১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

এবারের বিশ্বকাপে প্রযুক্তির চমক এআই, স্মার্ট বল ও রোবট কুকুর

মাঠে দর্শকদের ম্যাচ দেখার অভিজ্ঞতা আরও উপভোগ্য ও খেলোয়াড়দের জন্য খেলাকে আধুনিক করতে এবার প্রযুক্তির অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপ।

এবারের বিশ্বকাপে প্রযুক্তির চমক এআই, স্মার্ট বল ও রোবট কুকুর
প্রযুক্তির ছোঁয়া কেবল ম্যাচ বলেই আটকে নেই, এর বড় অংশ জুড়ে রয়েছেন খেলোয়াড়রাও। ছবি: রয়টার্স

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 11 Jul 2026, 12:06 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:38 PM

অনেক কারণেই ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসে অনন্য এক অধ্যায় হয়ে উঠেছে। ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি দলের অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে যৌথভাবে তিন আয়োজক দেশ ৩৯ দিনের এ টুর্নামেন্টকে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে জমকালো আসর করে তুলেছে।

তবে কেবল জাঁকজমকই নয়, মাঠে দর্শকদের ম্যাচ দেখার অভিজ্ঞতা আরও উপভোগ্য ও খেলোয়াড়দের জন্য খেলাকে আধুনিক করতে এবার প্রযুক্তির অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটিয়েছে ২০২৬ বিশ্বকাপ।

বিশ্বকাপে প্রযুক্তি নতুন চমকগুলো নিয়ে একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেছে আল জাজিরা। সেখানে একটু নজর বুলানো যাক-

১. সেন্সরওয়ালা অফিশিয়াল বল

এ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল ম্যাচ বলের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ট্রায়োন্ডা’। স্প্যানিশ ভাষায় যার অর্থ ‘তিন তরঙ্গ’।

অ্যাডিডাসের তৈরি এ বলটির বিশেষত্ব হচ্ছে এ বলের ভেতরে বসানো হয়েছে নিখুঁত ও ক্ষুদ্র ‘ইনারশিয়াল মেজারমেন্ট ইউনিট’ বা আইএমইউ সেন্সর চিপ।

চিপটি বলের প্রতিটি নড়াচড়ার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম তথ্য সরবরাহ করে। সেন্সরটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার বলের গতিবিধি ট্র্যাক করতে পারে, যা ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি অবস্থানে বলের গতি ও সূক্ষ্ম বিভিন্ন ঘূর্ণনকে নিখুঁতভাবে পরিমাপ করে।

এক বিবৃতিতে ফিফা বলেছে, “প্রযুক্তিটি রিয়াল-টাইম বা লাইভে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর সিস্টেমে একদম সঠিক ডেটা পাঠাবে। ফলে অফসাইডের মতো জটিল বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ম্যাচ অফিশিয়ালদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও সহজ ও নির্ভুল হবে।”

ফিফার ‘হেড অফ রিসার্চ অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস’ নিকোলাস এভান্স বলেছেন, সেন্সরটি জানাবে ‘থ্রিডি অবস্থানে বলটি ঠিক এই মুহূর্তে কী করছে’।

২. এআইচালিত থ্রিডি প্লেয়ার অ্যাভাটার

প্রযুক্তির ছোঁয়া কেবল ম্যাচ বলেই আটকে নেই, এর বড় অংশ জুড়ে রয়েছেন খোদ খেলোয়াড়রাও। পার্সোনাল কম্পিউটার নির্মাণে বিশ্বে বৃহত্তম কোম্পানি ‘লেনোভো’র সঙ্গে ফিফার অংশীদারিত্বের অংশ হিসেবে বছরের শুরুতে এআইচালিত বেশ কিছু প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এসেছে, যার মধ্যে অন্যতম এআইচালিত থ্রিডি প্লেয়ার অ্যাভাটার।

এর মাধ্যমে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া প্রত্যেক খেলোয়াড়ের দেহ ডিজিটালি স্ক্যান করে নিখুঁত এক থ্রিডি মডেল বা অ্যাভাটার তৈরি হবে। প্রতিটি স্ক্যান সম্পন্ন করতে সময় লাগবে কেবল এক সেকেন্ডের মতো।

