুক এবং ওখানেও কিন্তু কম্পেনসেশনের বিষয়টা আছে।”
তিনি বলেন, “সেটাও তো আমাদেরকে যদি ডাকে, ডেকে যদি বলে যে আমাদের দেশের এই পরিস্থিতিতে আপনাদেরকে আমরা এইটা দিচ্ছি বা এই এই সুযোগ সুবিধাগুলো দিতে পারব, এগুলা দিতে পারব না। সেটা আলাপ-আলোচনার ভিতরেও তো অনেকে বুঝাতে পারে, তাই না? এখন আপনি আমার সঙ্গে কথাই বললেন না, কিছুই না। আপনি বললেন যে, আচ্ছা তোমার জন্য আমি ২ টাকা রাখছি, এটা নিয়ে যাও।”
নাজমুল বলেন, “এটা তো আসলে কেমন দেখায় না? একটা সমবেদনার জায়গাটাও তো দরকার আছে। ৮ থেকে ১০ জন বাচ্চা এরকম আছে যাদের অবস্থা গুরুতর। দফায়-দফায় অপারেশন করা লাগছে। পাঁচ লাখ টাকায় তো ওর কিছুই হবে না।
“অনেকে এরকম আছে যে, যার একটাই বাচ্চা ছিল, তার কেউই নাই আর পৃথিবীতে। এমন সিঙ্গেল মাদারও আছে, যেমন আরিয়ান আফিফ, ওর মা একা, তার একটাই ছেলে। আফিফ কিন্তু এখনো ভালো করে দাঁড়াইতে পারে না, ও হাঁটতেও পারে না। ওকে আপনি ৫ লাখ টাকা দিলে ওর জীবন কি চলবে এই ৫ লাখ টাকায়?”
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরে এই বিষয়ে কেউ যোগাযোগ করেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “না, এখন পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে এই নতুন সরকার আসার পর ওভাবে কেউই যোগাযোগ করে নাই। আমরা চেষ্টা করেছি, আমি ব্যক্তিগতভাবে আমাদের এই কমিটি থেকেও একজনকে নিয়ে এবং স্কুলের উপদেষ্টা যে আছে নূরন্নবী স্যার, উনাকে নিয়ে পর্যন্ত একাধিক মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পর্যন্ত গিয়েছি। কোনো লাভ হয়নি।”
সার্বিক বিষয়ে জানতে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজকে একাধিকবার ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
আরো পড়ুন
মাইলস্টোন ট্রাজেডি: ইউনূসসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন
মাইলস্টোন ট্রাজেডি: বিধ্বস্ত বিমান, অচেতন দায়িত্ববোধ
মাইলস্টোন কলেজে আছড়ে পড়ল বিমান বাহিনীর উড়োজাহাজ, নিহত অন্তত ২০