Published : 25 Aug 2025, 04:05 PM
দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের এক ছোট ইউনিভার্সিটির ল্যাবরেটরিতে ছোট আকারের ড্রিল ব্যবহার করে আড়াই হাজার বছর পুরানো একটি দাঁতের ওপরে থাকা এনামেলের স্তর সরিয়ে নিচ্ছেন গবেষকরা।
‘মাদুরাই কামারাজ ইউনিভার্সিটি’র গবেষকরা বলছেন, এ দাঁতটি দুটি মানুষের খুলির মধ্যে একটির, যেগুলোকে এ অঞ্চলের প্রাচীন বাসিন্দারা দেখতে কেমন ছিলেন তা বোঝার উদ্দেশ্যে ডিজিটালভাবে তাদের মুখমণ্ডল পুনর্গঠনের জন্য মডেল হিসেবে ব্যবহার করেছেন তারা।
এ দুইটি খুলিই পুরুষের এবং এগুলো ভারতের কুন্দগাই থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। অঞ্চলটি মূলত প্রাচীন এক কবরস্থান, যা ‘কিলাদি’ নামের ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের ঐতিহাসিক এক প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান থেকে প্রায় ৪ কিমি দূরে অবস্থিত। কিলাদি বর্তমানে ভারতের এক রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
তামিলনাড়ু রাজ্য বিভাগের প্রত্নতাত্ত্বিকরা বলছেন, কিলাদিতে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮০ সালের দিকে এক নগরসভ্যতা গড়ে উঠেছিল। তাদের এমন দাবি ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ভারতের প্রাচীন ইতিহাসে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নগরসভ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় সিন্ধু সভ্যতাকে, যা আজকের ভারতের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে গড়ে উঠেছিল। এতদিন পর্যন্ত শহরায়নের ইতিহাস মূলত উত্তর ভারতকেন্দ্রিক বলেই বিবেচিত হয়ে এসেছে।
তবে রাজ্যটির পুরাতত্ত্ববিদরা বলছেন, কিলাদিতে খুঁজে পাওয়া এসব তথ্য প্রথমবারের মতো দাবি করছে, দক্ষিণ ভারতেও এক প্রাচীন স্বাধীন সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল।
তারা বলেছেন, প্রাচীন কিলাদির মানুষ সভ্য, শিক্ষিত ও দক্ষ এবং উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ও বিদেশে বাণিজ্য করতেন। তারা ইটের তৈরি ঘরে বাস করতেন এবং কেউ মারা গেলে মৃতদের সঙ্গে খাবারের শস্য, পাত্র ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র তাদের সমাধিস্থলের ভেতর রেখে দিতেন।
এ পর্যন্ত ওই স্থানে প্রায় মৃতদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য ব্যবহার করা হত এমন ৫০টি পাত্র উদ্ধার করেছেন পুরাতত্ত্ববিদরা।
কিলাদির বাসিন্দারা কারা ছিলেন ও তাদের জীবনযাপন কেমন ছিল তা আরও ভালোভাবে বুঝতে এখন এসব পাত্র থেকে উদ্ধারকৃত মানুষের হাড় ও অন্যান্য সামগ্রী থেকে ডিএনএ বের করে পরীক্ষা করছেন ‘মাদুরাই কামারাজ ইউনিভার্সিটি’র গবেষকরা।
তবে এই থেকে হয়ত আরও গভীর এক অনুসন্ধান শুরু হচ্ছে।
‘মাদুরাই কামারাজ ইউনিভার্সিটি’র জেনেটিক্স বিভাগের প্রধান অধ্যাপক জি কুমারেশান বলেছেন, “আমাদের পূর্বপুরুষদের পরিচয় ও তাদের অভিবাসনের বিভিন্ন পথ বুঝতে চাই আমরা। এ এমন এক যাত্রা, যা আমাদের বড় প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করার দিকে নিয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে ‘আমরা কারা ও এখানে কিভাবে এসে পৌঁছেছি’ এমন সব প্রশ্ন।”
আড়াই হাজার বছর পুরানো খুলির মুখমণ্ডল পুনর্গঠনের কাজ থেকে এমন কিছু সূত্র মিলেছে, যা গবেষকদের এসব প্রশ্নের অন্তত একটির উত্তর দিতে পারবে।
অধ্যাপক কুমারেশান বলেছেন, “এসব মুখমণ্ডলে প্রধানত প্রাচীন দক্ষিণ ভারতীয় পূর্বপুরুষদের বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যাদেরকে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম বাসিন্দা হিসাবে ধরে নেওয়া হয়।”
মুখমণ্ডলের এসব বৈশিষ্ট্যতে মধ্যপ্রাচ্য ইউরেশীয় ও অস্ট্রো-এশিয়াটিক বংশগতির ছাপও দেখা গিয়েছে, যা প্রাচীন গোষ্ঠীদের বৈশ্বিক অভিবাসন ও মিশ্রণের ইঙ্গিত দেয় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
তবে অধ্যাপক কুমারেশান বলেছেন, কিলাদির বাসিন্দাদের সঠিক বংশগতির বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন।
প্রথমে এসব খুলি থেকে থ্রিডি স্ক্যান তৈরি করে মুখমণ্ডল পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন ‘মাদুরাই কামারাজ ইউনিভার্সিটি’র গবেষকরা।
