Published : 11 May 2026, 05:16 PM
বিশ্বেজুড়ে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ ও বিদ্যুচ্চালিত যানবাহনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। এসব ব্যাটারি রিসাইকেল বা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তবে সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা নতুন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যা রিসাইক্লিং প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব করে তুলবে বলে দাবি তাদের।
‘রাইস ইউনিভার্সিটি’র গবেষকদের একটি দল পানিতে তৈরি এমন এক দ্রবণ তৈরি করেছে, যা কেবল কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরানো ব্যাটারি থেকে মূল্যবান বিভিন্ন ধাতু উদ্ধার করতে পারে।
তাদের এ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘স্মল’-এ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সাইট নোরিজ প্রতিবদেন লিখেছে, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল ও ম্যাঙ্গানিজের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান থাকে। এসব ধাতুর সরবরাহ সীমিত, অথচ নতুন ব্যাটারি তৈরির জন্য এগুলো বেশ প্রয়োজনীয়।
বর্তমানে ব্যাটারি পুনরায় ব্যবহারের জন্য যেসব পদ্ধতি রয়েছে সেগুলো দিয়ে সাধারণত খুব সামান্য পরিমাণ উপাদানই উদ্ধার করা যায়। প্রচলিত অনেক পদ্ধতিতে শক্তিশালী অ্যাসিড ব্যবহৃত হয় বা অনেক উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন। এসব প্রক্রিয়া একদিকে যেমন ব্যয়বহুল তেমনই এতে অনেক শক্তির প্রয়োজন এবং তা পরিবেশের জন্যও ক্ষতিকর।
বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত এ নতুন পদ্ধতিটি সহজ বিকল্প হিসেবে সামনে এসেছে। এখানে কড়া রাসায়নিক ব্যবহারের পরিবর্তে গবেষকরা পানির সঙ্গে ‘অ্যামাইনো ক্লোরাইড’ নামের বিশেষ যৌগের মিশ্রণে একটি দ্রবণ তৈরি করেছেন।
এসব যৌগ ব্যাটারির বর্জ্য থেকে বিভিন্ন ধাতুকে দ্রুত ও কার্যকরভাবে গলিয়ে আলাদা করতে সাহায্য করে। গবেষক দলটি তাদের পরীক্ষায় একটি দ্রবণ ব্যবহার করেছেন, যাতে রয়েছে ‘হাইড্রক্সিলঅ্যামোনিয়াম ক্লোরাইড’।
গবেষকরা বলছেন, এ পদ্ধতিতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ ধাতু বের করে আনা সম্ভব। ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় কবল এক মিনিটের মধ্যেই প্রায় ৬৫ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ ধাতু উদ্ধার করা গেছে। সময় কিছুটা বাড়িয়ে দিলে কিছু ধাতুর ক্ষেত্রে এ উদ্ধারের হার ৭৫ শতাংশেরও বেশি হতে পারে।
এ পদ্ধতিটি এত ভালোভাবে কাজ করার কারণ হচ্ছে পানি। অন্যান্য প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত ঘন বা আঠালো তরলের তুলনায় পানির মধ্যে অণুগুলো বেশি মুক্তভাবে চলাচল করতে পারে। অণুগুলোর এ দ্রুত চলাচল ধাতুকে আলাদা করার জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক বিক্রিয়াকে বাড়িয়ে দেয়। একইসঙ্গে পানি ব্যবহারের ফলে বিষাক্ত দ্রাবকের প্রয়োজনীয়তা কমে যায় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সহজ ও নিরাপদ হয়।
গবেষকরা বলেছেন, এ দ্রবণের বিশেষ এক রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ যৌগে এমন নাইট্রোজেন কেন্দ্র থাকে, যা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নিতে পারে। এমনটি ব্যাটারির বিভিন্ন উপাদানকে আরও কার্যকরভাবে ভাঙতে ও ধাতু উদ্ধারের প্রক্রিয়াকে দ্রুত করতে সাহায্য করে।
এ পুরো প্রক্রিয়াটি খুব সাধারণ অবস্থাতেই সম্পন্ন করা যায়। এজন্য উচ্চ তাপ বা দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় না, যা প্রচলিত রিসাইক্লিং পদ্ধতিতে খরচ ও দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। ফলে পদ্ধতিটি বড় আকারের বা বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য বেশি কার্যকর।
ধাতুগুলো আলাদা করার পর গবেষণা দলটি দেখতে পেয়েছে, উদ্ধারকৃত এসব উপাদান পুনরায় ব্যাটারির নতুন যন্ত্রাংশ তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব, যা রিসাইক্লিং প্রক্রিয়াকে পূর্ণাঙ্গ চক্রে নিয়ে আসে এবং ব্যাটারি উৎপাদনের ব্যবস্থা টেকসই হওয়ায় সহায়তা করে।
গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন খনিজ উদ্ধার ও পুনর্ব্যবহার সহজ করার মাধ্যমে এ নতুন পদ্ধতিটি বিশ্বজুড়ে কাঁচামালের সংকটের চ্যালেঞ্জ সামলাতে সাহায্য করবে, যা ভবিষ্যতের রিসাইক্লিং প্রযুক্তির জন্য বড় এক কৌশলেরই ইঙ্গিত, যেখানে কম বিষাক্ত উপাদানের সঙ্গে আধুনিক রাসায়নিক নকশার সমন্বয় ঘটিয়ে কাজের দক্ষতা বাড়ানো সম্ভব।
ব্যাটারির চাহিদা যেভাবে দিন দিন বাড়ছে তাতে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি-ভবিষ্যৎ গড়তে এ ধরনের উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।