Published : 14 Jun 2026, 12:00 PM
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে জয় পায়নি ব্রাজিল। যদিও পুরুষ ফুটবল বিশ্বকাপে সবচেয়ে সফল দল এটিই। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে পাঁচবার।
আবার গত পাঁচটি আসরে দেশটি প্রত্যাশা পূরণও করতে পারেনি। এবার সেই ব্রাজিল বিশ্বকাপে প্রযুক্তির ওপর রাখছে বাড়তি নজর।
বিবিসিতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে উঠে এসেছে, ব্রাজিলের জাতীয় দলের ক্রীড়া বিজ্ঞানীরা কয়েক বছর ধরে খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণে ব্যবহার করছেন সেন্সরযুক্ত “স্মার্ট ভেস্ট”। এসব ভেস্টের মাধ্যমে স্প্রিন্টের গতি, হৃদস্পন্দন, ক্লান্তি, পুনরুদ্ধারের অগ্রগতি এবং চোট থেকে ফেরার অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
লক্ষ্য একটাই, জাতীয় দলের প্রধান কোচ কার্লো আনচেলত্তি ও তার সহকারীদের হাতে যত বেশি তথ্য তুলে দেওয়া যায়। এর ফলে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
২৩ জুন মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের প্রথম ম্যাচের আগে এই ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ দলটির প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
ট্র্যাকিং ভেস্ট
ব্রাজিলজুড়ে অধিকাংশ পেশাদার ফুটবলার অনুশীলন ও ম্যাচের সময় জার্সির নিচে বিশেষ সেন্সরযুক্ত ভেস্ট পরেন। দেখতে অনেকটা স্পোর্টস ব্রার মতো এই ভেস্ট খেলোয়াড়দের চলাফেরা, শারীরিক পরিশ্রম এবং পুনরুদ্ধার সম্পর্কিত নানা তথ্য সংগ্রহ করে।
গত এক দশকে খেলোয়াড় পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ দলই ইলেকট্রনিক পারফরম্যান্স ও ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ব্যবহার করছে। তবে ব্রাজিল বিষয়টিকে নিয়ে গেছে আরও এক ধাপ সামনে, আরও বিস্তৃতভাবে। দেশটির পুরুষ, নারী এবং যুব পর্যায়ের দলগুলোতেও একই ধরনের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
বিভিন্ন ক্লাব তাদের খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সংগ্রহ করা তথ্য জাতীয় দলের ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগে পাঠায়। ফলে জাতীয় দলের কোচিং স্টাফ পুরো মৌসুমজুড়ে খেলোয়াড়দের পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
ব্রাজিল জাতীয় দলের ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান গিলহার্মে পাসোস বলেন, “যখন খেলোয়াড়রা আমাদের সঙ্গে থাকে না, তখন প্রতিদিন আমরা ক্লাবগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং তারা ট্র্যাকিং সিস্টেম থেকে খেলোয়াড়দের তথ্য পাঠায়। ফলে সহজেই সেগুলো আমাদের ডেটাবেইজে যুক্ত করে বিশ্লেষণ করা যায়।”
আন্তর্জাতিক দলের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় সুবিধা। জাতীয় দলের কোচিং স্টাফ ক্লাব কোচদের মতো বছরের অধিকাংশ সময় খেলোয়াড়দের সঙ্গে কাটাতে পারেন না। অনেক ফুটবলার ভিন্ন ভিন্ন লিগে, এমনকি ভিন্ন মহাদেশে খেলেন। ফলে তাদের পারফরম্যান্স তুলনা করা এবং সেরা দল গঠন করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
পাসোস বলেন, “এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় খেলোয়াড়রা ঠিক কোথায় আছে, তা আমরা নির্ভুলভাবে জানি।”
