Published : 16 May 2026, 11:52 AM
ওপেনএআইকে লাভজনক কোম্পানিতে রূপান্তর করে নিজেদের পকেট ভারী করার অভিযোগে স্যাম অল্টম্যান ও ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে ইলন মাস্কের করা আলোচিত মামলার বিচারকাজ এখন শেষের পথে।
ক্যালিফোর্নিয়ার ফেডারেল আদালতে সমাপনী যুক্তি উপস্থাপনকালে দুপক্ষের আইনজীবীরা একে অপরের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার, অহংকার ও সুবিধাজনক স্মৃতিভ্রমের তীব্র অভিযোগ তুলেছেন বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
বৃহস্পতিবার মাস্কের আইনজীবী ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তীব্র আক্রমণ করেন।
মাস্কের অভিযোগ, অলাভজনক কোম্পানি হিসেবে শুরু হওয়া ওপেনএআই’কে অল্টম্যান ও নেতৃস্থানীয় অন্যরা নিজেদের ধনী করার হাতিয়ারে পরিণত করেছেন। দাতব্য লক্ষ্যের অবমাননা ও অন্যায়ভাবে লাভবান হওয়ার অভিযোগে মাস্ক এ মামলাটি করেছেন।
পাল্টা জবাবে ওপেনএআইয়ের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী এ ব্যক্তি মামলা করতে অনেক দেরি করে ফেলেছেন। মাস্কের দাবি, মানবজাতির কল্যাণে নিরাপদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই তৈরির যে মূল চুক্তি ছিল ওপেনএআই তা ভেঙেছে।
তবে ওপেনএআইয়ের আইনজীবীরা বলছেন, কোম্পানিটির সাফল্যে মাস্কের অবদান অপরিহার্য ছিল– এমন দাবির কোনো সুযোগ নেই।
ওপেনএআইয়ের আইনজীবী উইলিয়াম স্যাভিট ব্যঙ্গর সুরে বলেছেন, “অন্যান্য ক্ষেত্রে মাস্কের হাত কোনোকিছু ছুঁলেই তা সোনা হয়ে যেতে পারে। তবে এআইয়ের ক্ষেত্রে এমনটি নয়। এআইতে সফল হওয়ার জন্য মাস্ক এখন কেবল আদালতের শরণাপন্নই হতে পারেন।”
মাস্ক তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন, তাকে ফুসলিয়ে বা কৌশলে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার নিয়েছে ওপেনএআই। পাশাপাশি তার অজান্তেই মূল অলাভজনক কাঠামোর সঙ্গে লাভজনক ব্যবসা জুড়ে দেওয়া এবং কোম্পানির পরিধি বাড়াতে মাইক্রোসফটসহ অন্যান্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি ডলার নিয়েছে তারা।
ক্ষতির মুখে পড়ায় ওপেনএআই ও মাইক্রোসফটের কাছ থেকে প্রায় ১৫ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন মাস্ক, যা মূলত ওপেনএআইয়ের অলাভজনক শাখাকে দেওয়া হবে। পাশাপাশি তিনি অল্টম্যান ও ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যানকে তাদের পদ থেকে অপসারণেরও দাবি জানিয়েছেন।
অল্টম্যান ‘মিথ্যেবাদী ও অহংকারী’
মামলার সমাপনী যুক্তিতে মাস্কের আইনজীবী স্টিভেন মোলো জুরিদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, মাস্ক, ওপেনএআইয়ের সাবেক বোর্ড সদস্য ও সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী ইলায়া সুটস্কেভারসহ মোট পাঁচজন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যেখানে তারা বলেছেন, অল্টম্যান একজন মিথ্যেবাদী।
মোলো বলেছেন, মঙ্গলবার জেরার সময় অল্টম্যানকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি সম্পূর্ণ বিশ্বস্ত কি না ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছেন কি না তখন তিনি স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ বলতে পারেননি।
“এ মামলায় অল্টম্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা সরাসরি জড়িত। আপনারা যদি তাকে বিশ্বাস না করেন তবে মামলায় ওপেনএআই জিততে পারবে না।”
অলাভজনক কোম্পানির ক্ষতি করে নিজেদের ভেতরের মানুষ ও বিনিয়োগকারীদের অন্যায়ভাবে ধনী করার এবং এআই সুরক্ষা ব্যবস্থাকে প্রাধান্য না দেওয়ার জন্য ওপেনএআই’কে অভিযুক্ত করেন মোলো।
ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যানের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। ব্রকম্যান নিজেই জানিয়েছিলেন, ওপেনএআই’তে তার নিজের শেয়ারের মূল্য প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলার।
এ প্রসঙ্গে মাস্কের আইনজীবী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, “তাদের এ অহংকার, কাণ্ডজ্ঞানহীনতা ও ন্যূনতম সৌজন্যবোধের অভাব সত্যিই জঘন্য।”
মাস্কের পক্ষ থেকে মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধেও ওপেনএআইয়ের এ অন্যায় কাজে উস্কানি ও সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মাইক্রোসফট ২০১৯ সালে ওপেনএআই’তে ১০০ কোটি ডলার ও ২০২৩ সালে ১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।
আইনজীবী মোলো বলেছেন, “ওপেনএআই প্রতিটি পদক্ষেপে কী করছিল তার সবটাই মাইক্রোসফট জানত।”

মাস্কের এখন ‘স্মৃতিভ্রম’ হয়েছে
ওপেনএআইওয়ের পক্ষে আরেক আইনজীবী সারাহ এডি তার সমাপনী যুক্তিতে মাস্ক ও তার আইনি দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, মাস্কের দল কেবল ‘আকর্ষণীয় স্লোগান এবং অপ্রাসঙ্গিক ও মিথ্যা অভিযোগের’ ওপর ভর করে মামলাটি জিততে চাইছে।