ফিফার ভাষ্য অনুসারে, এ স্ক্যান খেলোয়াড়দের দেহের প্রতিটি অংশের নিখুঁত পরিমাপ ধারণ করবে। ফলে মাঠে প্রচণ্ড গতিতে ছুটে চলা বা অন্য খেলোয়াড়দের আড়ালে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তেও সিস্টেমটি খেলোয়াড়দের অবস্থান নিখুঁতভাবে ট্র্যাক করতে পারবে।

জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে ফিফা বলেছিল, “সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এ এআইচালিত থ্রিডি প্লেয়ার অ্যাভাটার এক যুগান্তকারী উন্নয়ন।

“ভিএআর সিস্টেমের মাধ্যমে নেওয়া অফসাইডের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শক ও বিশ্বজুড়ে থাকা টেলিভিশন দর্শকদের সামনে আরও বাস্তবসম্মত উপায়ে দেখাতে এসব থ্রিডি মডেল ব্রডকাস্ট বা সরাসরি সম্প্রচারে যোগ হবে।”

বিশ্বের বড় বড় ফুটবল লিগগুলোতে পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহারের পর এবার বিশ্বকাপের সবকটি (১০৪টি) ম্যাচেই রেফারিদের দেহে বিশেষ ‘বডি ক্যামেরা’ ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে দর্শকরা একদম মাঠের ভেতরে থাকা রেফারির চোখ দিয়ে খেলা দেখার মতো এক অনন্য অভিজ্ঞতা পাবেন।

৩. রোবট কুকুর

বিশ্বকাপের সময় যে কোনো ধরনের অপরাধ বা বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে মেক্সিকান পুলিশ এবার কুকুরের ওপর ভরসা রাখছে। তবে তা কোনো সাধারণ চারপেয় জীব নয়, বরং যান্ত্রিক বা রোবট কুকুর!

চার পায়ের এসব রোবটকে যে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ বা বিপজ্জনক এলাকায় প্রবেশের জন্য তৈরি করা হয়েছে। সেখান থেকে সরাসরি লাইভ ভিডিও সম্প্রচার করে তা নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে পাঠাবে এসব রোবট, যা দেখে মাঠের পুলিশ সদস্যরা পরিস্থিতি বুঝে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

বিশ্বকাপের সময় যে কোনো ধরনের অপরাধ বা বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে মেক্সিকান পুলিশ এবার কুকুরের ওপর ভরসা রাখছে। ছবি: রয়টার্স

বিশ্বকাপের সময় যে কোনো ধরনের অপরাধ বা বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে মেক্সিকান পুলিশ এবার কুকুরের ওপর ভরসা রাখছে

মেক্সিকোর মন্তেরেই মেট্রো অঞ্চলের গুয়াদালুপে সিটি কাউন্সিল প্রায় ২৫ লাখ পেসো বা ১ লাখ ৪৫ হাজার ডলার ব্যয়ে এসব অ্যানিম্যালয়েড বা প্রাণীর মতো দেখতে রোবট সংগ্রহ করেছে।

এ বিষয়ে স্থানীয় মেয়র হেক্টর গার্সিয়া বলেছেন, টুর্নামেন্ট চলাকালীন মাঠে ‘যে কোনো ধরনের সংঘর্ষ বা বিশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে’ এগুলো মোতায়েন হবে।

“এসব রোবট কুকুরের মূল উদ্দেশ্য হল, প্রাথমিক হস্তক্ষেপে পুলিশ কর্মকর্তাদের সহায়তা ও মাঠকর্মীদের শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

৪. উন্নত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি

লাইন্সম্যানের দেরিতে অফসাইড ফ্ল্যাগ তোলার কারণে যারা বিরক্ত হন তাদের সেই অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। ফিফা এবার আরও উন্নত ‘সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি’ চালু করেছে, যা মাঠের অফিশিয়ালদের খেলা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা না করেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করছে।

