Published : 25 Jun 2026, 03:52 PM
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে ম্যাচ থামিয়ে ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা খেলোয়াড়দের পানি পানের বিরতি দেওয়া নিয়ে দর্শকদের মধ্যে এখন তীব্র বিতর্ক চলছে। ফুটবলে এ নিয়ম নতুন না হলেও, এবারই প্রথম টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচে দুইবার করে এ বিরতি দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু কতটা জরুরি এই বিরতি?
তীব্র তাপপ্রবাহ ও জলবায়ু পরিবর্তনের এ যুগে দেহকে হাইড্রেটেড বা সতেজ রাখা জরুরি। এ সুযোগে কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স বাজারে ভিড় জমাচ্ছে ঘাম পরিমাপক আর্মব্যান্ড, স্মার্ট ওয়াটার বোতল বা টয়লেট সেন্সরের মতো অদ্ভুত সব আধুনিক গ্যাজেট।
অনেক দর্শকের দাবি, এসব বিরতির আসল উদ্দেশ্য খেলোয়াড়দের পানি পান করানো নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু সম্প্রচারকারী কোম্পানিকে বেশি করে বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ করে দেওয়া বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
এসব অভিযোগের সঙ্গে কেউ একমত হন বা না হন বিশ্বজুড়ে দেহকে হাইড্রেটেড রাখা বা পর্যাপ্ত পানি পানের বিষয়টি যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
গ্রিসের ‘ইউনিভার্সিটি অফ থেসালি’র গবেষক অ্যান্ড্রেয়াস ফ্লুরিস বলেছেন, “হাইড্রেশন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা নিশ্চিতভাবেই দেখছি, বিষয়টি দিন দিন আরও বেশি মনোযোগ কাড়ছে।”
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ তীব্রতর হচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্য সচেতনতামূলক প্রচারণায় মানুষকে বেশি করে তরল খাবার ও পানি পানের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এ প্রেক্ষাপটকে কাজে লাগিয়েই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স বাজারে দেহ হাইড্রেটেড রাখার বিভিন্ন আধুনিক গ্যাজেট বা প্রযুক্তির বন্যা বইছে, যেগুলোর মধ্যে ঘাম পরিমাপক থেকে শুরু করে কমোডের ভেতরের ইউরিন অ্যানালাইজারও রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এগুলো কি সত্যিই কার্যকর?
পর্যাপ্ত পানি পান না করা সাধারণ এক সমস্যা। ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি চারজনের মধ্যে একজন ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতায় ভুগছেন, যার প্রধান কারণ পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ না করা।
এ ছাড়া, ২০১৮ সালে ফ্লুরিস ও তার সহকর্মীদের করা আরেক গবেষণায় ইউরোপের ১৩৯ জন কর্মীর দেহে পানির মাত্রা পরীক্ষা করা হয়, সেখানে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ কর্মী এমন মাত্রায় পানিশূন্যতায় ভুগছিলেন, যা তাদের চিন্তাভাবনা ও শারীরিক অঙ্গভঙ্গি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
হাইড্রেড থাকার আধুনিক প্রযুক্তি বিক্রেতাদের দাবি, তাদের পণ্য পানিশূন্যতার সমস্যা সমাধানে সাহায্য করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি ‘এপিকোর বায়োসিস্টেমস’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী রুজবেহ গাফারি বলেছেন, বছরখানেক আগে অ্যাপল ওয়াচ ও ফিটবিটের মতো বিভিন্ন গ্যাজেট মানুষের হাঁটার পদক্ষেপ হিসাবকে বেশ জনপ্রিয় করে তুলেছে। তবে প্রযুক্তিকে সেখানেই থামিয়ে রাখা কেন?