সারাহ এডি বলেছেন, ২০১৭ সালের মধ্যেই ওপেনএআইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রত্যেকে, এমনকি মাস্ক নিজেও তখন বোর্ডের সদস্য ছিলেন, তিনি খুব ভালো করেই জানতেন, ওপেনএআই একটি অলাভজনক কোম্পানি হিসেবে তহবিল সংগ্রহ করে বড় লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে না। এজন্য আরও বেশি অর্থের প্রয়োজন।
“মাস্ক নিজেও ওপেনএআই’কে লাভজনক কোম্পানিতে রূপান্তর করতে চেয়েছিলেন, যাতে এর পুরো নিয়ন্ত্রণ তার নিজের হাতে থাকে। তবে অন্য প্রতিষ্ঠাতারা ‘আর্টিফিশিয়াল জেনারেল ইন্টেলিজেন্স’ বা এজিআইয়ের চাবিকাঠি একক কোনো ব্যক্তির হাতে, বিশেষ করে মাস্কের হাতে তুলে দিতে রাজি হননি।”
সারাহ এডি আরও বলেছেন, মাস্ক যদি সত্যিই বিশ্বাস করতেন, এআই কেবল মানবজাতির কল্যাণের জন্য হওয়া উচিত তবে তিনি ওপেনএআই’কে তার বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বা ইভি নির্মাতা কোম্পানি টেসলা’র সঙ্গে একীভূত করতে জোর দিতেন না। ওপেনএআইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজের গড়ে তোলা ‘এক্সএআই’কে সম্পূর্ণ লাভজনক কোম্পানি হিসাবেও তৈরি করতেন না।
যে কোনো মামলার জন্য মাস্কের হাতে তিন বছরের নির্দিষ্ট সময়সীমা ছিল। ওপেনএআইয়ের আইনজীবীদের দাবি, মাস্ক ২০২৪ সালের অগাস্টে মামলাটি করে অনেক দেরি করে ফেলেছেন। কারণ কোম্পানিুটির ব্যবসার পরিধি বাড়ানোর এ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি আরও কয়েক বছর আগেই জানতেন।
আইনজীবী সারাহ এডি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, মাস্কের মতো একজন মানুষ কীভাবে দাবি করেন যে, ২০১৮ সালে ওপেনএআইয়ের বাইরে থেকে বিনিয়োগ নেওয়ার চার পৃষ্ঠার চুক্তির খসড়া তিনি পড়েননি!
“বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম চতুর ও দূরদর্শী একজন ব্যবসায়ী এভাবে উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে বাস্তবতা এড়িয়ে বসে থাকতে পারেন না।”
অপর আইনজীবী উইলিয়াম স্যাভিট মাস্কের এ আচরণকে তার ‘সুবিধাজনক স্মৃতিভ্রম’ বলে কটাক্ষ করেন।
এদিকে, মাইক্রোসফটের আইনজীবী রাসেল কোহেন তার সমাপনী বক্তব্যে বলেছেন, মাইক্রোসফট এ মামলার মূল বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত ছিল না এবং তারা ‘প্রতিটি পদক্ষেপে কেবল দায়িত্বশীল সহযোগী হিসেবে’ কাজ করেছে।
আদালতে সমাপনী যুক্তি উপস্থাপনের সময় অল্টম্যান ও ব্রকম্যান উপস্থিত ছিলেন। তবে ইলন মাস্ক সে সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চীন সফরে থাকায় আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
এআই নিয়ে জনমনে উদ্বেগ
সমাজে এআইয়ের প্রভাব যেভাবে দিন দিন বাড়ছে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগের মধ্যেই এ মামলার বিচারকাজ চলছে।
বর্তমানে মানুষ ফেইশল রিকগনিশন, আর্থিক পরামর্শ, সাংবাদিকতা, চিকিৎসাক্ষেত্রে রোগ নির্ণয় থেকে শুরু করে ক্ষতিকর ডিপফেইক’ তৈরির মতো অগণিত কাজে এআই ব্যবহার করছে।
তবে অনেকেই এ প্রযুক্তির ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। পাশাপাশি এআই মানুষের চাকরি কেড়ে নিতে পারে বলেও অনেকে আশঙ্কা করছেন।
৯ সদস্যের জুরি বোর্ড সোমবার এ বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনায় বসবে। মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট জাজ ইভন গঞ্জালেজ রজার্স ও মামলার আইনজীবীরা ওই দিনই আবার আদালতে হাজির হবেন।
মাস্ক মামলায় জিতলে ওপেনএআই’কে কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে এবং কী পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে তা নিয়ে আলোচনা হবে। তবে মাস্ক হেরে গেলে কোনো প্রতিকার বা ক্ষতিপূরণ মিলবে না।
বর্তমানে অ্যানথ্রপিক ও এক্সএআইয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় বিভিন্ন এআই কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে ওপেনএআই। একইসঙ্গে তারা বাজারে প্রথম শেয়ার বা আইপিও ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক মূল্য দাঁড়াতে পারে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারে।
আদালতের সাক্ষ্য অনুসারে, মাইক্রোসফট এ পর্যন্ত ওপেনএআইয়ের সঙ্গে তাদের অংশীদারিত্বে ১০ হাজার কোটি ডলারের বেশি দিয়েছে।
অন্যদিকে, মাস্কের নিজস্ব এআই স্টার্টআপ ‘এক্সএআই’ এখন তার রকেট ও মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্সের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত, যা নিজেরাও বাজারে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইপিও ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।