আগের সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তিটি রিয়াল-টাইমে অফসাইড শনাক্তের জন্য ডিজাইন করা হলেও কোনো খেলোয়াড় কেবল ৫০ সেন্টিমিটারের বেশি অফসাইডে থাকলেই তা অফিশিয়ালদের সতর্ক করত।

তবে এর নতুন ও পরিমার্জিত সংস্করণে কেবল ১০ সেন্টিমিটার বা তার কাছাকাছি অফসাইড হলেও সিস্টেমটি সংকেত দেয়, যা ম্যাচ অফিশিয়ালদের আরও নিখুঁত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করছে।

এ ছাড়া, ভিএআর রুম থেকে যোগাযোগের অপেক্ষা না করে এবার মাঠের রেফারিরা সরাসরি তাদের ইয়ারপিস বা হেডফোনে রিয়াল-টাইম অডিও অ্যালার্ট পেয়ে যাবেন।

তবে এ প্রযুক্তির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। প্রযুক্তিটি কেবল খেলোয়াড়ের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে অফসাইড ধরতে পারবে, কোনো সাবজেক্টিভ বা পরিস্থিতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।

পাশাপাশি একদম কাছাকাছি থাকা সূক্ষ্মতম বিভিন্ন কলও আলাদা করতে পারবে না। কোনো খেলোয়াড় মাঠের খেলায় বাধা বা হস্তক্ষেপ করছিলেন কি না তা এ প্রযুক্তি বিচার করতে পারবে না। খেলোয়াড়রা মাটিতে পড়ে থাকলে বা একাধিক শরীর খুব কাছাকাছি ঠাসাঠাসি অবস্থায় থাকলেও প্রযুক্তিটি অফসাইডের সিদ্ধান্ত দিতে ব্যর্থ হতে পারে।

এরপরও ফিফার দাবি, নতুন প্রযুক্তি দর্শক ও খেলোয়াড়দের বিরক্তি কমানোর পাশাপাশি অফসাইড থাকার পরও অপ্রয়োজনে খেলা চালিয়ে যাওয়ার কারণে খেলোয়াড়দের চোট বা ইনজুরির ঝুঁকিও অনেকখানি কমিয়ে আনছে।

৫. ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা পানি পানের বিরতি

খেলোয়াড়দের দেহের সুস্থতা ও কল্যাণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ফিফা এবার বিশ্বকাপের প্রতিটি অর্ধে তিন মিনিটের নির্ধারিত ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা পানি পানের বিরতি চালু করেছে।

এর জন্য আবহাওয়া বা তাপমাত্রার কোনো বাধ্যবাধকতা বা শর্ত থাকবে না। প্রতি অর্দ্ধের মাঝামাঝি সময়ে বা ২২তম মিনিটের কাছাকাছি এই বিরতি দেওয়া হচ্ছে।

২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ইউএসএ’র চিফ টুর্নামেন্ট অফিসার মানোলো জুবিবিয়া বলেছেন, “যে কোনো ম্যাচের জন্যই এটা প্রযোজ্য। খেলা যেখানেই হোক না কেন, স্টেডিয়ামে ছাদ থাকুক বা না থাকুক বা তাপমাত্রা যেমনই হোক উভয় অর্ধে তিন মিনিটের হাইড্রেশন ব্রেক থাকবে। রেফারির বাঁশি বাজার পর থেকে আবার খেলা শুরু হওয়া পর্যন্ত পুরো তিন মিনিট সময় দেওয়া হবে।

“অবশ্যই, যদি ২০ বা ২১তম মিনিটে মাঠে কোনো খেলোয়াড় চোট পান ও তার চিকিৎসা চলতে থাকে তবে রেফারি তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি বিবেচনা করে সেই অনুসোর বিরতির সময় সমন্বয় করবেন।”

তবে পানি পানের বিরতি বা হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে সমালোচনাও হচ্ছে খুব।

আরও পড়ুন…

খেলা থামিয়ে পানি পানের বিরতি কতটা জরুরি?

রেফারির দেরিতে পতাকা ওড়ানো বন্ধ করছে ফিফার নতুন প্রযুক্তি

এবারের বিশ্বকাপে প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করছে ব্রাজিল?

কেবল গোল জাদুতে নয়গুগল সার্চেও শীর্ষ রেকর্ড মেসির