Published : 08 Jun 2026, 10:06 AM
বনের গাছ কাটা ও পকেটের স্মার্টফোনের মধ্যে লুকিয়ে আছে ইবোলা ছড়ানোর এক অদৃশ্য যোগসূত্র। উচ্চ-প্রযুক্তির খনিজ সম্পদের খোঁজে মানুষ যত বনের গভীরে ঢুকছে ততই বন্যপ্রাণীর সংস্পর্শে এসে ছড়িয়ে পড়ছে এ প্রাণঘাতী ভাইরাস।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে লিখেছে, প্রচলিত চিকিৎসা বা প্রস্তুতি দিয়ে এ মহামারী ঠেকানো সম্ভব নয়। একে থামাতে হলে সবার আগে রক্ষা করতে হবে প্রকৃতির বিপন্ন বাস্তুসংস্থানকে।
১৯৭৬ সালে ইবোলা ভাইরাস আবিষ্কারের পর কয়েক দশক ধরে এ রোগের প্রাদুর্ভাব ছিল তুলনামূলকভাবে ছোট ও সীমিত। তখন বড়জোর কয়েকশ মানুষ এতে আক্রান্ত হতেন।
তবে পরিস্থিতি এখন আর তেমন নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইবোলার প্রাদুর্ভাব বড় আকার নিয়েছে, যা একাধিক দেশ জুড়ে দশ হাজারেরও বেশি মানুষকে আক্রান্ত করে চলেছে।
২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলার প্রাদুর্ভাবে তিনটি মহাদেশের ১০টি দেশে ২৮ হাজারেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। মে মাসের শুরুতে শুরু হওয়া বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি বর্তমানে কমার কোনো লক্ষণই দেখাচ্ছে না। এরইমধ্যে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অফ কঙ্গোতে ৩৬৩ জনকে আক্রান্ত করেছে এবং উগান্ডাতেও ছড়িয়ে পড়েছে এ রোগ।
এর প্রচলিত ব্যাখ্যা হিসেবে বলা যেতে পারে, বর্তমানে পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা বেশি এবং তারা একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে। ফলে রোগজীবাণু সহজেই ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে।
তবে এর পেছনে আরও একটি কারণ হচ্ছে বাস্তুসংস্থানের পরিবর্তন। উচ্চ-প্রযুক্তির অর্থনীতি সচল রাখতে বিশ্বজুড়ে খনিজ সম্পদের যে ক্রমাগত চাহিদা তৈরি হয়েছে তার ফলেই এমন পরিবর্তন ঘটছে।
অধিকাংশ সময় ইবোলার মতো বিভিন্ন ভাইরাস প্রাণী পোষকের (বাদুড়) কোনো ক্ষতি না করে নীরবে বাস করে। কঙ্গোর মতো দেশে বাস করে এ ভাইরাস বহনকারী বিভিন্ন বাদুড়। দেশটির সীমানার ভেতরেই রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেইনফরেস্টের ৬০ শতাংশ, যা সাধারণত প্রত্যন্ত অঞ্চলের খুব কম মানুষের সংস্পর্শে আসত। ফলে ছোটখাটো প্রাদুর্ভাব ঘটলেও তা দ্রুতই শেষ হয়ে যেত।
এ ছাড়া, ইবোলা বহনকারী বাদুড়দের আশপাশে বসবাসকারী মানুষ বারবার এর সংস্পর্শে আসার ফলে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে এক ধরনের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করেছে।
জরিপ অনুসারে, গ্যাবনের বনাঞ্চলে বসবাসকারী প্রায় ২০ শতাংশ মানুষের দেহে ইবোলাভাইরাসের বিরুদ্ধে এ প্রতিরোধ সক্ষমতা গড়ে উঠেছে।
তবে যেসব গাছে বাদুড় বাস করে, সেগুলো কেটে ফেলার ফলে ইবোলা বহনকারী প্রাণী ও মানুষের মধ্যকার এ সূক্ষ্ম ভারসাম্যটি ভেঙে যাচ্ছে। কারণ, গাছপালা উজাড় হয়ে গেলেও বাদুড়গুলো উধাও হয়ে যায়নি।
এরা বনের অবশিষ্ট ছোট ছোট অংশে এসে ভিড় করে এবং মানুষের আরও কাছাকাছি চলে আসে। ফলে মানুষের সঙ্গে এদের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং বাদুড়ের ভাইরাসওয়ালা রক্ত, লালা ও মলমূত্রের সংস্পর্শে মানুষ চলে আসে।
এ কারণে ২০২৫ সালের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, মধ্য আফ্রিকায় বন উজাড়ের হার প্রতি এক শতাংশ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ম্যালেরিয়া ও ইবোলার প্রকোপ ২০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
ঠিক একই কারণে, ২০১৪ সালের ইবোলা মহামারীটি শুরু হওয়ার আগে গিনির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে, যেখান থেকে রোগটি ছড়িয়েছিল সেখানে প্রায় ৮৫ শতাংশ বনভূমি ধ্বংস হয়েছিল।
