Published : 03 Oct 2025, 11:41 AM
ভলোদিমির টাইমোশচুক এমন একজন ব্যক্তি, যার নাম বেশিরভাগ মানুষ শোনেনি। তবুও সম্প্রতি তার ওপর এক কোটি ১০ লাখ ডলারের পুরস্কার ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার।
তিনি কোনো অস্ত্র চোরাকারবারি বা মাদকচক্রের প্রধান নন, বরং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কৌঁসুলিদের দাবি, টাইমোশচুক গত ১০ বছরে সবচেয়ে সক্রিয় র্যানসমওয়্যার হামলাকারীদের একজন। অভিযোগ বলছে, তিনি এমন সাইবার হামলায় জড়িত ছিলেন, যা হাসপাতাল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও মার্কিন বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ইউক্রেনীয় এই নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি এমন বিভিন্ন সাইবার হামলার মূল হোতা, যার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানি মোট এক হাজার ৮০০ কোটি ডলারেরও বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
‘ডেডফোর্জ’ ও ‘বোবা’ নামের ছদ্মনামে পরিচিত এই ব্যক্তি নেটওয়ার্কে অনুপ্রবেশের সফটওয়্যার তৈরি ও পরিচালনার কাজ করতেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই সফটওয়্যার ব্যবহার করে ব্যক্তিগত ডেটা লক করে রাখা হত এবং তা মুক্তির জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ চাওয়া হত।
কিছু প্রতিষ্ঠান মুক্তিপণ হিসেবে কয়েক লাখ ডলার পর্যন্ত দিতে বাধ্য হয়েছে টাইমোশচুককে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান দিনের পর দিন কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে ছিল, টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছিল তাদের জন্য।
টাইমোশচুকের বিরুদ্ধে সাতটি ভিন্ন গুরুতর অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র, যার প্রতিটিতেই আজীবন কারাদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে তার। এ কারণে তাকে ‘সিরিয়াল এক র্যানসমওয়্যার অপরাধী’ হিসেবে বর্ণণা করেছেন মার্কিন অ্যাটর্নি জোসেফ নোচেলা জুনিয়র।
তাকে ধরে দিতে পারলে যে মোটা অংকের পুরস্কারের ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র তা এই পরিস্থিতির গুরুত্বকেই বোঝায় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট স্ল্যাশগিয়ার। র্যানসমওয়্যার ও উন্নত সাইবার হামলার সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, সেখানে এমন অপরাধকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা ও প্রতিহত করাটা এখন অত্যন্ত জরুরি।
সাইবার হামলার এক বৈচিত্র্যময় পোর্টফোলিও
র্যানসমওয়্যার ব্যবহার করে চালানো সাইবার হামলার ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে এবং প্রয়োজনে তা বিশ্বজুড়ে ফ্লাইট বাতিলের কারণ পর্যন্ত হতে পারে। টাইমোশচুকের হামলা সাধারণ র্যানসমওয়্যার আক্রমণের চেয়ে কিছুটা আলাদা ধরনের হলেও ক্ষতির মাত্রা ছিল একইরকম বিপর্যয়কর।
২০১৯ সালে নরওয়ের পরিবেশবান্ধব জ্বালানি কোম্পানি ‘নর্স্ক হাউড্রো’ ‘লকারগোগা’ নামের র্যানসমওয়্যার হামলার শিকার হয়েছিল। এর ফলে বিশ্বের প্রায় ১৭০টি কারখানায় উৎপাদন সম্পূর্ণ থেমে যায়। সবশেষে কোম্পানির হিসাবের খাতায় ক্ষতির অংক দাঁড়ায় আট কোটি ১০ লাখ ডলার, যা এক ভয়ংকর আর্থিক ধাক্কা।
‘মেগাকর্টেক্স’ টাইমোশচুকের সঙ্গে জড়িত আরেকটি র্যানসমওয়্যারের ঘটনা এ সাইবার হামলা ছিল আরও ভয়ংকর এবং নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। শুরুতে এটি কেবল কর্পোরেট বিভিন্ন নেটওয়ার্ককে টার্গেট করার জন্য তৈরি হয়েছিল। তবে দ্রুতই তা ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের কম্পিউটারেও।
একসময় অনেক সাধারণ মানুষও দেখতে পান তাদের পারিবারিক ছবি, কাজের বিভিন্ন নথিসহ গুরুত্বপূর্ণ সবকিছু লক করে রাখা, যা ফেরত পেতে চাইলে মুক্তিপণ দিতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সময়ের সঙ্গে ‘মেগাকর্টেক্স’-এর কিছু কোড ভেঙে ফেলতে পারলেও টাইমোশচুক তখন নিজের কৌশল পাল্টান। তিনি আরও নতুন ধরনের র্যানসমওয়্যার তৈরি ও এর ব্যবহার শুরু করেন।
হাল ছাড়তে রাজি নয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা
বহু বছর ধরে টাইমোশচুক ছিলেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, বিশেষ করে ছদ্মনাম, সার্ভারের জটিল স্তর ও আন্তর্জাতিক সীমান্তের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন তিনি।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বসে নেই। সাইবার হামলার এই ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে এবং টাইমোশচুককে বিচারের মুখোমুখি করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের তদন্তকারীরা একসঙ্গে মিলে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলেন।
এ যৌথ প্রচেষ্টার বড় সাফল্য আসে ২০২২ সালে, যখন তারা ‘মেগাকর্টেক্স’ ‘লকারগোগা’ র্যানসমওয়্যারে আক্রান্ত শত শত কোম্পানিকে ফাইল আনলক করার জন্য বিনামূল্যে ‘ডিক্রিপশন কি’ সরবরাহ করতে সক্ষম হন।
এ বিয়ষটি কেবল সাইবার হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য স্বস্তির খবরই ছিল না, বরং বিশ্বকেও দেখিয়ে দেওয়া যে, সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই সত্যিই সম্ভব, তা যদি আন্তর্জাতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে তা ঠেকানো যায়।
তবুও এসব সাইবার হামলার পরিণতি এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এজন্য বিভিন্ন হাসপাতালকে অনেক সময় চিকিৎসা পিছিয়ে দিতে হয়েছে, কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হয়েছে এবং অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লাখ লাখ ডলার ব্যয় করেছে হ্যাকড সিস্টেম পুনর্গঠনের জন্য।
যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা কেবল আর্থিক নয়, মানবিক দিক থেকেও গভীর। আর এ বিষয়টি এখন আরও স্পষ্ট। কারণ মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ‘ট্রান্সন্যাশনাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইউনিট’টি মূলত আগে আন্তর্জাতিক অস্ত্র ও মাদক চোরাচালানকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাত এখন টাইমোশচুকের মতো হ্যাকারদেরও একই স্তরের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে তারা।
এক কোটি ১০ লাখ ডলারের এই মোটা অংকের পুরস্কার মূলত টাইমোশচুককে ধরার উদ্দেশ্যে ঘোষিত, যা একই সঙ্গে একটি শক্ত বার্তাও দেয় যে, এ ধরনের সাইবার অপরাধকে এখনও কতটা গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিপার্টমেন্ট অফ জাস্টিস’ বা ডিওজে।
এরইমধ্যে নিউ ইয়র্কে বিচারের মুখোমুখি হয়েছে টাইমোশচুকের কথিত সহষড়যন্ত্রকারী। ফলে কর্তৃপক্ষের আশা, কোথাও না কোথাও কারও চোখে এই পুরস্কারের অংক ধরা পড়বে এবং তাকে আটক করাতে তারা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করবে।