Published : 12 Mar 2026, 10:43 AM
মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় শুরু হয়েছে এক অদৃশ্য যুদ্ধ। জিপিএস জ্যামিং বা সিগনাল বিভ্রাটের কারণে শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ পথ হারিয়ে ভুল অবস্থানে চলে যাচ্ছে। সামরিক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ব্যবহৃত এ ‘ইলেকট্রনিক যুদ্ধ’ এখন বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা সমুদ্রপথের নিরাপত্তাকে ঠেলে দিচ্ছে চরম অনিশ্চয়তায়।
বিবিসি লিখেছে, সমুদ্রে এখন শত শত জাহাজ দেখা গেলেও সেগুলোর অবস্থান মোটেও সঠিক নয়।
ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার সংলগ্ন সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর লাইভ পজিশন বা অবস্থান পরীক্ষা করছেন মেরিটাইম এআই কোম্পানি ‘উইন্ডওয়ার্ড’-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মিশেল উইজ বকম্যান।
সেখানকার অবস্থা দেখে অবাক হয়ে তিনি বলেছেন, “হায় খোদা! আমি এখন পর্যন্ত ৩৫টি আলাদা আলাদা ক্লাস্টার বা জটলা দেখছি।”
হরমুজ প্রণালী ও এর আশপাশের এলাকার ম্যাপের দিকে তাকিয়ে সেখানে আইকনগুলোর অদ্ভুত সব বৃত্তাকার জটলা দেখছিলেন বকম্যান। ম্যাপের ওপর স্তরে স্তরে থাকা এই প্রতিটি আইকন আসলে একটি করে সত্যিকারের জাহাজকে বোঝাচ্ছিল।
তবে জাহাজগুলোর তো এভাবে একদম নিখুঁত গোল হয়ে জটলা পাকিয়ে থাকার কথা নয়। ম্যাপে দেখা যাচ্ছে, কিছু জাহাজের অবস্থান স্থলের ওপর, যা বাস্তবে অসম্ভব। আসলে তাদের জিপিএস সিগনালে গোলযোগ তৈরি হয়েছে, যাতে তাদের আসল অবস্থান লুকিয়ে রাখা যায়।
যুদ্ধ এখন আর কেবল গুলি, বোমা আর মিসাইলের মধ্যে আটকে নেই। এখন ইলেকট্রনিক তরঙ্গ দিয়েও লড়াই চলছে। খালি চোখে দেখা না গেলেও এই জিপিএস জ্যামিং বা সিগনাল আটকে দেওয়ার ফলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে এবং এর ফলে ভয়াবহ দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিপিএস জ্যামিং ইউরোপের প্লেন চলাচলেও প্রভাব ফেলেছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টের ব্যবহৃত একটি প্লেনেও এমন সমস্যা হয়েছিল। ইউক্রেইন যুদ্ধে এখন নিত্যদিনের ঘটনা জিপিএস জ্যামিং। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ‘ইলেকট্রনিক যুদ্ধ’ আরও বড় এলাকা জুড়ে জেঁকে বসছে।
হরমুজ প্রণালী ও এর আশপাশে জাহাজগুলোর ওপর যে জ্যামিং বা সিগনাল বিভ্রাট ঘটছে তা মিশেল উইজ বকম্যানের কাছে নতুন কিছু নয়। এর আগেও তিনি জাহাজের ‘অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম’ বা এআইএস বা স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় এমন জিপিএস জ্যামিং লক্ষ্য করেছেন।
গেল বছর ইসরাইল ও ইরানের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও এই অঞ্চলে একই ঘটনা ঘটেছিল। বাল্টিক সাগরেও জাহাজ চালকরা এ ধরনের ইলেকট্রনিক বাধার মুখে পড়েছেন।
তবে বকম্যানের মতে, “এবারের বিষয়টি একেবারেই অন্য পর্যায়ের। সমুদ্রপথে চলাচল ও নিরাপত্তার জন্য এটা যে কত বড় বিপদ তা বলে শেষ করা যাবে না।”
পাকিস্তানের ‘ন্যাশনাল হাইডোগ্রাফিক অফিস’ও এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে এ ধরনের সিগনাল বিভ্রাট নিয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে।
