Published : 07 May 2026, 04:01 PM
ইলন মাস্কের শুক্রাণু দানের প্রস্তাব ও তার সঙ্গে নিজের ব্যতিক্রমী ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে মুখ খুলেছেন চ্যাটজিপিটির নির্মাতা কোম্পানি ওপেনএআইয়ের সাবেক এক বোর্ড সদস্য।
সম্প্রতি এক মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ওপেনএআইয়ের সাবেক বোর্ড সদস্য শিভন জিলিস বলেছেন, কোনো রোমান্টিক সম্পর্ক ছাড়াই কেবল মাস্কের প্রস্তাবে রাজি হয়েই তিনি তার চার সন্তানের মা হয়েছেন। স্বাস্থ্যগত সমস্যা ও মাস্কের উৎসাহেই তিনি চিরাচরিত বিয়ের পথের বদলে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেছেন, মাস্কের সঙ্গে তার সেই অন্যরকম ব্যক্তিগত সম্পর্কটি কীভাবে সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত হয়েছে এবং কীভাবে তারা চার সন্তানের মা-বাবা হয়েছেন।
বিবিসি লিখেছে, ওপেনআইকে মুনাফাভোগী কোম্পানিতে রূপান্তরের বিরুদ্ধে মাস্ক একটি মামলা করেছেন। সেই মামলার অংশ হিসেবে বুধবার ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের ফেডারেল আদালতে কয়েক ঘণ্টা ধরে সাক্ষ্য দিয়েছেন শিভন জিলিস।
আদালতে জিলিসের উপস্থিতির মূল কারণ, ওপেনআইকে মুনাফাভোগী করার বিষয়ে মাস্কের সঙ্গে তার শুরুর দিকের সরাসরি সম্পৃক্ততা। পাশাপাশি, ওপেনআইতে পরামর্শক হিসেবে কাজের সময় তিনি কীভাবে মাস্কের হয়ে কাজ শুরু করেন এবং তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে জড়িয়ে পড়েন সেসব বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
আদালতে জিলিস বলেছেন, “আমি খুব করে মা হতে চেয়েছিলাম। ঠিক সেই সময়েই মাস্ক আমাকে প্রস্তাব দেন এবং আমি তাতে রাজি হই।”
২০২০ সালে মাস্ক তাকে শুক্রাণু দানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
“সেই সময়ে মাস্ক তার আশপাশের সবাইকে সন্তান নিতে উৎসাহিত করছিলেন এবং মাস্ক খেয়াল করেছিলেন, আমার কোনো সন্তান নেই। ফলে তিনি নিজে থেকেই এ প্রস্তাব দিয়েছিলেন।”
জিলিস ১৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে সিলিকন ভ্যালিতে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। তিনি মাস্কের গাড়ি নির্মাতা কোম্পানি টেসলা ও নিউরোটেকনোলজি কোম্পানি নিউরালিংক-এ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০১৬ সালে ওপেনআই প্রতিষ্ঠার অল্প সময় পরেই তিনি সেখানে পরামর্শক হিসেবে যোগ দেন। বুধবারের সাক্ষ্যে তিনি বলেছেন, এ পদের মাধ্যমেই মাস্কের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয়।
মাস্কের বিভিন্ন কোম্পানি ও ওপেনআই’তে জিলিসের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, বিশেষ করে ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ওপেনআইয়ের পরিচালক থাকা তাকে এ মামলার একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী করে তুলেছে।
ওপেনআইয়ের আইনজীবীদের অভিযোগ, ২০১৮ সালে মাস্ক যখন নিজের প্রতিষ্ঠিত ওপেনএআই ছেড়ে চলে যান তখন জিলিস ওপেনআইয়ের গোপন তথ্য মাস্কের কাছে পাচার করতেন।
জিলিস বলেছেন, প্রায় এক দশক আগে মাস্কের সঙ্গে তার একবার প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। তবে ২০২০ সালে মাস্ক যখন তাকে শুক্রাণু দানের মাধ্যমে সন্তান নেওয়ার প্রস্তাব দেন তখন তাদের মধ্যে কোনো রোমান্টিক সম্পর্ক ছিল না।
তিনি বেশ কিছু স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগছিলেন। এ কারণে জিলিসের একসময়ের চিরাচরিত পরিকল্পনা, অর্থাৎ বিয়ে করা ও জীবনসঙ্গীর সঙ্গে সন্তান লালন-পালনের ভাবনায় পরিবর্তন আসে।
