Published : 16 May 2026, 10:11 AM
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফরে মার্কিন প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ কর্তারা সফরসঙ্গী হলেও বহুল আলোচিত চিপ রপ্তানি ইস্যুর কোনো সমাধান মেলেনি।
বিশ্ববাজারে অন্যতম নিয়ন্ত্রক উপাদান বিরল খনিজ সরবরাহ সংক্রান্ত চুক্তিটির মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না তা নিয়েও এখনো অনিশ্চয়তা কাটল না। ফলে বড় ধরনের কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক।
আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি প্রতিবেদনে লিখেছে, বুধবার আলাস্কা থেকে চীন যাওয়ার ২০ ঘণ্টারও বেশি সময়ের দীর্ঘ ফ্লাইটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হিসেবে আমেরিকার শীর্ষ ব্যবসায়িক নির্বাহীদের তালিকার দিকে তাকালেই বোঝা গিয়েছিল, বেইজিংয়ে মার্কিন প্রতিনিধি দলের মূল লক্ষ্য আসলে কী।
সেই প্লেনে এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং, টেসলার ইলন মাস্ক ও অ্যাপলের টিম কুকের পাশাপাশি মেটা, মাইক্রন, কোয়ালকম ও কোহেরেন্ট-এর মতো বড় বড় কোম্পানির শীর্ষ কর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ফলে এ সফরে প্রযুক্তি খাত নিয়ে যে যুক্তরাষ্ট্রের বড়সড় প্রচেষ্টা থাকবে তা সহজেই ধরে নেওয়া গিয়েছিল।
সফরের শুরুটা এ ব্যবসায়ী দলটির জন্য বেশ ইতিবাচকও ছিল। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আশ্বাস দিয়েছেন, মার্কিন ব্যবসার জন্য তাদের দুয়ার উন্মুক্ত করবে চীন।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেছেন, নির্বাহীরা বেইজিংয়ের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে সরাসরি তাদের ব্যবসায়িক প্রস্তাব তুলে ধরার সুযোগও পেয়েছিলেন।
শুক্রবার ব্লুমবার্গ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রিয়ার বলেছেন, “গতকাল মার্কিন ব্যবসায়িক নেতারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট শি’র সঙ্গে বৈঠকে বসার সুযোগ পেয়েছিলেন, যেখানে তারা নিজ নিজ কোম্পানি নিয়ে কিছু কথা বলেছেন।”
সেখানে এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াংয়ের উপস্থিত থাকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন গ্রিয়ার।
চিপ রপ্তানি নিয়ে নীরবতা
তবে, এনভিডিয়া প্রধানের জন্য বেশ বড় একটি ‘তবে’র কথা উল্লেখ করে গ্রিয়ার বলেছেন, সেই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে “চিপ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।”
এ সপ্তাহের শুরুতে ‘কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস’-এর সিনিয়র ফেলো হেইডি ক্রেবো-রেডিকার বলেছিলেন, এনভিডিয়ার ‘এইচ২০০’ চিপ বিক্রির কোনো লাইসেন্স চুক্তি হওয়াটা হবে ‘রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল ও বিস্ফোরক’, যা মার্কিন কংগ্রেসে চীন-বিরোধী নীতিতে বিশ্বাসী কঠোরপন্থী নেতাদের তীব্র ক্ষোভের কারণ হতে পারে।
নিজেদের দেশে এমন বিরোধিতার আশঙ্কা থাকার পরও বৃহস্পতিবার রয়টার্স এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ওয়াশিংটন বেশ কয়েকটি বড় চীনা প্রযুক্তি কোম্পানির কাছে এনভিডিয়ার ‘এইচ২০০ এআই’ চিপ বিক্রির অনুমোদন দিয়েছে।
এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত করতে রয়টার্স সংশ্লিষ্ট তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়েছে। অবশ্য, চীনের দিক থেকেও মার্কিন চিপের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা নিয়ে এক ধরনের অনিহা কাজ করছে।
এ প্রসঙ্গে গ্রিয়ার বলেছেন, “চীনারা শেষ পর্যন্ত মার্কিন চিপ কিনবে কি না সেই সিদ্ধান্ত তারা নিজেরাই নিচ্ছে। তারা এখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। কারণ তারা প্রায়শই আমেরিকার উচ্চ-প্রযুক্তিকে নিজেদের জন্য হুমকি মনে করে।
“এআই চিপের দৌড়ে আমরা যদি এগিয়ে থাকি... তবে তাদের মনে এই ভয় জাগে যে, বিষয়টি তাদের নিজস্ব প্রবৃদ্ধিকে থামিয়ে দিতে পারে।”
খনিজ ও বিরল উপাদান
অনেকের ধারণা ছিল, এ সফরে প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হবে, অর্থাৎ চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা খনিজ ও বিরল বিভিন্ন খনিজ উপাদানে আমেরিকার প্রবেশাধিকার। বিশ্ববাজারের এসব খনিজ উপাদানের সিংহভাগই চীনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এসব খনিজ উপাদানের ওপর বেইজিংয়ের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল ২০২৫ সালে মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে চীনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। একটি বাণিজ্য চুক্তি বা যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগে চীন এসব খনিজের রপ্তানি বেশ কমিয়ে দিয়েছিল।
বর্তমানে থাকা এ চুক্তির মেয়াদ এ বছরের শরৎ পর্যন্ত রয়েছে। চুক্তিটিকে ‘যথেষ্ট জোরালো’ বলে বর্ণনা করেছেন গ্রিয়ার। তবে এ চুক্তির মেয়াদ আরও বাড়ানো হবে কি না তা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এ বিষয়ে গ্রিয়ার বলেছেন, “এমনটা সময়ই বলে দেবে।
“উভয় পক্ষই নীতিগতভাবে রাজি যে, এ চুক্তি যদি দুই দেশের জন্যই ইতিবাচক ফল আনবে। তবে বিরল খনিজ উপাদান পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে চুক্তির মেয়াদ আরও বাড়ানো হবে।”
চীন থেকে আমেরিকার এই বিরল খনিজ পাওয়ার পরিমাণ ‘আগের চেয়ে ভালো পর্যায়ে’ পৌঁছেছে তবে ‘কখনো কখনো প্রক্রিয়াটি বেশ ধীরগতির হয়’ বলেও উল্লেখ করেছেন গ্রিয়ার।
ক্রেবো-রেডিকার বলেছেন, আমেরিকার এ অতিপ্রয়োজনীয় খনিজ ও বিরল খনিজ উপাদান পাওয়ার ক্ষেত্রে চুক্তিটির মেয়াদ বাড়ানোয় হবে ‘সবচেয়ে ইতিবাচক বা সেরা ফলাফল’।
“খনিজ উত্তোলন, প্রক্রিয়াজাতকরণ বা অর্থ ব্যয়ের দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার বিভিন্ন মিত্র দেশ এত দ্রুত চীনকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না, যা দিয়ে তারা নিকট ভবিষ্যতে এ খাতের সংকট কাটিয়ে স্বনির্ভর হতে পারে।”
দুই দেশের মধ্যকার অন্যতম স্পর্শকাতর এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা যে আগামী গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত বেশ ভালোভাবেই গড়াবে তা প্রায় নিশ্চিত।
এ বছরের সেপ্টেম্বরে ফিরতি সফরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যদি যুক্তরাষ্ট্রে যান তবে বিষয়টিকে ফের আলোচনার টেবিলে উঠতে দেখলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।