জাহাজগুলো মূলত একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়াতে এআইএস সিস্টেম ব্যবহার করে। প্রায় ৩০০ মিটার লম্বা এক বিশাল তেলের ট্যাংকার লাখ লাখ টন তেল বহন করে, যেটিকে ঘোরানো বা থামানো অনেক সময়ের ব্যাপার। দিক পরিবর্তনের আগে জাহাজকে কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে হয়।
আশপাশে থাকা অন্য জাহাজগুলোর সঠিক অবস্থান যদি জানা না থাকে তবে বিশেষ করে রাতে বা কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ায় বড় ধরনের সংঘর্ষের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
এ সমস্যার মূল কারণ ব্যাখ্যা করে ‘ইউনিভার্সিটি অফ সারে’-এর অ্যালান উডওয়ার্ড বলেছেন, “আসল সমস্যা আপনি কোথায় যাচ্ছেন তা জানেন না এমনটি নয়, আসল সমস্যা হচ্ছে অন্যরা আসলে কোন দিকে যাচ্ছে বা কোথায় আছে তা আপনি বুঝতে পারছেন না।”
জিপিএস জ্যামিংয়ের পেছনে আসলে কারা আছে সে বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মেলেনি। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের জোরালো ধারণা, ইরানই এসব জাহাজের চলাচলে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এরইমধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হতে চাওয়া যে কোনো জাহাজে হামলার ভয় আছে, এমনটা বলে রেখেছে ইরান।
‘রয়াল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট’-এর টমাস উইথিংটন বলেছেন, ইরান সম্ভবত নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি বা রাশিয়া ও চীন থেকে আনা সরঞ্জাম ব্যবহার করে এই জিপিএস জ্যামিং সিস্টেম পরিচালনা করছে।
তিনি আরও বলেছেন, ওই অঞ্চলে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীও ড্রোন এবং জিপিএসনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রের হাত থেকে তাদের ঘাঁটি ও কর্মীদের রক্ষা করতে নিজস্ব জ্যামিং সিস্টেম ব্যবহার করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মার্কিন যুদ্ধ বিভাগ বলেছে, “নিরাপত্তার খাতিরে ওই অঞ্চলে আমাদের বিশেষ সক্ষমতা বা কৌশলের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করব না।”
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘জেফার ডটএক্সওয়াইজেড’ ইউক্রেইনসহ বিভিন্ন দেশে জিপিএস জ্যামিংয়ের মাত্রা বিশ্লেষণ করেছে। সাধারণত প্লেনের পাঠানো তথ্য থেকে জিপিএস জ্যামিং শনাক্ত করা যায়। তবে ইরানের আকাশপথ এখন বন্ধ থাকায় কোম্পানিটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা শন গোরম্যানকে বিকল্প পথ খুঁজতে হয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের জ্যামিং শনাক্ত করতে স্যাটেলাইটের রেডার ডেটা ব্যবহার করেছেন গোরম্যান।
এই তথ্য বিবিসি স্বতন্ত্রভাবে যাচাই না করলেও গোরম্যান বলেছেন, জ্যামিং ডিভাইসগুলো রেডার সিগনালে এক ধরনের বিশেষ চিহ্ন বা বিঘ্ন রেখে যায়। এর মাধ্যমেই তিনি পুরো ইরানে কোথায় কোথায় জিপিএস জ্যামিং ঘটছে তা শনাক্ত করতে পারছেন।
২০২৪ সালে তিনি ও তার সহকর্মীরা ইউক্রেইনে জিপিএস জ্যামিং নিয়ে গবেষণা করতে ড্রোনের সঙ্গে স্মার্টফোন বেঁধে দিয়েছিলেন। এসব ড্রোন যখন আকাশে উড়ত তখন বিভিন্ন স্মার্টফোন জিপিএস তথ্য রেকর্ড করত। এতে করে সিগনালে কোনো বাধা থাকলে তা ম্যাপে ধরা পড়ত।
গোরম্যান বলেছেন, “আমরা ফোনের সেসব পরিমাপ বিশ্লেষণ করতাম এবং এর মাধ্যমে জ্যামারটি ঠিক কোথায় অবস্থিত তা নিখুঁতভাবে বের করা সম্ভব হত। আমি জিপিএস জ্যামিংয়ের মাত্রা এবং কতটা শক্তিশালী হতে পারে তা দেখে রীতিমতো অবাক হয়েছি।”
