Published : 21 Jul 2026, 12:07 AM
খাবার পৌঁছে দেওয়ার কাজের ফাঁকে কাগজের চিরকুটে লিখতেন কবিতা। সেই কবিতাই ওয়াং জিবিংকে এনে দিয়েছে চীনের শীর্ষ সাহিত্য সম্মান 'লু শুন সাহিত্য পুরস্কার'।
ডেলিভারি রাইডাররা প্রাত্যহিক জীবনে যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় তা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা তার কাব্য সংকলন 'লো ফ্লাইট' এই পুরস্কার জিতেছে। আধুনিক চীনা সাহিত্যের জনক ধরা হয় লু শুনকে। তার নামেই এই সম্মাননা।
৫৬ বছর বয়সী ওয়াং জিবিং ২০১৯ সালের দিকে খাবার ডেলিভারির কাজ শুরু করেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার কবিতা ও প্রবন্ধ ছড়িয়ে পড়লে তিনি মানুষের নজরে আসেন।
ওয়াং জিবিং সেই ক্রমবর্ধমান শ্রমিক শ্রেণির লেখকদেরই একজন, যারা নিজেদের সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে স্বীকৃতি অর্জন করছেন। তাদের লেখায় চীনের বিশাল ‘গিগ অর্থনীতিতে’ কাজ করা মানুষদের দৈনন্দিন সংগ্রাম, চাপ ও বাস্তবতার চিত্র উঠে আসে।
ওয়াং জিবিংয়ের জন্য এই মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কার এসেছে কয়েক দশকের দিনমজুরের কাজের কঠিন সময় পাড়ি দেওয়ার পর।
গত ১৫ জুলাই পুরস্কার জয়ের খবর প্রকাশের পর তিনি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, “আমি দম বন্ধ করে ছিলাম, খুবই নার্ভাস ছিলাম। ফল প্রকাশের পর সবকিছু শান্ত হল।” তিনি আরও জানান, তাকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমে মাতামাতি তার জন্য কিছুটা মানসিক চাপ তৈরি করেছিল।
'লু শুন সাহিত্য পুরস্কার'-এর অর্থমূল্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো না হলেও ২০১৪ সাল পর্যন্ত এর অঙ্ক ছিল ১ লাখ চীনা ইউয়ান (১৪ হাজার ৮০০ ডলার)।
জীবনসংগ্রাম ও কবিতার সূচনা:
চীনের জিয়াংসু প্রদেশে জন্ম নেওয়া ওয়াং জিবিং কিশোর বয়সেই পরিবারের অভাবের কারণে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হন। ডেলিভারি রাইডার হওয়ার আগে তিনি নির্মাণ শ্রমিক এবং আবর্জনা সংগ্রহকারী হিসেবে কাজ করতেন।
রাস্তার পাশে দোকান দিয়ে পণ্যও বিক্রি করেছেন। তবে এই প্রতিকূলতার মধ্যেও তার পড়ার নেশা ছিল। গত এক দশক ধরে তিনি নিজের লেখা কবিতা ও প্রবন্ধ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে আসছিলেন।
২০২২ সালে তার 'ম্যান ইন এ হারি' শিরোনামের একটি কবিতা অনলাইনে ব্যাপক সাড়া জাগায়। ২০১৯ সালের একটি ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি এটি লিখেছিলেন। সে সময় একজন গ্রাহক ভুল ঠিকানা দেওয়ায় পার্সেল ডেলিভারি দিতে তাকে দীর্ঘ সময় ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল।
পেশা ছাড়ার ইচ্ছা নেই:
২০২৩ সালে ওয়াং তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন- ‘ম্যান ইন এ হারি: পোয়েমস অব এ ফুড ডেলিভারি রাইডার’। পুরস্কার জিতলেও বর্তমান কাজ ছাড়ার কোনও পরিকল্পনা নেই ওয়াংয়ের। অন্তত ৬০ বছর পর্যন্ত তিনি ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ করে যেতে চান।
তিনি বলেন, “আর্থিকভাবে চলার জন্য এই কাজের আমার প্রয়োজন নেই। তবে আমি এই কাজের পরিবেশ পছন্দ করি এবং একাজ আমাকে শারীরিকভাবে সুস্থ রাখে। আমি সাধারণ জীবন যাপন করতে চাই। এই পুরস্কার আমার পরিচয় বদলে দেবে না।”
২০২৪ সালে প্রকাশিত হয় তার পুরস্কারজয়ী কাব্যসংকলন 'লো ফ্লাইট'। প্রায় ২০০ জন ডেলিভারি রাইডারের সাক্ষাৎকার ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এটি লিখেছেন ওয়াং। তার কবিতার একটি পঙক্তি হল—“কে বলল ডানা মেলা মানেই কেবল উঁচুতে ওড়া? নিচুতে ওড়াও নিশ্চয়ই ওড়া।”
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনে শ্রমিক শ্রেণির মানুষরা সাহিত্য জগতে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করছেন। ২০২৩ সালে সাবেক কুরিয়ার কর্মী হু আনিয়ানের স্মৃতিকথা 'আই ডেলিভার পার্সেলস ইন বেইজিং' চীনে এবং বিদেশেও গণমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
এর আগে ২০১৭ সালে অভিবাসী শ্রমিকের ব্যক্তিগত লড়াই নিয়ে লেখা ফ্যান ইউসুর আত্মজীবনীমূলক প্রবন্ধও অনলাইনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।