বুন্দিবুগিও ইবোলার বর্তমান প্রাদুর্ভাবটিও এ একই ধারার সঙ্গে মিলে যায়।
‘গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ’-এর স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে কঙ্গো অববাহিকার রেকর্ড ১৫ লাখ একর রেইনফরেস্ট ধ্বংস হওয়ার পরেই এ প্রাদুর্ভাবটি দেখা দিয়েছে।
বিশ্বের বনভূমির ওপর মানুষের এ চাপ অবশ্য নতুন কিছু নয়। হাজার বছর ধরে মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে জ্বালানি ও খাবার উৎপাদনের জন্য গাছ কেটে আসছে।
তবে কঙ্গোর ক্ষেত্রে বন উজাড়ের পেছনে একটি নতুন কারণ রয়েছে, যার সম্পর্ক মানুষের টিকে থাকার চেয়ে আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতির বিশেষ চাহিদার সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত।
নরওয়েজিয়ান ‘ইউনিভার্সিটি অফ লাইফ সায়েন্সেস’-এর অর্থনীতিবিদ মালতে লাদেউইগ বলছেন, এ বন ধ্বংসের অন্যতম কারণ প্রচলিত ‘ক্ষুদ্রাকার’ খনির প্রতি মানুষের ক্রমাগত আকর্ষণ।
সেখানকার স্থানীয় মানুষ সোনা, কোল্টান ও কোবাল্টের মতো বিভিন্ন খনিজ উত্তোলন করছে, যা চোরাকারবারি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের অনানুষ্ঠানিক এক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে।
কঙ্গোতে আনুমানিক ২০ লাখ মানুষ এ প্রথাগত খনি শিল্পে কাজ করেন, যার মধ্যে ৩ লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ রয়েছেন দেশটির পূর্বাঞ্চলে। সেখানে খননের মতো খনিজওয়ালা পাথরের কোনো অভাব নেই।
কঙ্গো বিশ্বের শীর্ষ কোবাল্ট উৎপাদনকারী ও আফ্রিকার বৃহত্তম তামা উৎপাদনকারী দেশ হওয়ার পরও দেশটিতে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র সংঘাতের কারণে এর প্রায় ২৪ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যের খনিজ সম্পদের সিংহভাগই বড় বড় বাণিজ্যিক খনি কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে এখনও উত্তোলিত হয়নি।
একই সময়ে, সেমিকন্ডাক্টর থেকে শুরু করে স্মার্টফোনের মতো প্রযুক্তি পণ্য তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ‘৩টিজি’ খনিজের (টাংস্টেন, টিন, ট্যানটালাম ও সোনা) বৈশ্বিক চাহিদা আকাশচুম্বী হচ্ছে এবং আগামী বছরগুলোতে তা তিন গুণ হবে।
এ খাতে চীনের আধিপত্য ঠেকাতে মরিয়া হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ২০১৮ সালে ‘সংঘাতপূর্ণ খনিজ’ সংক্রান্ত নিয়মকানুন স্থগিত করেছিলেন। গেল বছর কঙ্গোর খনিজ সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পাওয়ার বিনিময়ে দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিতের একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন তিনি।
ফলে খনিজওয়ালা বনাঞ্চলে বসবাসকারী স্থানীয় মানুষদের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে। এক, জীবনধারণের জন্য কৃষিকাজ করা, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, মাটির উর্বরতা হ্রাস ও সংঘাতের কারণে কৃষি বাজারের পতনের ফলে এখন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত। আর দুই, খনিজের সন্ধান করা।
অর্থনীতিবিদ লাদেউইগ পূর্ব কঙ্গোর স্থানীয় মানুষের ওপর জরিপ চালানোর সময় দেখতে পেয়েছেন, এ ক্ষুদ্রাকার খনি শিল্প সেখানে ‘জীবিকার ব্যাপক মাধ্যম’ হয়ে উঠেছে, যার সঙ্গে স্থানীয় প্রায় ৩০ শতাংশেরও বেশি পরিবার জড়িয়ে।
তবে খনিজের এ সন্ধান ইবোলার বাস্তুসংস্থানকে এমন এক অদ্ভুত উপায়ে বদলে দিয়েছে, যা মানুষের মধ্যে এ রোগজীবাণুর ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে।