আর বিশ্বকাপের মতো বড় ট্রর্নামেন্টের আগে এই জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
জাতীয় দলের জন্য খেলোয়াড় বাছাই
বিশ্বকাপের আগে খেলোয়াড় নির্বাচন, মাঠে অবস্থান নির্ধারণ এবং কৌশলগত দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রেও এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক সময় কেউ চোট নিয়ে আসেন, কেউবা পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষে দলে যোগ দেন। আবার কেউ ক্লাব পর্যায়ে অতিরিক্ত ম্যাচ খেলায় শারীরিকভাবে চাপে থাকেন।
বিশেষ করে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি থেকে ফেরার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। একজন খেলোয়াড় কতটা স্প্রিন্ট করছেন বা কত দ্রুতগতিতে দৌড়াচ্ছেন, তা পর্যবেক্ষণ করে ক্রীড়া বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন তার পেশি নিরাপদভাবে সেরে উঠেছে কি না।
পাসোস বলেন, “যদি কোনো খেলোয়াড় অসম্ভব ক্ষিপ্র আর দ্রুতগতির ধরনের হন, তাহলে এই সূচকটির দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া জরুরি। ধাপে ধাপে নিশ্চিত করতে হয় যে পেশি পুরোপুরি সুস্থ হয়েছে।”
এই তথ্য কৌশলগত সিদ্ধান্তেও প্রভাব ফেলে। খুব দ্রুতগতির কোনো খেলোয়াড় উইঙ্গার হিসেবে কার্যকর হতে পারেন। আবার পুনরুদ্ধার সম্পর্কিত তথ্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়, তাকে শুরু থেকেই নামানো হবে, নাকি পরে বদলি হিসেবে মাঠে নামানো হবে।
পাসোস বলেন, “দলে যদি খুব খুব দ্রুতগতির কোনো খেলোয়াড় থাকে, তাহলে কোচ হয়তো এমন কৌশলে তাকে ব্যবহার করার কথা ভাবতে পারেন, যেখানে কাউন্টার অ্যাটাক গুরুত্বপূর্ণ।”
বিশ্বকাপ চলাকালেও এই ভেস্ট ব্যবহার অব্যাহত থাকবে। কয়েক দিনের ব্যবধানে ম্যাচ হওয়ার কারণে ক্লান্তি ও পুনরুদ্ধারের তথ্য কোচিং স্টাফকে বুঝতে সাহায্য করবে কোন খেলোয়াড় মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত এবং কার বাড়তি বিশ্রাম প্রয়োজন।
নতুন প্রযুক্তির পরীক্ষা
স্পোর্টস প্রযুক্তি নির্মাতা কোম্পানি ক্যাটাপাল্টের তৈরি একটি ট্র্যাকিং ভেস্ট ব্যবহার করে পরীক্ষামূলক অনুশীলনেও দেখা গেছে, এটি হৃদস্পন্দন থেকে শুরু করে অবস্থানগত তথ্য পর্যন্ত সংগ্রহ করতে পারে। ভেস্টটির ভেতরে রয়েছে হৃদস্পন্দন পরিমাপক ইলেকট্রোড এবং অবস্থান নির্ণয়ের জন্য জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস।
যুক্তরাষ্ট্রের নারী ফুটবল দল বস্টন লিগ্যাসি এফসির স্বাস্থ্য ও পারফরম্যান্স পরিচালক ড্যান জোনস বলেন, এই প্রযুক্তি একদিকে যেমন খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ সামর্থ্য বের করে আনতে সহায়তা করে, অন্যদিকে তাদের চোট থেকেও রক্ষা করে।
তিনি বলেন, “অনুশীলনের মধ্যে এমন সময় আসে, যখন আমরা দেখি পরিকল্পনা অনুযায়ী যথেষ্ট কাজ বা ফিটনেস অর্জন হচ্ছে না।”
সাম্প্রতিক এক ম্যাচে ইনজুরি থেকে ফেরা এক খেলোয়াড়কে পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জোনস বলেন, তার জন্য নিরাপদ দৌড় ও উচ্চগতির কার্যক্রমের একটি সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ম্যাচ চলাকালে সেটি তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল।