মাস্কের মাধ্যমে হওয়া তার প্রথম দুই সন্তানের জীবনে মাস্কের ভূমিকা ঠিক একজন সক্রিয় বাবার মতো হবে, শুরুতে জিলিসের পরিকল্পনা এমনটা ছিল না। তাদের মধ্যে এমন চুক্তিও হয়েছিল যে, মাস্কই এ সন্তানদের বাবা তা ‘পুরোপুরি গোপন’ রাখা হবে।
জিলিস আরও বলেছেন, বর্তমানে মাস্ক তার এই চার সন্তানের জীবনেই বেশ সক্রিয়। তারা প্রতি সপ্তাহে পরিবার হিসেবে একসঙ্গে কয়েক ঘণ্টা সময় কাটান।
জিলিসের ভাষ্যমতে, মাস্কের সঙ্গে প্রাইভেসি চুক্তি থাকার কারণেই তিনি ওপেনআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানকে ২০২১ সালে যমজ সন্তান হওয়ার বিষয়টি জানাননি।
তবে তার পরের বছর যখন তিনি জানতে পারেন বিজনেস ইনসাইডার মাস্কের বাবা হওয়ার খবরটি প্রকাশ করতে যাচ্ছে, তখনই তিনি স্যাম অল্টম্যানকে আসল সত্যটি জানান।
এরপরও অল্টম্যান ও ওপেনআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান জিলিসকে কোম্পানির বোর্ডে রাখতে চেয়েছিলেন। বুধবার জিলিস বলেছেন, অন্তত ২০২৩ সাল পর্যন্ত তাদের তিনজনের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।
মাস্ক কোম্পানি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে ওপেনআই’তে জিলিসের সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ব্রকম্যান এ সপ্তাহের শুরুতে বলেছেন, “আমরা বিশ্বাস করেছিলাম, তিনি মাস্কের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন।”
২০২৩ সালের মার্চে ওপেনএআইয়ের বোর্ড থেকে পদত্যাগ করেন জিলিস। ঠিক সেই সময়েই মাস্ক তার নতুন এআই কোম্পানি এক্সএআই চালু করছিলেন, যা সরাসরি ওপেনআইয়ের এআই চ্যাটবট চ্যাটজিপিটি’র সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য তৈরি।
জিলিস, অল্টম্যান, ব্রকম্যান ও মাস্কের মধ্যে দীর্ঘ বছরের ইমেইল ও টেক্সট মেসেজগুলো এখন এ মামলার অংশ। ওপেনআইয়ের আইনজীবীরা এ আলোচনার সূত্র ধরে এমন বেশ কিছু উদাহরণ তুলে ধরেছেন, যেখানে এ এআই কোম্পানিটির করপোরেট কাঠামো পরিবর্তনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছিল।
আদালতে উপস্থাপিত নথিপত্র অনুসারে, ২০১৭ সালের শুরুতেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, ওপেনআইয়ের প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহের জন্য এর অলাভজনক কাঠামো পরিবর্তন করা প্রয়োজন। এ আলোচনায় মাস্ক নিজেও জড়িয়ে ছিলেন।
ব্রকম্যান ও ওপেনআইয়ের আরেক সহ-প্রতিষ্ঠাতা ইলায়া সুটস্কেভার কোম্পানিটিকে একটি ‘বি করপোরেশন’-এ রূপান্তরের পক্ষে ছিলেন।
বি করপোরেশন’ এক ধরনের ব্যবসায়িক কোম্পানি, যা মুনাফার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কোনো সামাজিক বা মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করে।
জিলিসের ইমেইল থেকে জানা গেছে, মাস্ক ওপেনআইয়ের ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিলেন। এজন্য তিনি বোর্ডে অতিরিক্ত সদস্যপদ দাবি করেন এবং ওপেনআই’কে টেসলার অংশ, সম্ভবত টেসলার অধীনে একটি বি করপোরেশন সহযোগী কোম্পানি করার প্রস্তাব দেন।
জিলিস এক লিখিত বার্তায় উল্লেখ করেছিলেন, ওপেনআইয়ের জন্য এমন পদক্ষেপ নেওয়া হলে তা ‘তহবিল সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করবে’।
শেষ পর্যন্ত অল্টম্যান, ব্রকম্যান ও সুটস্কেভার মাস্কের প্রস্তাবিত শর্তে রাজি হননি।
আদালতে দেখানো জিলিসের ইমেইল অনুসারে, এর প্রধান কারণ ছিল, তারা জেদ ধরেছিলেন, ওপেনআইয়ের কাজের ওপর মাস্কের কোনো ‘নিয়ন্ত্রণ থাকবে না’।