মানুষ সাধারণত কৃষিজমির সীমানা বাড়িয়ে বনের প্রান্ত বা ধার ঘেঁষে ভেতরের দিকে এগোয়। এর বিপরীতে, যারা খনিজের খোঁজ করেন তারা একেবারে বনের গভীরে বা কেন্দ্রস্থলে গিয়ে হানা দেন।
খনিজ সম্পদের ক্রমাগত দাম সব জায়গার মানুষকে আকৃষ্ট করছে, যার মধ্যে এমন লোকেরাও রয়েছে যাদের দেহে বনের স্থায়ী বাসিন্দাদের মতো ভাইরাসের বিরুদ্ধে পাওয়া প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই।
লোকালয় ও কৃষিবাজার থেকে অনেক দূরে থাকায় তারা শিকারের ওপর নির্ভর করে জীবনধারণ করেন, যা তাদের দেহের সঙ্গে বনের অন্যান্য পশুপাখির এক নিবিড় সংস্পর্শ তৈরি করছে। তাদের শিকার করা পশুর তালিকায় ‘বুন্দিবুগিও’র মতো ইবোলাভাইরাস বহনকারী কোনো প্রাণী থাকলে তাদেরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
এদিকে, নিম্নমানের স্যানিটেশন ও দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামোওয়ালা এসব অস্থায়ী খনি শহরে কোনো রোগজীবাণু একবার ঢুকলে তা সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
বর্তমান মহামারীর সূত্রপাতের পেছনে এ ক্ষুদ্রাকার খনি শিল্পের কোনো ভূমিকা ছিল কি না তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে এটুকু বলা যেতে পারে, প্রথম যে কয়জন রোগী এতে মারা গিয়েছেন তারা উত্তর-পূর্ব কঙ্গোর ‘মংবওয়ালু’ নামের এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।
মংবওয়ালু খনিনির্ভর শহর, যেখানে অনিয়ন্ত্রিত সোনার বিভিন্ন খনি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
স্যাটেলাইট তথ্যে উঠে এসেছে, গেল বছর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের প্রতিক্রিয়ায় সোনার দাম দ্বিগুণ হয়ে গেলে মংবওয়ালুর আশপাশের বনভূমি কেটে উজাড় করা হয়েছিল এবং জঙ্গল কেটে মানুষের নতুন সীমানা বনের আরও গভীরে গেছে।
নাসা ও মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ‘ইউএসজিএস’-এর স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে বনভূমির পরিবর্তনের ওপর নজর রাখছেন বিজ্ঞানী ম্যাথিউ হ্যানসেন।
তিনি ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের বৈশ্বিক বন পরিবর্তনের মানচিত্রে মংবওয়ালু এলাকাটি জুম করে গার্ডিয়ানকে দেখান। ২০২৫ সালে নতুন করে উজাড় হওয়া বনভূমি নির্দেশকারী উজ্জ্বল নীল রঙের আঁকাবাঁকা বিভিন্ন রেখা মংবওয়ালু থেকে পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে ছড়িয়ে পড়েছিল।
মানচিত্রটির দিকে তাকিয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, “হায়! এখানকার অবস্থা একদম স্পষ্ট। এখানে খনির বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে, যা বিস্ময়কর!”
ভয়াবহ মহামারীর এ সংকটকালে বিশেষজ্ঞ ও নীতি-নির্ধারকরা রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর আমাদের করণীয় ও পরবর্তী মহামারীর জন্য কীভাবে আরও ভালোভাবে প্রস্তুতি নেওয়া যায় সেসব বিষয়েই বেশি মনোযোগ দেবেন এমনটাই স্বাভাবিক।
তবে বুন্দিবুগিও ইবোলার মতো সম্পূর্ণ নতুন রোগজীবাণুর ক্ষেত্রে এমন কোনো পূর্বপ্রস্তুতি বা তৎপরতা নেই, যা জ্যামিতিক হারে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার আগেই পুরোপুরি দমন করতে পারে। বুন্দিবুগিও ইবোলা প্রচলিত রোগনির্ণয় পরীক্ষা ও টিকাকে সহজে ফাঁকি দিতে পারে।
এক্ষেত্রে প্রথম ধাপই হতে পারে বনের সেই ভেঙে পড়া বাস্তুসংস্থানকে রক্ষা করা, যা এসব নতুন রোগজীবাণুকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য করছে।
এর জন্য কঙ্গো অববাহিকার মতো বনাঞ্চলের বাস্তুসংস্থানের স্বাস্থ্যের প্রতি আরও বেশি নজর দিতে হবে এবং একইসঙ্গে ভাবতে হবে, কীভাবে সেই বনের বিভিন্ন খনিজ সম্পদ এই মুহূর্তে আপনার পকেটে থাকা সচল স্মার্টফোনটির ভেতরে স্থান করে নিয়েছে।