Published : 22 Mar 2026, 02:37 PM
চেনা জগতের বাইরেও গুনগুন করে ডানা ঝাপটানো মৌমাছিদের এক বিশাল রহস্যময় জগত থাকতে পারে বলে সাম্পতিক এক গবেষণায় দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা।
নতুন গবেষণা অনুসারে, পৃথিবীতে এখনও প্রায় ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৫ হাজার ২০০টি মৌমাছির প্রজাতি অজানাই রয়ে গেছে। নতুন প্রজাতির পরাগায়নকারী এ পতঙ্গদের খুঁজে বের করতে ‘গুপ্তধনের মানচিত্র’ হিসেবে কাজ করবে এ গবেষণা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, মৌমাছি সাধারণত ‘কি স্টোন’ বা অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত হয়। কারণ এদের বৈচিত্র্যই সুস্থ পরিবেশ ও শক্তিশালী কৃষিব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখে।
তবে ঠিক কত প্রজাতির মৌমাছি পৃথিবীতে আছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার কমিউনিকেশনস’-এ।
এ গবেষণার অন্যতম লেখক জেমস ডোরি বলেছেন, “একটি নির্দিষ্ট স্থানে বা মৌমাছির মতো কোনো গোষ্ঠীতে ঠিক কতগুলো প্রজাতি আছে তা জানা খুবই জরুরি। কারণ এ তথ্য আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং বিবর্তন ও বাস্তুসংস্থান সম্পর্কিত বিজ্ঞানের বড় প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে সাহায্য করবে।”
গবেষকরা এখন পর্যন্ত ১৮ হাজারেরও বেশি মৌমাছি প্রজাতির বর্ণনা দিয়েছেন। তবে ধারণা করা হয়, আরও অনেক প্রজাতি রয়েছে, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, চীন, আর্জেন্টিনা ও চিলিতে।
নতুন এ গবেষণার হিসাব অনুসারে, পৃথিবীতে মোট মৌমাছি প্রজাতির সংখ্যা ২৪ হাজার ৭০৫ থেকে ২৬ হাজার ১৬৪টির মধ্যে হতে পারে, যা বিশ্বের মৌমাছি জগত সম্পর্কে আগের চেয়ে বেশি সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় চিত্র তুলে ধরেছে।
এসব তথ্য এমন সময়ে সামনে এল যখন বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসছে, বিশ্বজুড়ে মৌমাছির কলোনি বা দলগুলো বেশি সংখ্যায় মারা যাচ্ছে। এর থেকে ইঙ্গিত মেলে, মানুষ চেনার আগেই হয়ত পৃথিবী থেকে অনেক প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
ড. ডোরি বলেছেন, “মৌমাছির কতগুলো প্রজাতি আছে তা যদি আমরা না জানি তবে প্রকৃতি ও কৃষি উভয়কে রক্ষার লড়াইয়ে আমরা বড় এক অংশ হারিয়ে ফেলব।”
নতুন গবেষণায় ১৮৬টি দেশের বৈশ্বিক ডেটাসেট, জাতীয় তালিকা ও বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করেছেন গবেষকরা। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক, মহাদেশীয় ও জাতীয় পর্যায়ে মৌমাছির প্রজাতির সংখ্যা নির্ধারণের চেষ্টা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন প্রজাতি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা সব মহাদেশে একরকম নয়। ইউরোপে হয়ত খুব অল্প কিছু প্রজাতি এখনও অজানাই রয়ে গেছে, বিশেষ করে সুইডেন বা সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে প্রজাতির বৈচিত্র্য বেশ স্থিতিশীল। এর তুলনায়, তুরস্কে সম্ভবত আরও প্রায় ৮৪৩টি মৌমাছির প্রজাতি রয়েছে, যা এখনও আবিষ্কৃত হয়নি।
গবেষণা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দ্বীপ রাষ্ট্রগুলোতে মূল ভূখণ্ডের দেশগুলোর তুলনায় মৌমাছির প্রজাতির বৈচিত্র্য বেশি হতে পারে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, বর্তমান গতিতে কাজ চললে সব প্রজাতির মৌমাছি খুঁজে পেতে আরও প্রায় ৩০ থেকে ৪৫ বছর সময় লাগবে।
ড. ডোরি বলেছেন, “বিশ্বজুড়ে বন্য মৌমাছি সংরক্ষণ, গবেষণা ও শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে আঞ্চলিক তথ্যের অভাব, বিলুপ্তি, অবৈধ শিকার, যথাযথ সংরক্ষণের অভাব এবং তথ্য আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাধা।
“এসব চ্যালেঞ্জ আফ্রিকা, এশিয়া এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার অনেক দেশে প্রকটভাবে দেখা যায়। এসব অঞ্চলে মৌমাছির প্রজাতির বৈচিত্র্য অনেক বেশি হলেও, গবেষণার সক্ষমতা ও তহবিলের অভাব রয়েছে।”
গবেষণায় বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার মতো ধনী দেশগুলোও তাদের দেশে থাকা মৌমাছির প্রজাতির সংখ্যা অনেক কম করে অনুমান করছে। ২০০০ সালের পর থেকে এ মহাদেশ যতগুলো নতুন প্রজাতির বর্ণনা দিয়েছে তার মধ্যে কেবল ১২ শতাংশের নাম এখন পর্যন্ত নথিবদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে।
এ ছাড়া, চীন ও ইসরায়েলেও নতুন প্রজাতি খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে।
গবেষকরা বলছেন, এ গবেষণায় বর্ণিত নতুন পদ্ধতিটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুসারে নতুন প্রজাতি খুঁজে বের করার জন্য কার্যকর এক ‘গুপ্তধনের মানচিত্র’ হিসেবে কাজ করবে।