এসব ডিজিটাল স্ক্যান পরে যুক্তরাজ্যের ‘লিভারপুল জন মুরস ইউনিভার্সিটি’র ফেইস ল্যাবে পাঠানো হয়। ফরেনসিক, কলাকৌশল, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডিজিটাল ক্র্যানিওফেসিয়াল বা মস্তিষ্ক ও মুখ পুনর্গঠনে বিশেষজ্ঞ ফেইস ল্যাব।
কম্পিউটার সফটওয়্যার ব্যবহার করে খুলির স্ক্যানে পেশী, মাংস ও ত্বক যোগ করেছেন ল্যাবের বিশেষজ্ঞরা, যার ফলে তাদের মুখমণ্ডলের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়েছে। এসব সংযোজন মানব দেহের সাধারণ অনুপাত ও মাপের ভিত্তিতে করা হয়েছে।
এরপর আসে বড় চ্যালেঞ্জ, এসব ছবিতে রং যোগের কাজটি। এটি করতে গিয়ে উঠে এল নানা ধরনের প্রশ্ন, যেমন– প্রচীন পুরুষদের ত্বকের রং কেমন হওয়া উচিত, তাদের চোখের রং কী হবে ও চুল কেমন দেখতে হবে এমন সব প্রশ্ন।
অধ্যাপক কুমারেশান বলেছেন, তামিলনাড়ুতে বর্তমানে বসবাসরত মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিল রেখে রঙের ব্যবহার করেছেন তারা। তবে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র আলোচনা ও বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে এসব ডিজিটাল ছবি।

ভারতের সমাজে দীর্ঘদিন ধরে থাকা বর্ণ, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বিভিন্ন বিভাজনকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে এই বিতর্ক।
বিবিসি লিখেছে, ভারতের ইতিহাস নিয়ে দুইটি ভিন্ন মতবাদ রয়েছে। একদিকে কেউ কেউ মনে করেন, আর্যরা ছিলেন ভারতের ‘প্রথম বাসিন্দা বা মূল নাগরিক’, যাদের উত্তর ভারতে বসবাস করার কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে কারো কারো ধারণা, এ সম্মানটি দ্রাবিড়দের দেওয়া উচিত, যারা মূলত দক্ষিণ ভারতের বাসিন্দা। এ দুই মতবাদের মধ্যে বিরোধ বা দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে উত্তর-দক্ষিণ এ দুটি মতবাদে বিভাজিত। যার একটি কারণ হচ্ছে, অনেকের ধারণা, ভারতের সভ্যতা শুরু হয়েছিল মূলত উত্তর ভারত থেকে, আর সেই সভ্যতা থেকেই ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মসহ পুরো দেশের ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে। ফলে অনেকেই মনে করেন উত্তর ভারতই ভারতের ‘মূল’ সংস্কৃতির কেন্দ্র।
তবে অধ্যাপক কুমারেশান বলেছেন, কিলাদি খুলির মুখমণ্ডলের এমন এক বার্তা দিয়েছে, যা আরও জটিল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক।
“আমরা যতটা ভাবি তার চেয়েও বেশি বৈচিত্র্যময় আমরা, যার প্রমাণ আমাদের ডিএনএ-তে লুকিয়ে রয়েছে– এটাই হল আমাদের জন্য শিখনীয় বার্তা।”
তবে এটিই প্রথম নয় যে ভারতীয় গবেষকরা প্রাচীন খুলির ওপর ভিত্তি করে মুখমণ্ডল পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছেন।
এর আগে, ২০১৯ সালে ভারতের সিন্ধু সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান ‘রাখিগড়ি’র এক সমাধিস্থলে পাওয়া দুটি খুলির মুখমণ্ডল পুনর্গঠন করেছিলেন বিজ্ঞানীরা। তবে সেইসব স্কেচে রং ও অন্যান্য শারীরিক বৈশিষ্ট্যের অভাব ছিল।
ফেইস ল্যাব দলের প্রধান ক্যারোলিন উইলকিনসন বলেছেন, “মানুষ হিসেবে আমাদের মুখের প্রতি এক ধরনের বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে, আমরা মুখ চিনতে ও তা বিশ্লেষণ করতে পারি। আর এ ক্ষমতাই আমাদের একজন সামাজিক প্রাণী হিসেবে সফল করে তুলেছে।
“এসব মুখমণ্ডলের ছবি দর্শকদের উৎসাহিত করে যেন তারা প্রাচীন কঙ্কাল বা এসব অবশিষ্টাংশকে নিছক পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে না দেখে, বরং সেগুলোকে মানুষ হিসেবে উপলব্ধি করেন। কারণ এটি বড় জনগোষ্ঠীর ইতিহাসের চেয়ে ব্যক্তিগত গল্পের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি করে।”
সিন্ধু সভ্যতা নিয়ে ঠিক যেভাবে গভীর গবেষণা হয়েছে বর্তমানে কিলাদি সভ্যতা নিয়েও বিশদভাবে গবেষণার চেষ্টা করছেন ‘মাদুরাই কামারাজ ইউনিভার্সিটি’র গবেষকরা।
অধ্যাপক কুমারেশান বলেছেন, “প্রাচীন এসব ডিএনএ সংগ্রহশালা যেন অতীতেরই এক একটি দরজা, যেগুলো আমাদের জীবনের অতীত রূপ ও বর্তমান উপলব্ধির মধ্যে অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি এনে দিতে পারে।”