তার ভাষ্য, “এখন ঘামের ব্যবচ্ছেদই প্রযুক্তির পরবর্তী অধ্যায়।”
ঘাম বিশ্লেষণকারী ডিভাইস তৈরি করে এমন কয়েকটি কোম্পানির মধ্যে তার কোম্পানি অন্যতম। ‘এপিকোর বায়োসিস্টেমস’-এর তৈরি পণ্যের তালিকায় রয়েছে একবার ব্যবহারযোগ্য স্টিকি প্যাচ ও হাতে পরার মতো গ্যাজেট । এগুলো ত্বক থেকে নিঃসৃত ঘামের প্রবাহের গতি, ঘামে সোডিয়ামের পরিমাণ ও ত্বকের তাপমাত্রাসহ আরও বেশ কিছু বিষয় পর্যবেক্ষণ করতে পারে।
এ ছাড়া, নতুন আর্মব্যান্ড ও অ্যাপের সমন্বয়ে তৈরি প্রযুক্তিও ‘রিয়াল-টাইম সোয়েট ডেটা’ বা তাৎক্ষণিক ঘামের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কারো দেহে পানির প্রয়োজনীয়তার মাত্রা মূল্যায়ন করার সুবিধা দিচ্ছে। যার মূল উদ্দেশ্য, অলক্ষ্যে দেহে যেন পানিশূন্যতা দানা বাঁধতে না পারে।
গাফারি বলেছেন, “আমাদের এ নতুন প্রজন্মের পরিধানযোগ্য গ্যাজেটগুলোর মাধ্যমে আমরা আপনার ঘামের স্কোরের ওপর ভিত্তি করে বুঝতে পারি যে আপনার পানিশূন্যতার ঝুঁকি ঠিক কোন পর্যায়ে রয়েছে।”
‘এপিকোর বায়োসিস্টেমস’-এর কিছু ডিভাইস যখন হিসাব করে দেখে যে কারো দেহে পানিশূন্যতা এড়াতে এবার একটু পানি বা তরল পান করা দরকার তখন সেগুলো আলতো করে কেঁপে ওঠে।
কোম্পানিটি বলেছে, তাদের এসব ডিভাইস কেবল অ্যাথলেট বা ক্রীড়াবিদরাই ব্যবহার করছেন না; বরং নির্মাণাধীন ভবন, তেল ও গ্যাস ক্ষেত্র এবং বিমানবন্দরের রানওয়েতে কর্মরত শ্রমিকরাও ব্যবহার করছেন। এসব জায়গায় তীব্র তাপমাত্রা ও কঠোর শারীরিক পরিশ্রম দৈনন্দিন কাজেরই অংশ।
তবে ঘাম পরিমাপক এই প্রযুক্তি নিয়ে কিছুটা সন্দিহান ফ্লুরিস। পরীক্ষাগারে তিনি নামহীন বিভিন্ন ঘাম বিশ্লেষণকারী ডিভাইস পরীক্ষা করে দেখেছেন।
সেই অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেছেন, “আমরা যেসব পণ্য পরীক্ষা করেছি সেগুলোর বেশিরভাগই আশানুরূপ নির্ভুল ফলাফল দেখাতে পারেনি।”
তার পরীক্ষামূলক গবেষণার এসব ফলাফল এখনও কোথাও প্রকাশ পায়নি।
বাজারের সম্ভবত সবচেয়ে সাধারণ হাইড্রেশন-ভিত্তিক পণ্য ‘স্মার্ট ওয়াটার বটল’, যা সারাদিন ধরে কাউকে পানি পানের কথা মনে করিয়ে দেয়।
স্মার্ট বোতল নির্মাতা কোম্পানি ‘ওয়াটার-এইচ’-এর বিজনেস ডেভেলপমেন্ট প্রধান জেম বাকিশ বলেছেন, “আমরা পুরো বিষয়টিকে বেশ মজাদার করার চেষ্টা করেছি। আমাদের বোতলে জ্বলজ্বলে রিং আছে, যা মালিককে পানি পানের কথা মনে করিয়ে দিতে সংকেত দেয়। এখানে আপনি বন্ধুদের যোগ করতে এবং পয়েন্টও পেতে পারবেন।”
কিছু স্মার্ট ওয়াটার বোতল ভেতরের তরলের ওজন ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পানি পানের ফলে সেই ওজনের পরিবর্তন পরিমাপ করে কাজ করে। তবে ‘ওয়াটার-এইচ’ একটু ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করেছে।
এদের বিভিন্ন সেন্সর বোতলটি কতখানি কোণ করে বাঁকানো হচ্ছে এবং পাত্র থেকে তরলটি ঠিক কী গতিতে বের হচ্ছে তা শনাক্ত করে। বাকিশ বলেছেন, “আপনি যখন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করে ফেলবেন বোতলটি তাৎক্ষণিকভাবে তা বুঝতে পারবে।”
এদিকে, ‘ভিভু’ নামের কোম্পানি এমন এক মূত্র বিশ্লেষক গ্যাজেট তৈরি করেছে, যা টয়লেট কমোডের কিনারায় বসানো থাকে। তাদের দাবি, গ্যাজেটটি ব্যবহারকারীকে তার দেহের হাইড্রেশনের মাত্রা ‘নজিরবিহীনভাবে’ বুঝতে সাহায্য করবে।
ডিভাইসটি অপটিক্যাল সেন্সর ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর ‘ইউরিন স্পেসিফিক গ্র্যাভিটি’ বা মূত্রের আপেক্ষিক গুরুত্ব পরিমাপ করে, যা পরিষ্কার পানির তুলনায় মূত্রের ঘনত্বের একটি মাপকাঠি। সাধারণত মূত্র যত বেশি ঘন হবে দেহে পানিশূন্যতার মাত্রা তত বেশি।
‘ভিভু’র ওয়েবসাইটের ছোট অক্ষরে এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, তাদের এসব পণ্য কোনো চিকিৎসা সংক্রান্ত রোগ নির্ণয়ের উদ্দেশ্যে তৈরি হয়নি।
‘ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটি’র তামারা হিউ-বাটলার বলেছেন, হাইড্রেশন পর্যবেক্ষণকারী এসব গ্যাজেট ‘বেশ আকর্ষণীয়’।
তবে এগুলো মানুষের মনে স্বাস্থ্য নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা তৈরি করতে পারে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যায়।