Published : 28 May 2026, 01:49 PM
চাঁদে স্থায়ী একটি ঘাঁটি নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে নাসা। এ বছরই শুরু হতে যাওয়া তিনটি মানবহীন চন্দ্র অভিযানের প্রথমটি পরিচালনার জন্য ইলন মাস্কের স্পেসএক্সকে না নিয়ে জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিন’কে বেছে নিয়েছে সংস্থাটি।
২০৩২ সালের মধ্যে চাঁদে মানুষের আধা-স্থায়ী উপস্থিতি নিশ্চিতের লক্ষ্য নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় মহাকাশ নীতির অংশ হিসেবে এ যৌথ অভিযান শুরু হতে যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান।
দুই হাজার কোটি ডলার ব্যয়ে চাঁদে একটি ঘাঁটি নির্মাণের কাজ শুরু করতে এ সিরিজের প্রথম অভিযানটি পরিচালনার জন্য অ্যামাজন প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিন’কে বেছে নিয়েছে নাসা।
ওয়াশিংটন ডিসিতে এক সংবাদ সম্মেলনে নাসা প্রধান জ্যারেড আইজ্যাকম্যান এ তথ্য জানান। চন্দ্র ঘাঁটিটি কীভাবে ও কখন তৈরি হবে সে বিষয়ে এটাই ছিল নাসার প্রথম ও প্রকাশ্য বিস্তারিত ব্যাখ্যা।
আইজ্যাকম্যান বলেন, ২০২৬ সালের জন্য পরিকল্পিত এ তিনটি মিশনের পর আগামী বছরগুলোতে ব্যবস্থা ও সরঞ্জাম পরীক্ষার জন্য আরও ‘ডজনেরও বেশি’ মিশন চালানো হবে।
গেল মাসে সফল হওয়া ‘আর্টেমিস টু’ মিশনটি ১৯৭২ সালের পর প্রথমবারের মতো চারজন নভোচারীকে চাঁদের কক্ষপথে ঘুরিয়ে এনেছে, যা তা চন্দ্র ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিতে বড় উদ্দীপক হিসেবে কাজ করেছে।
আইজ্যাকম্যান বলেন, “মানুষ আবারও আকাশ পানে তাকাচ্ছে, আবারও বড় কিছুতে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে এবং গভীর মনোযোগ দিচ্ছে। যেহেতু আমেরিকা আবারও চাঁদে যাচ্ছে এবং এবার সেখানে স্থায়ীভাবে থাকার জন্যই যাচ্ছে।”
কারও নাম উল্লেখ না করে তিনি আরও বলেছেন, গত ১০ এপ্রিল আর্টেমিসের সফল প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই নাসা এমন কিছু পক্ষের সঙ্গে ‘কঠিন আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যারা প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে’।
আইজ্যাকম্যান বলেছেন, “আমরা শুরুতেই সরাসরি কাঁচের তৈরি গম্বুজওয়ালা চন্দ্র ঘাঁটি নির্মাণে ঝাঁপিয়ে পড়ছি না। আমরা ধাপে ধাপে এগোনোর পরিকল্পনা করেছি; যার জন্য অনেক ল্যান্ডার, রোভার, প্রযুক্তিগত উদ্যোগ ও এসব মিশনে নেওয়া সম্ভব এমন সব বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম বা পেলোড তৈরির জন্য আমরা এ খাতের বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানকে আহ্বান জানাচ্ছি।
“আমরা ১৯৬০-এর দশকের নাসার ফর্মুলা কাজে লাগাচ্ছি; টিকে থাকার এই মহাকাব্যিক বিজ্ঞানে কোন জিনিসটা কাজ করছে আর কোনটা করছে না তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। কারণ চাঁদের এই ঘাঁটিটি যতটা সুন্দর, ঠিক ততটাই প্রতিকূল ও বিপজ্জনক।”
আইজ্যাকম্যানের এ ঘোষণার মূল আকর্ষণ হচ্ছে, আগামী শরতের শুরুতেই প্রথম মিশনটি পরিচালনার জন্য বেজোসের কোম্পানি ‘ব্লু অরিজিন’কে বেছে নেওয়া।
