Published : 28 Oct 2025, 02:26 PM
বর্তমানে আধুনিক বসার ঘরে বড়সড় টেলিভিশন থাকা যেন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছে। তবে গবেষকরা বলছেন, অতি উচ্চ রেজুলিউশনের বড় পর্দা মানেই ভালো অভিজ্ঞতা নয়, সাধারণ টিভিতেও একই আনন্দ উপভোগ করা যায়।
‘ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজ’ ও ফেইসবুকের মূল কোম্পানি মেটার গবেষকরা বলেছেন, সাধারণ আকারের বসার ঘরে কেউ যদি ‘ফোরকে’ বা ‘এইটকে’ টিভি কেনেন তা কম্পিউটার মনিটর ও ল্যাপটপে ব্যবহৃত ‘টুকে’ স্ক্রিনের তুলনায় তেমন কোনো দৃষ্টিগ্রাহ্য সুবিধা দেয় না, অর্থাৎ চোখে ছবির ধার বা স্পষ্টতার দিক থেকে ‘ফোরকে, ‘এইটকে’ ও ‘টুকে’ স্ক্রিনের মধ্যে তেমন কোনও স্পষ্ট পার্থক্য নেই।
‘ইউনিভার্সিটি অফ কেমব্রিজ’-এর গবেষক ও এ গবেষণার প্রধান লেখক ড. মালিহা আশরাফ বলেছেন, “নির্দিষ্ট দূরত্ব থেকে দেখলে আপনি যত পিক্সেলই যোগ করুন না কেন তাতে তেমন কোনো পার্থক্য হয় না। আমার ধারণা, বিষয়টি আসলে এক ধরনের অপচয়। কারণ মানুষের চোখ সেই অতিরিক্ত স্পষ্টতা বুঝতেই পারে না।”
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার কমিউনিকেশন্স’-এ। এ গবেষণায় মানুষের চোখের রেজুলিউশনের সীমা নির্ধারণের চেষ্টা করেছেন ড. আশরাফ ও তার গবেষণা দলটি।
গবেষণাপত্রে তারা লিখেছেন, ২০/২০ দৃষ্টিশক্তির মানে চোখ প্রতি ডিগ্রিতে ৬০ পিক্সেল পার্থক্য করতে পারা। মানুষের চোখের সক্ষমতা এত বেশি যে, সাধারণ টিভি বা মনিটরের পিক্সেল সংখ্যা অনেক সময় চোখের সক্ষমতার চেয়ে কম বা সমান হয়। ফলে অতিরিক্ত পিক্সেল বোঝার সক্ষমতা আমাদের চোখের জন্য প্রয়োজনীয় নয়।
ড. আশরাফ বলেছেন, “আপনি যদি কেবল ২০/২০ দৃষ্টিশক্তির ওপর ভিত্তি করে টিভি বা স্ক্রিনের রেজুলিউশন ডিজাইন বা বিচার করেন তবে মানুষ আসলে কতটা দেখতে পারেন তার অবমূল্যায়ন করবেন। ফলে আমরা সরাসরি পরিমাপ করেছি মানুষ আসলে কত পিক্সেল পার্থক্য করতে পারে।”
এ গবেষণায় ২৭ ইঞ্চির ‘ফোরকে’ মনিটর ব্যবহার করেছে গবেষক দলটি, যা কেইজে লাগানো ছিল। মানুষের চোখ কতটা সূক্ষ্ম পিক্সেল বা লাইন আলাদা করতে পারে তা পরীক্ষার জন্য ১৮ জন অংশগ্রহণকারীকে দুই ধরনের ছবি এলোমেলোভাবে দেখিয়েছেন গবেষকরা। এক ধরনের ছবিতে রয়েছে কালো-সাদা, লাল-সবুজ ও হলুদ-বেগুনি রঙের পাতলা রেখা বা লাইন ও অন্যটিতে সাধারণ ধূসর ব্লক, এতে কোনো লাইন নেই।
