Published : 17 Oct 2025, 05:53 PM
আজও অসাধারণ এক প্রকৌশল কীর্তি হিসেবে বিবেচিত হয় যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার ম্যাক ৯.৬ গতির ‘এক্স-৪৩এ’ প্লেন।
কয়েক দশক আগেও প্লেন চলাচলের কিছু নিয়ম ছিল। বায়ুমণ্ডলে দ্রুত উড়তে হলে জেট ইঞ্জিন ব্যবহার করতে হত। সে সময় সবচেয়ে দ্রুতগামী প্লেন ছিল ‘এসআর-৭১ ব্লাকবার্ড’, যেটি ‘লকহিড মার্টিন’ তৈরি করেছিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সাইট স্ল্যাশগিয়ার। প্লেনটি সর্বোচ্চ ম্যাক ৩ গতিতে উড়ত, যার মানে হচ্ছে শব্দের গতির তিনগুণ।
এ গতির থেকেও দ্রুত যেতে চাইলে প্রয়োজন হত রকেট ইঞ্জিনের। কিন্তু তাতে নিজস্ব অক্সিজেন বহন করতে হত এবং সেটি অনেকটা মহাকাশযানের মতো পরিচালিত হত, সাধারণ প্লেনের মতো নয়। এরপরই আসে নাসার ‘এক্স-৪৩এ’ প্লেনের কথা, যা এসব সীমাবদ্ধতাকে বদলে দিল।
‘এক্স-৪৩এ’ ছিল মানববিহীন পরীক্ষামূলক প্লেন, যার দৈর্ঘ্য কেবল ১২ ফুট। ২০০৪ সালে শব্দের গতির প্রায় ১০ গুণ গতিতে উড়ে ইতিহাস তৈরি করেছিল প্লেনটি।
‘হাইপার-এক্স’ নামের এ প্রকল্পটি ছিল নাসার প্রায় ২৩ কোটি ডলারের এক গবেষণা প্রকল্পের অংশ। যার উদ্দেশ্য ছিল, ‘স্ক্র্যামজেট’ নামে এক নতুন ধরনের ইঞ্জিন ল্যাবরেটরির বাইরে বা বাস্তব আকাশে কাজ করতে পারে তা প্রমাণ করা।
এর আগে কেবল কম্পিউটার সিমুলেশন আর উইন্ড টানেল পরীক্ষার মাধ্যমে এমনটি হিসাব করে দেখেছিলেন বিজ্ঞানীরা। তবে ‘এক্স-৪৩এ’ প্লেন থেকেই প্রথম ইঙ্গিত মিলেছে, এই তত্ত্ব বাস্তবেও কাজে লাগানো সম্ভব।
তবে ‘এক্স-৪৩এ’ নিজে থেকে আকাশে উড়তে পারত না। এটিকে আকাশে তুলতে ব্যবহৃত হত বিশাল এক বোমারু প্লেন- ‘বি-৫২বি’, যা প্লেনকে প্রায় ৪০ হাজার ফুট উচ্চতায় নিয়ে যেত। এ সময় এক্স-৪৩এ-প্লেনটি পেগাসাস রকেটের নাকে বাঁধা অবস্থায় থাকত এবং এখান থেকে ‘বি-৫২বি’ প্লেনটি এক্স-৪৩এ’কে ছেড়ে দিত।

এরপর রকেট ইঞ্জিনটি চালু করে এক্স৪৩এ-কে আরও উপরে ও দ্রুত গতিতে ছুঁড়ে দিত, যাতে পরীক্ষার নির্দিষ্ট উচ্চতা ও গতিতে পোৗঁছাতে পারে প্লেনটি।
তবে এ পরীক্ষা শুরুতেই সফল হয়নি। প্রথম চেষ্টা হয়েছিল ২০০১ সালের জুনে। ওই সময় রকেটটির বুস্টার ঠিকমতো কাজ না করায় পুরো পরীক্ষা ব্যর্থ হয়। ফলে দলটিকে পুরো ব্যবস্থা নতুনভাবে দুই বছর ধরে পুনরায় নকশা ও উন্নয়ন করতে হয়েছিল।