নাসা বলেছে, চন্দ্র ঘাঁটির প্রথম দুটি মিশনকে সহায়তা করতে কোম্পানিটিকে ২৩ কোটি ৪ লাখ ডলার দিয়েছে সংস্থাটি। তবে অভিযানের সিংহভাগ খরচ ব্লু অরিজিন নিজেই বহন করবে।
আইজ্যাকম্যান বলেছেন, “মুন্ বেইস ওয়ান হতে যাচ্ছে ইতিহাসের প্রথম বেসরকারি অর্থায়নে পরিচালিত লুনার ল্যান্ডার মিশন।”
এ অভিযানের মাধ্যমে ব্লু অরিজিনের ক্রায়োজেনিক জ্বালানিচালিত কার্গো ল্যান্ডার ‘এন্ডিওরেন্স’কে চাঁদের দক্ষিণ মেরুর ‘শ্যাকলটন ডি জেরলাচ রিজ’ নামের অঞ্চলে পাঠানো হবে। ল্যান্ডারটি নাসা ও বেসরকারি অংশীদারদের তৈরি বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম বহন করবে।
আইজ্যাকম্যান বলেছেন, এ অভিযানের উদ্দেশ্য ‘এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা বা পারদর্শিতা দেখানো, যা মানুষের চাঁদে অবতরণের বিভিন্ন মিশনের ঝুঁকি কমিয়ে আনবে’।
আর্টেমিস প্রোগ্রামে ব্লু অরিজিনের বিশেষ ভূমিকার কারণেই নাসা বেজোসের কোম্পানিকে এই কাজের জন্য বেছে নিয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন আইজ্যাকম্যান।
আসন্ন আর্টেমিস মিশনগুলোর জন্য নভোচারী বহনের ল্যান্ডার সরবরাহ করতে ব্লু অরিজিন ও ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্স একে অপরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে, যার মধ্যে ২০২৮ সালে ‘আর্টেমিস চার’ মিশনের মাধ্যমে চাঁদে মানুষের পুনর্যাত্রার পরিকল্পনাও রয়েছে।
আগামী বছর পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে ‘আর্টেমিস তিন’-এর পরীক্ষামূলক মিশন চলাকালীন নাসা স্পেসএক্স-এর ‘স্টারশিপ হিউম্যান ল্যান্ডিং সিস্টেম’ ও ব্লু অরিজিনের ‘ব্লু মুন’ ল্যান্ডার মূল্যায়ন করবে এবং তারপরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
বুধবার চালু হওয়া নাসার নতুন ‘মুনবেইস’ ওয়েবসাইটে চাঁদে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য খসড়া পরিকল্পনা প্রকাশ করেছে নাসা. যেখানে ২০২৯ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে ‘কার্যক্ষম সক্ষমতাওয়ালা’ ঘাঁটি গড়ে তোলার সময়সীমা নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। ২০৩২ বা তার পরবর্তী সময়ে চাঁদে এক ‘আধা-স্থায়ী উপস্থিতি’ তৈরি হবে।
এ চন্দ্র ঘাঁটি প্রকল্পটি ডনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় মহাকাশ নীতির একটি অংশ। যার মধ্যে রয়েছে, চীনের আগেই পরবর্তী মানববাহী চন্দ্র অভিযান সফল করতে নাসাকে আর্টেমিস প্রোগ্রাম আরও গতিশীল করার নির্দেশ দেওয়া, স্থায়ীভাবে বসবাসের উপযোগী চন্দ্র ঘাঁটি তৈরি এবং একটি নিউক্লিয়ার স্পেস রিঅ্যাক্টর বা পারমাণবিক মহাকাশ চুল্লি তৈরি করা।
নাসা বলেছে, বিবিণ্ন কোম্পানি সঙ্গে এ অংশীদারিত্ব মিশনের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে এবং সমৃদ্ধ এক মহাকাশ অর্থনীতি তৈরি করবে, যা বিজ্ঞান ও আবিষ্কারের অনুপ্রেরণামূলক মিশন পরিচালনার পাশাপাশি হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে।