Published : 18 Aug 2025, 12:36 PM
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কী সহজেই আমরা বিজ্ঞাপন চিনতে পারি বা চেনা যায়? উত্তর ‘হ্যাঁ’ হলে ফের ভাবতে বসুন।
নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে, ইনস্টাগ্রামের মতো বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে নানা ধরনের বিজ্ঞাপন সফলভাবে ‘সাধারণ কনটেন্ট’ সেজে লুকিয়ে থাকতে পারে, এমনকি যতটা আমরা বুঝতে পারি এই সংখ্যা তার চেয়েও বেশি।
এসব বিজ্ঞাপনের বেশিরভাগই এমনভাবে তৈরি হয়েছে যাতে সেগুলো দেখতে ব্যবহারকারীদের বন্ধু কিংবা তারা যেসব ইনফ্লুয়েন্সারকে অনুসরণ করেন তাদের সাধারণ পোস্টের মতোই দেখতে লাগে। এ বিষয়টিই এসব বিজ্ঞাপনকে চিনতে পারাকে কঠিন করে তুলছে।
স্ক্রল করার সময় ব্যবহারকারীরা আসলে বিজ্ঞাপন কীভাবে দেখেন বা অনুভব করেন, অর্থাৎ তারা কি সত্যিই বুঝতে পারেন কোনটা বিজ্ঞাপন না কি ভেবে নেন যে বুঝেছেন তা খতিয়ে দেখেছেন ‘ইউনিভার্সিটি অফ টুইন্টে’-এর একদল গবেষক।
এ গবেষণার প্রধান লেখক ড. মাইক হিউবনার বলেছেন, “আমরা অনেক সময় স্ক্রলিংয়ের সময় অটোপাইলট মুডে থাকি। মানে হচ্ছে, কেবল আমাদের হাত চলছে, চোখ দেখছে তবে মাথা সচেতনভাবে ভাবছে না। ঠিক এই সময়টাতেই বিজ্ঞাপনগুলো চুপিচুপি আমাদের চোখের সামনে দিয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করে চলে যায়।”
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি’তে।
হিউবনার বলেছেন, “কিছু বিজ্ঞাপন এমনভাবে তৈরি, যাতে সেগুলো আমাদের বন্ধুদের বলা ট্রেন্ড বা প্রোডাক্টের সঙ্গেই মিলে যায়। এ কারণেই সেগুলোকে প্রতিরোধ বা ঠেকানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে।”
এ গবেষণায় বিজ্ঞাপন ও সাধারণ পোস্টে ব্যবহারকারীরা কতক্ষণ নজর দেন, কোন অংশে বেশি ফোকাস করেন ও যখন তারা বুঝতে পারেন যে এটি বিজ্ঞাপন তখন তাদের চোখে মনে কীরকম প্রতিক্রিয়া থাকে তা খতিয়ে দেখেছেন গবেষকরা।
গবেষণার জন্য একশ ৫২ জন নিয়মিত ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীকে বেছে নিয়েছেন তারা এবং প্রতিজনকে তিনটি ভিন্ন ফেইক ইনস্টাগ্রাম ফিডের একটির সঙ্গে পরিচয় করানো হয়েছে, যেখানে প্রতিটি ফিডে ছিল মোট ২৯টি পোস্ট, যার মধ্যে ২১টি ছিল অরগানিক বা সাধারণ/নন-স্পনসর্ড পোস্ট ও ৮টি ছিল বিজ্ঞাপন।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বলা হয়েছে, যেন তারা এ ফিডটিকে নিজেদের ইনস্টাগ্রাম ফিড বলে কল্পনা করেন এবং যেমনভাবে তারা সাধারণত স্ক্রল করেন ঠিক সেভাবেই যেন এ অ্যাকাউন্টটিকেও স্ক্রল করেন।
গবেষকরা আই-ট্র্যাকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে পরিমাপ করেছেন ‘ফিক্সেশন’ বা কোনো পোস্টের নির্দিষ্ট অংশে কতবার অংশগ্রহণকারীদের চোখ পড়েছে ও ‘ডুয়েল টাইম’ বা সেই স্থানে চোখ কতক্ষণ ছিল।
গবেষণার ফলাফল বোঝার পদ্ধতি হচ্ছে যদি ডুয়েল টাইম কম হয়, তাহলে বোঝা যায় মানুষ কেবল দ্রুত একবার চোখ দিয়ে দেখেছে। আর যদি ডুয়েল টাইম বেশি হয় তাহলে সেখানে তারা মন দিয়ে নজর দিয়েছেন বলে ইঙ্গিত মেলে।
স্ক্রলিংয়ের পর অংশগ্রহণকারীরা কী কী বিষয় লক্ষ্য করেছিলেন তা জানতে তাদের সঙ্গে কথা বলেছিলেন গবেষকরা। তাদের কথার ভিত্তিতে, অনেকেই যখন স্পষ্টভাবে ‘অ্যাড’ বা ‘স্পন্সর্ড’ লেবেল দেখেছে তখন সেটিকে বিজ্ঞাপন হিসেবে চিনতে পেরেছেন তারা।