তিনি বলেন, “যখন তিনি সেই সীমায় পৌঁছে গেলেন, তখন আমরা কোচদের সঙ্গে কথা বললাম এবং বললাম যে শিগগিরই বদলির কথা ভাবা উচিত। এরপর আমরা তাকে মাঠ থেকে তুলে নিই।”
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কোচের হাতেই
তবে প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও যে সিদ্ধান্ত যে শুধু ডেটা দেখেই নেওয়া হয়, তা নয়।
পাসোস এমন এক খেলোয়াড়ের উদাহরণ দেন, যিনি ম্যাচের পুরো সময়ে যতটা দৌড়াতেন সেটি প্রায় ছয় কিলোমিটার। যেখানে তার দলেরই অনেক খেলোয়াড় গোটা ম্যাচে প্রায় দ্বিগুণ দৌড়েছেন। সংখ্যার হিসাবে খেলোয়াড়টিকে দুর্বল মনে হলেও ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র।
পাসোস বলেন, “এই নির্দিষ্ট খেলোয়াড়ের সেন্স এতো ভালো যে তিনি সব সময় সঠিক জায়গায় এবং নিখুঁত কৌশলগত অবস্থানে থাকতেন। তিনি অসম্ভব দক্ষ একজন খেলোয়াড়।”
বিশ্বকাপের আগে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত তথ্য গোপন রাখতে তিনি এ খেলোয়াড়ের নাম প্রকাশ করেননি।
এই অভিজ্ঞতা থেকে ক্রীড়া বিজ্ঞানীরা একটি বিষয় বারবার গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফুটবল অ্যাথলেটিক্স নয়, বেশি শক্তি, বেশি দৌড়াতে পরা মানেই ভালো খেলোয়াড় নয়। কোনো খেলোয়াড়ের শারীরিক সূচক অসাধারণ হলেও নির্দিষ্ট কৌশলের সঙ্গে তিনি মানানসই নাও হতে পারেন। আবার অবস্থান নির্বাচন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা নেতৃত্বের গুণই কোনো ফুটবলারের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে।
মানসিক দিকও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পাসোস বলেন, “কখনও কখনও কোনো খেলোয়াড়ের শারীরিক ডেটা খুব ভালো হতে পারে। কিন্তু কোচ তাকে নির্বাচন করেন না, কারণ প্রযুক্তিগত ও মানসিকভাবে তিনি মনে করেন না যে, ওই খেলোয়াড়ের খেলার ধরন কাজে আসবে।”
আগ্রহীরা গুগল সার্চ করে দেখে নিতে পারেন ২০০২ সালের বিশ্বকাপে ব্রাজিল কোচ স্কোলারি কেন সে সময়ের তারকা খেলোয়াড় রোমারিওকে দল থেকে বাদ দিয়েছিলেন।
সে যা হোক, ২০২৬ সালে এসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ প্রযুক্তি আরও উন্নত হওয়ায় কোচদের হাতে তথ্যের পরিমাণ বাড়ছে। এবারের বিশ্বকাপে ফিফা ও লেনোভোর তৈরি “ফুটবল এআই প্রো” নামের একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সহকারীও ব্যবহার করা হচ্ছে। মেশিন লার্নিং এবং প্রাকৃতিক ভাষা প্রক্রিয়াকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি কোটি কোটি ডেটা বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দিতে পারে।
তবে প্রযুক্তিগত বিপ্লবের মধ্যেও ব্রাজিলের কর্মকর্তারা মনে করেন, শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মানবিক বিচারবোধই।
পাসোস বলেন, “প্রধান পার্থক্য গড়ে দেয় প্রযুক্তির পেছনে থাকা বিশেষজ্ঞরা, যারা ডেটা বিশ্লেষণ করে বাস্তব সিদ্ধান্তে রূপান্তর করেন।”
বিশ্বের সবচেয়ে সফল ফুটবল জাতির জন্য পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি হয়তো সেরা একাদশ বাছাইয়ে সহায়তা করবে। তবে বিশ্বকাপের গৌরব শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে মাঠে খেলোয়াড়রা কেমন পারফর্ম করেন, তার ওপরই।