Published : 29 Apr 2026, 05:08 PM
ওপেনএআইয়ের মালিকানা ও লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া এক হাই-প্রোফাইল মামলায় আইনি লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছেন ইলন মাস্ক ও স্যাম অল্টম্যান।
মাস্কের দাবি, মানবজাতির কল্যাণে তিনি যে কোম্পানিটি গড়েছিলেন বর্তমান কর্তৃপক্ষ সেটিকে ‘লুট’ করে লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তরের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
কোম্পানিটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণী এ গুরুত্বপূর্ণ মামলায় মঙ্গলবার মাস্ক কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যেখানে চ্যাটজিপিটি নির্মাতা কোম্পানিটির বিরুদ্ধে করা নিজের মামলাটিকে ‘দাতব্য কাজের সুরক্ষা’ হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।
বিশ্বের শীর্ষ ধনী এই ব্যক্তি ওপেনএআই, এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যানের বিরুদ্ধে মামলাটি করেছেন।
মাস্কের অভিযোগ, তারা মানবজাতির কল্যাণে কাজ করার যে মূল লক্ষ্য ছিল তা ছেড়ে কল্যাণমুখী কোম্পানিটিকে একটি মুনাফাভোগী ব্যবসায় রূপান্তর করে তার ও জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
মামলার প্রথম দিনে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মাস্ক বলেছেন, “আমরা যদি কোনো দাতব্য কোম্পানিকে এভাবে লুট করার সুযোগ করে দিই তবে আমেরিকায় দান বা দাতব্য কাজের পুরো ভিত্তিটাই ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আমার মূল দুশ্চিন্তার বিষয়।”
ওপেনএআই’কে নিজের মস্তিষ্কপ্রসূত উদ্ভাবন হিসেবে উল্লেখ করেছেন টেসলা ও স্পেসএক্সের এই প্রতিষ্ঠাতা।
মাস্ক বলেছেন, “ওপেনএআইয়ের আইডিয়া ও নাম সবই আমার দেওয়া। আমিই মূল লোকজনকে নিয়োগ দিয়েছিলাম, তাদের আমার জানা সবকিছু শিখিয়েছি এবং শুরুর দিকের সব অর্থায়ন আমিই করেছি।
“ওপেনএআই সুনির্দিষ্টভাবে একটি দাতব্য কোম্পানি হিসেবে গড়ার কথা ছিল, যা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির পকেট ভরবে না। আমি চাইলে এটাকে শুরু থেকেই মুনাফাভোগী ব্যবসা হিসেবে শুরু করতে পারতাম। তবে আমি সচেতনভাবেই তা করিনি।”
তবে মাস্কের সাক্ষ্য দেওয়ার আগে ওপেনএআই ও স্যাম অল্টম্যানের আইনজীবী উইলিয়াম স্যাভিট জুরিদের সামনে তার সূচনা বক্তব্যে অন্য এক চিত্র তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেছেন, ওপেনএআইয়ের শুরুর দিকের প্রসারে অর্থায়নের সময় মাস্ক আসলে সেখানে বড় অংকের মুনাফার সম্ভাবনা দেখেছিলেন। তিনি কোম্পানিটিকে এক ব্যবসায়িক কোম্পানিতে রূপান্তরের জন্য চাপ দিয়েছিলেন, যাতে তিনি নিজেই প্রধান নির্বাহী হিসেবে নেতৃত্ব দিতে পারেন।
স্যাভিট আরও বলেছেন, পুরো কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ বা ‘রাজ্যের চাবিকাঠি’ নিজের হাতে চেয়েছিলেন মাস্ক। তবে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি মামলাটি করেছেন। ২০২৩ সালে এক্সএআই নামে নিজের এক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কোম্পানি শুরু করেন, যা এখন স্পেসএক্সেরই অংশ।
নিজের বক্তব্যে স্যাভিট জোর দিয়ে বলেছেন, “মাস্ক আসলে কেবল এটাই চান যেন তিনি সবার শীর্ষে থাকেন। আমরা আজ এখানে এসেছি কারণ মাস্ক যা চেয়েছিলেন তা পাননি।”
ওপেনএআইয়ের আইনজীবী আরও দাবি করেছেন, ২০১৯ সালের মার্চে কোম্পানিটির অধীনে মুনাফাভোগী শাখা খোলা জরুরি ছিল। গুগলের ‘ডিপমাইন্ড’ এআই ল্যাবের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রচুর কম্পিউটিং সক্ষমতা কেনা এবং নামী বিজ্ঞানীদের বেতন দেওয়ার জন্য এই অর্থের প্রয়োজন ছিল।