তবে এই জিপিএস জ্যামিং থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য বিভিন্ন প্রযুক্তিও এখন বাজারে আসছে। এ সমস্যা সমাধানের একটি উপায় হচ্ছে, জ্যামিং বা সিগনাল বিভ্রাট স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা এবং সঙ্গে সঙ্গে অন্য কোনো নিরবচ্ছিন্ন ফ্রিকোয়েন্সিতে চলে যাওয়া।

‘ল্যান্ডশিল্ড’ নামে একটি ডিভাইস তৈরি করেছে প্রতিরক্ষা খাতের বিশাল কোম্পানি ‘রেথিয়ন ইউকে’, যা আকারে একটি আইস হকি পাকের মতো ছোট।
কোম্পানিটি বলেছে, এ ‘অ্যান্টি জ্যাম অ্যান্টেন সিস্টেম’ গাড়ি থেকে শুরু করে প্লেন’ সব ধরনের যানবাহনেই বসানো সম্ভব, যা জ্যামিং কাটিয়ে উঠতে একাধিক চ্যানেল ব্যবহার করে।
‘রেথিয়ন ইউকে’-এর ইঞ্জিনিয়ারিং ডিরেক্টর অ্যালেক্স রোজ পারফিট বলেছেন, “বর্তমানে আমাদের এ অ্যান্টি জ্যামিং বিভিন্ন পণ্যের চাহিদা ও উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেড়েছে।”
জিপিএস-এর এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে অন্যান্য কোম্পানি এখন নতুন ধরনের ন্যাভিগেশন টুল বা দিকনির্ণয় ব্যবস্থা তৈরি করছে।
অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাডভান্সড ন্যাভিগেশন’ এমন এক সিস্টেম উদ্ভাবন করেছে, যা ‘জাইরোস্কোপ’ ও ‘অ্যাক্সিলারোমিটার’-এর রিডিং ব্যবহার করে কোনো যানের অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে। স্মার্টফোনটি কাত করলে সেটি যেভাবে বুঝতে পারে ফোনটি ঘুরানো হয়েছে ঠিক একই প্রযুক্তি এখানে কাজ করে।
কোম্পানিটির সহ প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ক্রিস শ বলেছেন, জিপিএস যখন কাজ করে না তখন তাদের প্রযুক্তি বিকল্প পথ খুঁজে নেয়। যার মধ্যে রয়েছে কোনো এলাকার বর্তমান ছবির সঙ্গে আগে থেকে থাকা স্যাটেলাইট ছবির মিল খুঁজে বের করা বা কম্পিউটারের মাধ্যমে মাথার ওপরের তারার অবস্থান বিশ্লেষণ করা।
শ বলেছেন, “এ ছবি বিশ্লেষণের প্রক্রিয়াটি অনেক উন্নত। তারার অবস্থান দেখে দিকনির্ণয় করা বেশ সাশ্রয়ী এক উপায়। তবে বিষয়টি খুব একটা নিখুঁত নয়।” এ কারণেই সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করতে একাধিক পদ্ধতির সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে।
উন্নত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া বর্তমান জিপিএস ব্যবস্থা বরাবরের মতোই অরক্ষিত থেকে যাবে। সবচেয়ে বড় সমস্যা জিপিএস সিগনালগুলো অত্যন্ত দুর্বল, যার ফলে খুব সহজেই সেগুলোকে ‘জ্যাম’ বা আটকে দেওয়া সম্ভব।
তবে সামরিক বাহিনীগুলো ‘এম কোড’ জিপিএস ব্যবহারের সুযোগ পায়। ‘এম কোড’ জিপিএসের এমন এক এনক্রিপ্টেড বা সংকেতিক রূপ, যা জ্যামিং প্রতিরোধে বেশ কার্যকর।
‘রয়াল ইনস্টিটিউট ফর ন্যাভিগেশন’-এর পরিচালক র্যামসে ফ্যারাঘ বলেছেন, ইরানের উপকূলীয় জলসীমায় এই জিপিএস জ্যামিং সমুদ্রপথে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। জ্যামিংয়ের ক্রমাগত উপদ্রব মানুষকে আরও সুরক্ষিত বিকল্পের দিকে নিয়ে যাবে। ঠিক যেভাবে এক সময় মানুষ পুরোপুরি উন্মুক্ত ওয়াইফাই ব্যবহার করত। তবে এখন পাসওয়ার্ড সুরক্ষিত নেটওয়ার্ক ছাড়া নিরাপত্তা কল্পনাই করা যায় না।
“খুব শিগগিরই আমরা এই সময়ের দিকে ফিরে তাকাব, যখন আমরা উন্মুক্ত জিপিএস সিগনাল ব্যবহার করতাম, আর ভাবব, ‘হায় ঈশ্বর! আমরা কী পাগল ছিলাম! ওটা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ ছিল না’।”