পরবর্তীতে গবেষকরা অংশগ্রহণকারীদেরকে প্রশ্ন করেছেন কোন ছবিতে লাইন আছে, আর কোনটিতে নেই। তাদের কাজ কেবল ছবিতে লাইন কোনো আছে কি না তা চিহ্নিত করা।
ড. আশরাফ বলেছেন, “এসব লাইন বা রেখা যখন খুবই সূক্ষ্ম হয়ে যায় বা স্ক্রিনের রেজুলিউশন খুব বেশি হয় তখন সেই প্যাটার্ন সাধারণ এক ধূসর ছবির মতোই দেখায়। আমরা কেবল সেই বিন্দুটি পরিমাপ করেছি, যেখানে এদের মধ্যে মানুষ পার্থক্য করতে পারেন না। আমরা এটিকেই রেজুলিউশন সীমা বলি।”
গবেষকরা বলছেন, সাধারণ ধারণার চেয়ে বেশি সূক্ষ্ম বা বিশদভাবে দেখতে পারে মানুষের চোখ। গবেষণার ফলাফলে উঠে এসেছে, সরাসরি দেখা ধূসর স্কেল ছবির জন্য গড় সক্ষমতা ৯৪ পিক্সেল প্রতি ডিগ্রি। লাল-সবুজ প্যাটার্নের গড় সক্ষমতা ৮৯ পিক্সেল প্রতি ডিগ্রি এবং হলুদ-বেগুনি প্যাটার্নের গড় সক্ষমতা ৫৩ পিক্সেল প্রতি ডিগ্রি।
মানুষের চোখ সবচেয়ে ভালো ধূসর ছবিতে সূক্ষ্মতা ধরতে পারে। অন্যদিকে রঙিন বিভিন্ন রেখায় চোখের সক্ষমতা কিছুটা কমে যায়।
আরেকটি পরীক্ষায় ১২ জন অংশগ্রহণকারীকে বিভিন্ন দূরত্ব থেকে সাদা লেখা কালো পটভূমিতে ও উল্টোভাবে কালো লেখা সাদা পটভূমিতে দেখানো হয়। এরপর অংশগ্রহণকারীদেরকে গবেষকরা প্রশ্ন করেন, লেখা কখন তাদের চোখে সর্বোচ্চ তীক্ষ্ণতার ছবির মতো স্পষ্ট দেখিয়েছে।
ড. আশরাফ বলেছেন, “পর্দার রেজুলিউশন যে পর্যায়ে গেলে মানুষ লেখা আর তীক্ষ্ণ বা অস্পষ্টের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেন না, ঠিক একই পর্যায়ে দেখা গেছে তারা পর্দায় লাইনের পার্থক্যও করতে পারেন না।”
বিষয়টি বোঝার জন্য গবেষকরা একটি চার্ট প্রকাশ করেছেন, যেখানে কোন স্ক্রিনের জন্য কত দূরত্বে বসতে হবে ও কোন রেজুলিউশন যথেষ্ট তার উল্লেখ রয়েছে। এর বেশি রেজুলিউশন দেওয়া কোনো অতিরিক্ত সুবিধা দেয় না, কারণ মানুষের চোখ এর সীমার চেয়ে বেশি পার্থক্য ধরতে পারে না।
ড. আশরাফ বলেছেন, “অন্যভাবে বললে, আপনার স্ক্রিনের আকার ও দেখার দূরত্ব ওই চার্টের যে স্কোয়ারের মধ্যে পড়ে, তার চেয়ে উচ্চ রেজুলিউশনে টিভি দেখা আপনাকে আসলে কোনো সুবিধা দেবে না।”
গবেষকরা বলছেন, মানুষের চোখের জন্য পর্যাপ্ত রেজুলিউশন এরইমধ্যে রয়েছে। ফলে বেশি পিক্সেল দেওয়া সময় বা অর্থ নষ্ট করা ছাড়া কিছুই নয়।