Published : 21 Apr 2026, 03:23 PM
পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থিত মানুষের তৈরি মহাকাশযান ভয়েজার ১ বর্তমানে এক ভয়াবহ বিদ্যুৎ সংকটের মুখে পড়েছে।
দীর্ঘ ৪৯ বছর মহাকাশে পথ চলার পর এর জ্বালানি শক্তি আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। মানব সভ্যতার প্রথম এ আন্তঃনাক্ষত্রিক অভিযাত্রীকে সচল রাখতে এবং এর আয়ু কিছুটা বাড়াতে এখন মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন মহাকাশ বিজ্ঞানীরা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, ১৯৭৭ সালে উৎক্ষেপণ করা ভয়েজার ১ এর শক্তির স্তর হঠাৎ কমে যাওয়ায় সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে মিশন অপারেটররা এর একটি যন্ত্র বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
মার্কিন মহাকাশ সংস্থাটি বলেছে, তারা এখন মহাকাশযানটির আয়ু বাড়াতে এবং আবারও পুরোপুরি সচল করতে ‘সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা’ নিয়ে কাজ করছে।
বর্তমানে মানুষের তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে দূরবর্তী বস্তু এখন ভয়েজার ১, যা ২০১২ সালে ইতিহাসের প্রথম মহাকাশযান হিসেবে পৃথিবীর সৌরজগত পেরিয়েছে।
‘রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর’-এর মাধ্যমে চালিত ভয়েজার ১ প্লুটোনিয়ামের ক্ষয় থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে। আর এমন শক্তি ব্যবস্থার কারণে মহাকাশযানটি প্রতি বছর চার ওয়াট করে বিদ্যুৎ শক্তি হারাচ্ছে।
২৭ ফেব্রুয়ারি এক পূর্বপরিকল্পিত কৌশল চলাকালীন প্রথমবার ভয়েজার ১ এর বিদ্যুৎ ঘাটতির সমস্যাটি অপ্রত্যাশিতভাবে ধরা পড়ে।
প্রকৌশলীরা সতর্ক করে বলেছিলেন, শক্তির স্তর সামান্যও কমে গেলে মহাকাশযানটির ‘সুরক্ষা ব্যবস্থা’ সক্রিয় হয়ে উঠবে, যা এর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ বা যন্ত্রাংশগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করে দেবে।
পৃথিবী থেকে বর্তমানে ২ হাজার ৫০০ কোটি কিলোমিটারেরও বেশি দূরে থাকা ভয়েজার ১ এর ক্ষতি এড়াতে এর একটি যন্ত্র বন্ধ করে দিয়েছে নাসা। স্থায়ী সমাধান খোঁজার আগ পর্যন্ত যেন আর কোনো সমস্যা না হয় সেজন্যই এ পদক্ষেপ নিয়েছে সংস্থাটি।
ভয়েজার মিশনের ম্যানেজার কারিম বদরুদ্দিন বলেছেন, “এর একটি যন্ত্র বন্ধ করে দেওয়া আমাদের কারোরই কাম্য নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটিই আমাদের কাছে থাকা সেরা উপায়।
“ভয়েজার ১ এর এখনও দুটি বৈজ্ঞানিক যন্ত্র সচল রয়েছে। যার একটি প্লাজমা তরঙ্গ শোনে এবং অন্যটি চৌম্বক ক্ষেত্র পরিমাপ করে। এগুলো এখনও কাজ করছে এবং মহাকাশের এমন এক অঞ্চল থেকে তথ্য পাঠাচ্ছে, যা মানুষের তৈরি অন্য কোনো মহাকাশযান এর আগে কখনও দেখেনি।”
‘লো-এনার্জি চার্জড পার্টিকেলস’ বা এলইসিপি নামের এ যন্ত্রটি গত ৪৯ বছর ধরে প্রায় বিরতিহীনভাবে কাজ করে আসছে।
আমাদের মিল্কিওয়ে ছায়াপথ থেকে আসা মহাজাগতিক রশ্মির মতো নিম্ন-শক্তির চার্জিত বিভিন্ন কণা পরিমাপ করেছে ভয়েজার ১।
নাসা বলেছে, “পারমাণবিক শক্তিচালিত এ মহাকাশযানটিতে বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মানুষের প্রথম আন্তঃনাক্ষত্রিক অনুসন্ধানকারী যানটিকে সচল রাখার জন্য এলইসিপি বন্ধ করে দেওয়াকেই বর্তমানে সেরা উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
“এ যন্ত্রটি আন্তঃনাক্ষত্রিক মাধ্যমের গঠন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে। ভয়েজার ১ আমাদের ‘হেলিওস্ফিয়ার’ বা সৌরজগতের সীমানার বাইরের মহাকাশে চাপের পরিবর্তন ও বিভিন্ন ঘনত্বের কণাওয়ালা অঞ্চলগুলো শনাক্ত করেছে।
“পৃথিবী থেকে একমাত্র ভয়েজার যমজ মহাকাশযান দুটিই এত দূরে অবস্থান করছে, যেখান থেকে এই ধরনের তথ্য পাওয়া সম্ভব।”
১৯৭৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ভয়েজার ১ এর কয়েক সপ্তাহ পর উৎক্ষেপিত হয় মহাকাশযানটির সহযাত্রী ভয়েজার ২।
দুটি মহাকাশযানই সৌরজগতের সীমা পেরিয়ে এখন মহাশূন্যের অজানা প্রান্তে পাড়ি জমিয়েছে।
প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে চলা এ মহাকাশ মিশন পৃথিবীতে পাঠিয়েছে অমূল্য বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভাণ্ডার, যা আমাদেরকে দিয়েছে সৌরজগতের বাইরের গ্রহ, মহাশূন্যের রহস্য ও সূর্যের প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর ধারণা।
আরও পড়ুন…