অন্যদিকে, মাস্কের আইনজীবী স্টিভেন মোলো জুরিদের কাছে তার সূচনা বক্তব্যে ওপেনএআইয়ের বিবাদীদেরই অর্থের প্রতি লোভী হিসেবে তুলে ধরে বলেছেন, ওপেনএআই যখন থেকে মাইক্রোসফটের মতো বড় বিনিয়োগকারীদের টানতে শুরু করে, যেখানে মাইক্রোসফট ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে তখনই তাদের লক্ষ্য বদলে যায়।
“অথচ ওপেনএআই মানুষের ধনী হওয়ার কোনো মাধ্যম ছিল না।”
বুধবার মাস্ক পুনরায় তার সাক্ষ্য দিতে আদালতে উপস্থিত হবেন।

সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের কারণে মাস্ককে বিচারকের কড়া বার্তা
মাস্ক ওপেনএআই ও এর অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী মাইক্রোসফটের কাছে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১৫ হাজার কোটি ডলার দাবি করেছেন। এ অর্থের পুরোটা ওপেনএআইয়ের দাতব্য শাখায় দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
এ ছাড়া মাস্ক চান ওপেনএআই যেন পুনরায় অলাভজনক কোম্পানিতে ফিরে যায়। পাশাপাশি তিনি অল্টম্যান ও ব্রকম্যানকে কর্মকর্তার পদ থেকে এবং অল্টম্যানকে বোর্ড থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। মাস্কের অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘দাতব্য বিশ্বাসের অমর্যাদা’ এবং ‘অন্যায্যভাবে সম্পদ অর্জন’।
মাস্ক ওপেনএআইকে দাতব্য কোম্পানি হিসেবে বর্ণনা করলেও কোম্পানিটি ২০১৫ সালে তাদের ‘ইন্ট্রোডিউসিং ওপেনএআই’ নামের পোস্টে নিজেদের ‘অলাভজনক এআই গবেষণা কোম্পানি’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল।
এদিকে, জুরিরা উপস্থিত হওয়ার আগে ইউএস ডিস্ট্রিক্ট জজ ইভন গঞ্জালেজ রজার্স মাস্ককে কড়া ভাষায় সতর্ক করেছেন। ওপেনএআইয়ের আইনজীবীরা অভিযোগ করেছিলেন, সোমবার মাস্ক নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ অল্টম্যানকে ‘স্ক্যাম অল্টম্যান’ বা প্রতারক বলে আক্রমণ করেছেন এবং তার বিরুদ্ধে দাতব্য কোম্পানি চুরির অভিযোগ তুলেছেন।
বিচারক রজার্স বলেছেন, তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক ‘কথা বলার ওপর নিষেধাজ্ঞা’ জারি করতে অপছন্দ করেন। তবে তিনি মাস্ককে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “আদালতের বাইরের এসব বিষয়কে প্রভাবিত করার জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের যে প্রবণতা আপনার আছে তা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করুন... সম্ভবত আপনি আগে কখনও এমনটা করেননি।”
শেষের কথাটি বিচারক কিছুটা কটাক্ষ করেই বলেছেন।
মাস্ক নিজের সামাজিক মাধ্যম কার্যক্রম কমিয়ে আনতে রাজি হন এবং অল্টম্যানও একই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ মামলায় অল্টম্যান ও মাইক্রোসফটের প্রধান সাত্যিয়া নাদেলাও সাক্ষ্য দেবেন।
এ বিচার প্রক্রিয়াটি সেইসব প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যক্তিত্ব ও অহংবোধকে সামনে নিয়ে আসছে, যারা ওপেনএআই’কে ব্রকম্যানের অ্যাপার্টমেন্টের একটি ছোট্ট অলাভজনক ল্যাব থেকে ৮৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি মূল্যের বড় এক কোম্পানিতে রূপান্তর করেছেন।
পাশাপাশি, এ মামলাটি ওপেনএআইয়ের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে সন্দেহও তৈরি করছে, যা কোম্পানিটির শেয়ার বাজারে আসার পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলতে পারে।
এ ছাড়া এআই প্রযুক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে থাকা ভয় ও দুশ্চিন্তাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এ অবস্থা।