এরপর ২০০৪ সালে আবারও পরীক্ষা শুরু করে নাসা। ২০০৪ সালের মার্চে এক্স৪৩এ-এ সফলভাবে উড়ে যায় ম্যাক ৬.৮ গতিতে, যা শব্দের গতির ৬.৮ গুণ। আর ২০০৪ সালের ১৬ নভেম্বর দ্বিতীয় উড়ানটি পৌঁছায় এক অবিশ্বাস্য গতিতে, যা ঘণ্টায় প্রায় সাত হাজার মাইল ও প্রায় এক লাখ ১০ হাজার ফুট উচ্চতায় পৌঁছায় ম্যাক ৯.৬ গতিতে।
প্লেনটির ইঞ্জিন কেবল ১০ সেকেন্ড কাজ করলেও সেই অল্প সময়েই এক্স৪৩-এ প্রমাণ করেছে, বাতাসের অক্সিজেন ব্যবহার করে হাইপারসনিক উড়ান বাস্তবেও সম্ভব।
অসাধারণ সেই দ্রুত গতি অর্জনের পেছনে কাজ করেছে ‘স্ক্র্যামজেট’ প্রযুক্তি, যার পূর্ণরূপ ‘সুপারসনিক-কমবাশ্চন র্যামজেট’। সাধারণ জেট ইঞ্জিনে বাতাস টেনে নিয়ে ফ্যান ব্লেড দিয়ে চেপে ধরে তারপর জ্বালানি মিশিয়ে দহন ঘটানো হয়। তবে স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিনে কোনো চলন্ত অংশ বা ফ্যান বা টারবাইন থাকে না। এর বদলে, প্লেনের নিজস্ব গতির জোরে বাতাসকে ভেতরে এনে চেপে ধরে।
বিস্ময়কর বিষয় হচ্ছে, বাতাস পুরো ইঞ্জিনের ভেতর দিয়েই সুপারসনিক বা শব্দের চেয়ে দ্রুত গতিতে চলে এবং সেই গতির মধ্যেই জ্বালানি ইনজেক্ট করে পোড়ানো হয়, যা এক বিশাল প্রকৌশলগত চ্যালেঞ্জ। কারণ, এজন্য এমন আগুন জ্বালিয়ে রাখতে হবে, যা শব্দের চেয়েও দ্রুত বয়ে যাওয়া বাতাসের মধ্যেও টিকে থাকবে!
আর এ কারণেই স্ক্র্যামজেট প্রযুক্তি কম গতিতে কাজ করতে পারে না। ফলে এক্স-৪৩এ-এর মতো প্লেনকে প্রথমে রকেটের মাধ্যমে খুব দ্রুত গতি দেওয়া হয়, যাতে ইঞ্জিনটি পর্যাপ্ত গতিতে পৌঁছে ‘চালু’ হতে পারে।
আজও প্রায় ২০ বছর আগের সেই এক্স-৪৩এ প্লেনের পরীক্ষার তথ্য প্রকৌশলীদের জন্য ‘উত্তরপত্র’ হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানের আধুনিক কম্পিউটার সিমুলেশন বা নতুন হাইপারসনিক যানের নকশা তৈরির সময় সেই পুরানো ডেটা ব্যবহার করেই নিজেদের হিসাব ঠিক আছে কি না যাচাই করেন প্রকৌশলীরা।
এটিই সেই বাস্তব প্রমাণ, যার থেকে ইঙ্গিত মেলে, একদিন হয়ত এমন প্লেন তৈরি সম্ভব হবে, যা সরাসরি পৃথিবীর কক্ষপথে উড়ে যেতে পারবে।