Published : 05 Mar 2026, 04:38 PM
জটিল পর্যায়ের প্রস্টেট ক্যান্সার নিরাময়ে এবার বড় এক আশার আলো দেখলেন বিজ্ঞানীরা। নতুন একটি ওষুধ প্রাথমিক ট্রায়ালে আশাব্যঞ্জক ফলাফল দেখিয়েছে বলে দাবি তাদের।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু রোগীর ক্ষেত্রে নতুন ওষুধটি টিউমার ছোট করতে পেরেছে।
ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান লিখেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশেই পুরুষদের মধ্যে প্রস্টেট ক্যান্সার খুবই পরিচিত বিষয়। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫ লাখ পুরুষ এ রোগে আক্রান্ত হন।
নতুন ওষুধটি আশা জাগিয়েছে, কারণ তা এক ধরনের ‘ইমিউনোথেরাপি’। এ পদ্ধতিতে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেহের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ব্যবহার করা হয়।
অন্যান্য কিছু ক্যান্সারের চিকিৎসায় এরইমধ্যে বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে এ ওষুধ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর আগে প্রস্টেট ক্যান্সারের উপর এর প্রভাব দেখা যায়নি।
এখন বিজ্ঞানীরা ‘ভিআইআর-৫৫০০’ নামের এক ইমিউনোথেরাপি ওষুধের প্রাথমিক পর্যায়ের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছেন, যা ইঙ্গিত দিচ্ছে, প্রস্টেট ক্যান্সারের শেষ ধাপে থাকা পুরুষদের জন্যও আশার আলো হতে পারে এ ইমিউনোথেরাপি।
এ গবেষণার নেতৃত্বে থাকা ‘ইন্সটিটিউট অফ ক্যান্সার রিসার্চ’ ও ‘রয়াল মার্সডেন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট’-এর অধ্যাপক জোহান ডি বোনো বলেছেন, “আমাদের ধারণা, এ ধরনের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদে নিরাময়ের পথ দেখাতে পারে।”
অধ্যাপক ডি বোনো বলেছেন, ‘ভিআইআর-৫৫০০’ কৃত্রিমভাবে তৈরি এক ধরনের অ্যান্টিবডি, যা দেহের রোগ প্রতিরোধকারী ‘কিলার টি সেল’ ও বিভিন্ন ক্যান্সার কোষকে একে অপরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। এ ধরনের ওষুধকে বলে ‘টি সেল এনগেজার’, যা ‘কিলার সেল’কে ক্যান্সার কোষ ধ্বংসের সুযোগ দেয়।
‘ভিআইআর-৫৫০০’-এর বিশেষত্ব হচ্ছে এটি এমনভাবে তৈরি হয়েছে, যা কেবল টিউমারের ভেতরেই সক্রিয় হয়। একদিকে যেমন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমিয়ে দেয়, যা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রস্টেট ক্যান্সারের অন্যান্য ‘টি সেল এনগেজার’ ওষুধ রোগীদের শরীরে মারাত্মক প্রদাহ তৈরি করে তেমনই তা রক্তে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করতে পারে। ফলে ওষুধের ডোজ বা মাত্রা কম লাগে।
‘ভির বায়োটেকনোলজি’র অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রথম পর্যায়ের ক্লিনিকাল ট্রায়ালে প্রস্টেট ক্যান্সারের শেষ ধাপে থাকা ৫৮ জন পুরুষকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল, যাদের দেহে অন্য কোনো চিকিৎসা আর কাজ করছিল না।
গবেষকরা বলছেন, ৮৮ শতাংশ রোগী খুবই সামান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েছেন।
এরপর পুরুষদের রক্তে ‘প্রস্টেট নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেন’-এর মাত্রা পরীক্ষা করেন গবেষকরা। এটি এমন এক বায়োমার্কার, যার উচ্চ মাত্রা প্রস্টেটের সমস্যার লক্ষণ হতে পারে।
অধ্যাপক ডি বোনো বলেছেন, ট্রায়ালটি খুব কম ডোজ দিয়ে শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে ওষুধের মাত্রা বাড়ানো হয়েছে। গবেষক দলটি সর্বোচ্চ ডোজ দেওয়া ১৭ জন পুরুষের তথ্য বিশ্লেষণের সময় দেখেছেন, ১৪ জনের বা ৮২ শতাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসার পর ‘পিএসএ’-এর মাত্রা অন্তত অর্ধেক কমেছে। ৯ জন বা ৫৩ শতাংশ ক্ষেত্রে এই মাত্রা কমেছে ৯০ শতাংশ এবং ৫ জন বা ২৯ শতাংশ ক্ষেত্রে ‘পিএসএ’-এর মাত্রা ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
গবেষণার ফলাফলকে ‘বিস্ময়কর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন অধ্যাপক ডি বোনো। কারণ এ রোগটিকে আগে ‘ইমিউন কোল্ড’ মনে করা হত, যার মানে হচ্ছে ইমিউনোথেরাপি প্রতিরোধী চিকিৎসায় সাড়া দেয় না।
গবেষক দলটি আরও বলেছে, সর্বোচ্চ ডোজ নেওয়া ১১ জন রোগীর মধ্যে যাদের টিউমার পরিমাপ করা গেছে তাদের মধ্যে পাঁচজনের টিউমার ছোট হয়ে এসেছে, বিশেষ করে ৬৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তির ক্ষেত্রে, যার ক্যান্সারে লিভারে ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানে দেখা গেছে কেবল ছয় ধাপের চিকিৎসার পর লিভারের ১৪টি ক্যান্সার আক্রান্ত ক্ষত সম্পূর্ণ সেরেছে।
গবেষণার এসব ফলাফল এখনও অন্য বিজ্ঞানীদের মাধ্যমে যাচাই হয়নি। তবে এগুলো স্যান ফ্রান্সিসকোতে অনুষ্ঠিত ‘আমেরিকান সোসাইটি অফ ক্লিনিক্যাল অনকোলজি জেনিটোরিনারি ক্যান্সারস সিম্পোজিয়াম’-এ উপস্থাপিত হয়েছে।
ডি বোনো বলেছেন, এখন পরবর্তী ধাপের ক্লিনিকাল ট্রায়ালের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
“আমাদের আরও তথ্যের প্রয়োজন, তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া এসব ফলাফল সত্যিই চমৎকার।”
‘ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন’-এর ক্যান্সার বায়োলজির অধ্যাপক শার্লট বেভান বলেছেন, প্রস্টেট ক্যান্সারের চিকিৎসায় ইমিউনোথেরাপির এ অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক ও তা ওষুধের এক নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে।
তবে তিনি বলেছেন, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর রোগীদের ওপর এ গবেষণা চালানো জরুরি, কারণ প্রস্টেট ক্যান্সারের ফলাফলে জাতিভেদে পার্থক্য দেখা যায়।
এ গবেষণার সঙ্গে যোগ ছিলেন না বেভান।