এআই নিরাপত্তায় মাস্কের সদিচ্ছা নিয়ে আইনজীবীদের বিতর্ক
২০১৫ সালে মাস্ক ও অল্টম্যান মিলে ওপেনএআই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর মূল লক্ষ্য ছিল মানবজাতির কল্যাণে এআই তৈরি করা এবং গুগলের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের একচেটিয়া আধিপত্য ঠেকানো।
সাক্ষ্য দেওয়ার সময় মাস্ক বলেছেন, “আমি দীর্ঘ সময় ধরে এআই নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন ছিলাম।”
তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও গুগলের সঙ্গে বৈঠকেও যখন এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে কোনো সুরাহা হয়নি তখন থেকেই তিনি এ বিষয়ে আরও গুরুত্ব দিতে শুরু করেন।
গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেইজের কথা উল্লেখ করে মাস্ক বলেছেন, “আমি ল্যারি পেইজের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলাম। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা এআই নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতাম। তবে এক সময় আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল, পেইজ এআই নিরাপত্তার বিষয়ে যথেষ্ট যত্নশীল নন। গুগলের বিপরীতে আমাদের শক্তিশালী এক বিকল্প গড়ে তোলার প্রয়োজন ছিল।”
তবে ওপেনএআইয়ের আইনজীবী স্যাভিট নিজের সূচনা বক্তব্যে দাবি করেছেন, এআই নিরাপত্তা মাস্কের কাছে কখনোই অগ্রাধিকার পায়নি। মাস্ক ওপেনএআইয়ের সেসব কর্মীদের ছোট করতেন যারা এই নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করতেন।
স্যাভিট বলেছেন, “মাস্ক তাদের গাধা বলে ডাকতেন।”
জবাবে মাস্ক বলেছেন, ওপেনএআইয়ের মূল লক্ষ্য পূরণের জন্য তিনি প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার দিয়েছিলেন। কোম্পানির কম্পিউটিং সক্ষমতা নিশ্চিত করতে তিনি তার ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়েছিলেন এবং নিজে সরাসরি সাত্যিয়া নাদেলা ও এনভিডিয়া’র সিইও জেনসেন হুয়াংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।
মাস্ক ওপেনএআইয়ের বোর্ড ছেড়ে দেওয়ার ১৩ মাস পর কোম্পানিটি তাদের মুনাফাভোগী শাখাটি তৈরি করেছে।
মাইক্রোসফটের আইনজীবী রাসেল কোহেন তার সূচনা বক্তব্যে বলেছেন, কোম্পানিটি কোনো ভুল করেনি এবং তারা ‘প্রতিটি পদক্ষেপে একজন দায়িত্বশীল অংশীদার’ হিসেবে কাজ করেছে।
ওপেনএআই বর্তমানে অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকে ক্রমাগত প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে এবং কম্পিউটিং সম্পদের পেছনে শত শত কোটি ডলার ব্যয় করছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুসারে, সম্ভাব্য আইপিও বা শেয়ার বাজারে আসার মাধ্যমে কোম্পানিটির বাজারমূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে মাস্কের নিজস্ব এআই কোম্পানি এক্সএআই ওপেনএআইয়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। তিনি এ ব্যবসাকে স্পেসএক্সের সঙ্গে যোগ করেছেন। এ বছর স্পেসএক্সের আইপিও ইতিহাসের বৃহত্তম হতে পারে।
গেল বছরের শেষদিকে ওপেনএআই তাদের কাঠামো আবারও পরিবর্তন করে ‘পাবলিক বেনিফিট কর্পোরেশন’-এ পরিণত হয়েছে। এখন এ নতুন কাঠামোতে অলাভজনক শাখা ও মাইক্রোসফটসহ অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের পার্টনারশিপ।
বর্তমানে অলাভজনক শাখাটির হাতে ২৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে, পাশাপাশি ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট মূল্যায়নে পৌঁছালে আরও শেয়ার পাওয়ার অধিকার সংরক্ষিত আছে।
আরও পড়ুন…
ওপেনএআই নিয়ে আদালতে মাস্ক ও অল্টম্যান লড়াইয়ে নতুন তিক্ত মোড়