তবে আই-ট্র্যাকিং ডেটা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, মানুষ সাধারণত প্রথমে অন্য কিছু সংকেত বা ইঙ্গিত ধরেছে। যেমন– পোস্টের ছবি বা ভিডিওর ধরন, লেখার স্টাইল, কোনো বিশেষ পণ্যের উপস্থিতি বা পোস্টের সাধারণ পরিবেশ, যেগুলোকে স্পনসর্ড পোস্টের মতো মনে হয়।
তবে অনেকেই ‘এখনই কেনাকাটা করুন’ বাটন বা ‘সাইন-আপ’ লিংক দেখে বিজ্ঞাপন চিনতে পেরেছিলেন। আরও কিছু ইঙ্গিত অংশগ্রহণকারীদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলো। যেমন– ব্র্যান্ডের নামের উপস্থিতি, ভেরিফিকেশন ব্যাজ বা নীল টিক ও অত্যন্ত যত্নসহকারে তৈরি করা ঝকঝকে ছবি বা ভিডিও। অফিসিয়াল ‘অ্যাড’ বা ‘স্পন্সর্ড’ লেবেল দেখার আগেই অনেকে বুঝে ফেলেছেন সেটি বিজ্ঞাপন।
তবে সব বিজ্ঞাপনই এত সহজে শনাক্ত করা যায় না। যেসব পোস্ট স্বাভাবিক, সাধারণ অর্গানিক কনটেন্টের মতো দেখায় সেগুলো অনেক সময় চোখে পড়ে না। যখন অংশগ্রহণকারীরা ঐ স্বাভাবিক ইঙ্গিত বা চিহ্ন ধরতে পারেননি তখন এ ধরনের বিজ্ঞাপনগুলো সাধারণ পোস্টের মতোই সমান মাত্রায় তাদের আগ্রহ ও প্রতিক্রিয়া পেয়েছে।
মানে হচ্ছে, বিজ্ঞাপন যতটা স্বাভাবিক দেখতে লাগে ততটাই তার প্রভাব বেশি। কারণ ওই সময় ব্যবহারকারীরা মনে করেন সেটি কোনও প্রচার নয় তাই মনোযোগ দিয়ে দেখেন।
মানুষ যখন কোনো পোস্টকে বিজ্ঞাপন হিসেবে চিনতে পেরেছে তাদের আচরণ দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। অনেকেই তখন ওই পোস্টের সঙ্গে আগ্রহ দেখানো বন্ধ করে দিয়েছেন এবং তাদের চোখ সেখানে খুব কম সময় পর্যন্ত থেমেছে।
তবে কিছু অংশগ্রহণকারী স্বীকার করেছেন, তাদের জন্য যদি কোনো পোস্ট বিজ্ঞাপন বলে মনে হয় তাতে তারা খুব একটা মনোযোগ দেন না বা বিরক্ত হন না। আর এ ধরনের মানুষের সংখ্যা চিন্তার বিষয় হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন হিউবনার।
“কারণ আমরা যখন আর খেয়াল রাখি না বা ভাবি না যে এটা বিজ্ঞাপন তখন প্ররোচনা ও তথ্যের মধ্যে সীমানা খুবই অস্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে।”
গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, বিজ্ঞাপনে স্বচ্ছতা কেবল ‘স্পন্সর্ড’ বা ‘অ্যাড’ লেবেল দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আসলে এ বিষয়ে গভীর বোঝাপড়া তৈরি করা যে, মানুষ দৈনন্দিন স্ক্রলিংয়ের সময় আসলে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনকে কীভাবে গ্রহণ বা প্রসেস করে।
এ বোঝাপড়ার ভিত্তিতে বিভিন্ন সামাজিক প্ল্যাটফর্মকে তাদের কনটেন্ট ডিজাইন ও নিয়মনীতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। যাতে ব্যবহারকারীরা স্পষ্টভাবে জানতে পারেন কখন তাদের কাছে বিজ্ঞাপন চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
গবেষণাটি নিয়ন্ত্রিত এক ল্যাব পরিবেশে করা হয়েছে, যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে সিমুলেটেড ইনস্টাগ্রাম ফিড। গবেষকরা বলেছেন, বাস্তব জীবনের পরিস্থিতি ও বিভিন্ন সংস্কৃতি বা অন্যান্য সামাজিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ফলাফল ভিন্ন হতে পারে।
মাইক হিউবনার বলেছেন, ব্যক্তির নিজস্ব ফিডে কনটেন্ট তার আগ্রহ অনুসারে সাজানো থাকে এবং এখানে তাকে বেশি পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। ফলে সেখানকার বিজ্ঞাপনগুলো ধরা তার জন্য আরও কঠিন হতে পারে।