সবচেয়ে কম বয়সী ডাইনোসরের খোঁজ মিলল
এ অদ্ভুত জীবাশ্মটি দেখতে বর্মধারী ডাইনোসরের মতোই। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া এর প্রতিটি নমুনা আকারে খুবই ছোট, যা লম্বায় ৪০ সেন্টিমিটারের বেশি নয়।
এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে কম বয়সী বর্মধারী ডাইনোসরের খোঁজ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চীনে পাওয়া ছোট্ট এক ডাইনোসর ধাঁধায় ফেলে রেখেছিলেন বিজ্ঞানীদের।
‘লিওনিংওসরাস প্যারাডক্সাস’ নামে পরিচিত এ অদ্ভুত জীবাশ্মটি দেখতে বর্মধারী ডাইনোসরের মতোই। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া এর প্রতিটি নমুনা ছিল আকারে খুবই ছোট, যা লম্বায় ৪০ সেন্টিমিটারের বেশি নয় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজ।
বিষয়টি বেশ বিভ্রান্তিকর। কারণ বর্মধারী পূর্ণবয়স্ক ডাইনোসদের ‘অ্যাঙ্কাইলোসর’ নামে পরিচিত। এরা সাধারণত তিন মিটার বা তার বেশি লম্বা হয়ে থাকে। অবশেষে এই রহস্যের সমাধান করেছে নতুন এক গবেষণা।
এসব ডাইনোসর কোনো ক্ষুদ্রাকৃতির পূর্ণবয়স্ক ডাইনোসর বা কোনো অদ্ভুত জলচর বা উভচর প্রজাতিও ছিল না। যদিও, একসময় এমনটিই ধারণা করেছিলেন কোনো কোনো বিজ্ঞানী।
এগুলো আসলে ছিল শিশু ডাইনোসর। তবে এর মধ্যে একটি জীবাশ্ম এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবথেকে কম বয়সী ‘অ্যাঙ্কাইলোসর’, যা ডিম থেকে সদ্য ফুটে বের হওয়া এক শিশু ডাইনোসর।
‘লিওনিংওসরাস’ সম্পর্কে প্রথম বর্ণনা মেলে ২০০১ সালে এবং দ্রুতই বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হয় এই ডাইনোসর। এর শরীরের গঠন ও প্রাথমিক পর্যায়ের বর্ম দেখে মনে হয়েছিল ডাইনোসরটি ‘অ্যাঙ্কাইলোসর’ দলের অন্তর্ভুক্ত। তবে এর কোনো পূর্ণবয়স্ক জীবাশ্ম কখনোই খুঁজে পাওয়া যায়নি।
প্রতিটি নতুন আবিষ্কারই এই অদ্ভুত বিষয়কে নিশ্চিত করেছিল, যেখানে পাওয়া যাওয়া সব কটি ডাইনোসরই ছিল আকারে ছোট ও প্রায় একই মাপের।
কোনো বড় আকারের নমুনা বা জীবাশ্ম না পাওয়ায় গবেষকরা নিশ্চিত হতে পারছিলেন না, ডাইনোসরটি আসলেই ছোট প্রজাতির নাকি এগুলো স্রেফ শিশু ডাইনোসর ছিল।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘জার্নাল অফ ভার্টিব্রেট প্যালিয়ন্টোলজি’তে। এ গবেষণায় ডাইনোসরটির বিভিন্ন হাড় আরও সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করেছে গবেষণা দলটি।
গবেষক দলটি হাড়ের আকারের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে বরং এর সূক্ষ্ম গঠনের দিকে নজর দিয়েছে। গাছের কাণ্ডের মতো ডাইনোসরের হাড়ের ভেতরেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধির ছাপ থেকে যায়। ডাইনোসরের জীবনের প্রতিটি বছরের জন্য সাধারণত হাড়ের ভেতরে একটি করে দৃশ্যমান বৃদ্ধির রেখা তৈরি হয়।
সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে ছোট ‘লিইওনিংওসরাস’ জীবাশ্মের হাড়ের নমুনা পরীক্ষার সময় বিজ্ঞানীরা দেখলেন, হাড়গুলোতে বৃদ্ধির কোনো রেখাই ছিল না। যার মানে, এ দুটি ডাইনোসরই ছিল এক বছরের কম বয়সী।
সবচেয়ে ছোট জীবাশ্মটিতে ‘হ্যাচিং লাইন’ বা ডিম ফোটার রেখা মিলেছে। এটি হাড়ের ভেতরে থাকা খুব ক্ষুদ্র এক গোলাকার চিহ্ন, যা ডাইনোসরটি ডিম ফুটে বের হওয়ার সময় তৈরি হয়। এর থেকে গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন, প্রাণীটি ডিম ফুটে বের হওয়ার পরপরই মারা গিয়েছিল।
এখন পর্যন্ত পাওয়া সব ‘লিইওনিংওসরাস’ জীবাশ্ম উত্তর-পূর্ব চীনের লিয়াওনিং প্রদেশ থেকে এসেছে। অঞ্চলটি ক্রিটেসিয়াস যুগের ডাইনোসরের জীবাশ্ম অত্যন্ত চমৎকারভাবে সংরক্ষিত থাকার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত।
সেখানকার অনেক প্রাণীই হ্রদের তলানির সূক্ষ্ম স্তরে সমাহিত হয়েছিল, পরে যেগুলো বিভিন্ন সময়ে আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের নিচে ঢাকা পড়ে গিয়েছে। এই অস্বাভাবিক পরিবেশ বিজ্ঞানীদের বিরল ও বিস্তারিত তথ্যওয়ালা জীবাশ্মের খোঁজ দিয়েছে, যার মধ্যে পালকওয়ালা ডাইনোসর ‘মাইক্রোর্যাপ্টর’ অন্যতম।
কোনো পূর্ণবয়স্ক ‘লিইওনিংওসরাস’-এর খোঁজ না মিললেও এ শিশু ডাইনোসরের জীবাশ্ম অনেক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিয়েছে। সাধারণত অল্পবয়সী ‘অ্যানকিলোসরাস’ ডাইনোসর খুঁজে পাওয়া খুবই বিরল। আর যেসব শিশু জীবাশ্ম মিলেছে সেগুলোর বেশিরভাগেরই বড়দের মতো শক্ত বর্ম বা আবরণ থাকে না।
তবে ‘লিইওনিংওসরাস’ প্রমাণ করেছে অন্তত কিছু বর্মধারী ডাইনোসরের দেহে জীবনের খুব শুরুর দিকেই সুরক্ষামূলক শক্ত হাড়ের প্লেট তৈরি হয়ে যায়।
এসব জীবাশ্ম ক্ষুদ্র কোনো পূর্ণবয়স্ক ডাইনোসরের নয়, বরং সদ্য জন্মানো শিশু– এ সত্যটি উন্মোচনের জন্য বিজ্ঞানীদের এক অনন্য সুযোগ করে দিয়েছে এ গবেষণা। ফলে বর্মধারী ডাইনোসররা এদের জীবন কীভাবে শুরু করত সে সম্পর্কে এখন পর্যন্ত স্পষ্ট ধারণা মিলেছে।
গবেষকরা বলছেন, ভবিষ্যতে কোনো পূর্ণবয়স্ক ‘লিইওনিংওসরাস’ খুঁজে পাওয়া গেলে তা আরও দারুণ হবে। আপাতত এই খুদে জীবাশ্মগুলোই ডাইনোসরের বৃদ্ধি সম্পর্কে আমাদের আগের ধারণায় বড় প্রভাব ফেলেছে।
