Published : 23 Aug 2025, 08:23 AM
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-রাকসু নির্বাচনের জন্য তফসিল ঘোষণা করা হলেও ‘নানা কারণে এ নিয়ে অনিশ্চিয়তা তৈরি’ হচ্ছে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
তারা বলছেন, পোষ্য কোটা বাস্তবায়নের দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা-করমচারীদের কর্মবিরতি; মনোনয়নপত্র বিতরণ পেছানোয় নির্বাচনি সময় কমে যাওয়া, ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর নানা দাবি এবং সবশেষ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পিএসসির সদস্য পদে নিয়োগের কারণে এই ‘আশঙ্কা’ হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে নির্ধারিত সময়ে আদৌ ভোট হবে কি-না?
২৮ জুলাই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। পরে ১২ অগাস্ট কয়েকটি সংশোধনী এনে পুনর্বিন্যস্ত তফসিল ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০ অগাস্ট নির্বাচন কমিশনের জরুরি বৈঠকে আবারও কয়েকটি তারিখ পরিবর্তন করা হয়।
জরুরি বৈঠকে মনোনয়নপত্র বিতরণের তারিখ ২০-২৩ অগাস্ট থেকে পিছিয়ে ২৪ থেকে ২৬ অগাস্ট করা হয়।মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় নির্ধারণ করা হয় ২৭ ও ২৮ অগাস্ট। বাছাই প্রক্রিয়া চলবে ৩১ অগাস্ট ও ১ সেপ্টেম্বর।
নতুন সূচি অনুযায়ী, প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ হবে ২ সেপ্টেম্বর। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ৩ সেপ্টেম্বর। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হবে ৪ সেপ্টেম্বর।
তবে ভোটের তারিখ ১৫ সেপ্টেম্বর অপরিবর্তিত রয়েছে। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি আবাসিক হলে ভোটগ্রহণ হবে। ফলাফল ঘোষণা করা হবে সেদিনই।
১৭টি আবাসিক হলের আবাসিক ও অনাবাসিক মিলে রাকসুর চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় মোট ভোটার ২৪ হাজার ৮৯২ জন। যার মধ্যে ছাত্র ১৫ হাজার ১৫১ জন এবং ছাত্রী ৯ হাজার ৭৪১ জন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তিন বছর পর প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৫৬-৫৭ সালে। সেই সময় এই সংসদের নাম ছিল ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (রাকসু)।
১৯৬২ সালে ‘কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ’ নামে যাত্রা শুরু করে। এরপর রাকসু নির্বাচন হয়েছে ১৬ বার। সবশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৮৯ সালে।
‘পোষ্য কোটার’ আন্দোলন
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারও আলোচনায় এসেছে ‘পোষ্য কোটা’। ‘প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা’ উল্লেখ করে তা পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ অবস্থান ধর্মঘট পালন করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক ছাড়াও অনুষদ অধিকর্তা, সিন্ডিকেট সদস্য এবং নির্বাচন কমিশন সদস্যরাও এতে যুক্ত হয়েছেন। সংহতি জানিয়েছেন অনেকেই। এ অবস্থায় ভোটের তারিখ নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘অনিশ্চয়তা’।
আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম বলেছেন, “আমরা প্রশাসনকে আল্টিমেটাম দিয়েছি। দাবি না মানলে রোববার (২৪ অগাস্ট) থেকে লাগাতার কর্মসূচি পালন করা হবে।”
এ ব্যাপারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক আমজাদ হোসেন বলেন, “পোষ্য কোটা আন্দোলনের কারণে প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। আমাদের প্রস্তুতি থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে ত্রুটি দেখা দেয়, ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিলম্বিত হচ্ছে।”
শঙ্কা প্রকাশ করেছেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাঈন উদ্দিনও। তিনি বলেন, “রাকসু নির্বাচনে তিন শতাধিক শিক্ষক এবং সার্বিক তদারকির জন্য কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রয়োজন। তারা যদি নির্বাচনি কাজে সহযোগিতা না করে তাহলে সঠিক সময়ে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হবে না। তবে আমরা এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা করছি।”
ছাত্র সংগঠনগুলোর দাবি-দাওয়া
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল অধিকাংশ ছাত্র সংগঠনের দাবি-দাওয়ার যথাযথ মূল্যায়ন করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন নেতারা। তাদের দাবি, প্রশাসন নামমাত্র তাদের সঙ্গে বসলেও রাকসু গঠনতন্ত্রে কোনো পরিবর্তন আসেনি। প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশন তাদের উপরে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছে।
বড় ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্রদল নির্বাচন নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ নেই, ক্লাস-পরীক্ষা নিয়মিত হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের আয়োজন অর্থহীন।
গণঅভ্যুত্থান বিরোধী আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের বিচার, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন পদে সংস্কার এবং গঠনতন্ত্র সংস্কার করে নতুন তফসিল ঘোষণার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সব রাজনৈতিক সংগঠনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে। ডাকসুর মত আলোচনা করে নির্বাচন আয়োজন করা উচিত ছিল।
“ফ্যাসিস্ট শিক্ষকদের বিচারের আগে এই নির্বাচনের কোনো অর্থ নেই। অতি দ্রুত সবার সঙ্গে আলোচনা করে প্রশাসনকে নতুন তফসিল ঘোষণা করতে হবে।”
নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে। অধিকাংশ ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ভোটকেন্দ্র আবাসিক হল থেকে একাডেমিক ভবনে স্থানান্তরের দাবি তুলেছেন।
ভোটকেন্দ্র স্থানান্তরসহ তিন দাবিতে গত ১৪ অগাস্ট বাম সংগঠনগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট’, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ছাত্র ফেডারেশন, সাবেক সমন্বয়ক এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রশাসন ভবনের সামনে আমরণ গণঅনশন শুরু করেন।
ছাত্রদল এবং ইসলামি ছাত্র আন্দোলন এতে সংহতি জানায়। কমিশনের আশ্বাসে তারা অনশন সাময়িক স্থগিত করলেও দাবি বাস্তবায়ন না হলে পুনরায় কর্মসূচি এবং সবশেষে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানিয়েছেন।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, “আমাদের আশ্বাস দেওয়া হলেও আজ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। আমরা শিগগিরই কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করব।”
ছাত্র অধিকার পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, “ভোটকেন্দ্র আবাসিক হলের পরিবর্তে একাডেমিক ভবনে করা না হলে আমরা অধিকাংশ ছাত্রসংগঠন নির্বাচন বর্জন করব।”
নির্বাচনি সময় কমে যাওয়া
পূর্বঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র বিতরণ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ পর্যন্ত সময় ছিল ১৫ দিন। তবে গত ২০ অগাস্ট মনোনয়ন বিতরণের তারিখ স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন।
পরবর্তীতে জরুরি বৈঠকে মনোনয়ন বিতরণ চার দিন পেছানো হয়। এতে সময় কমে দাঁড়ায় ১১ দিনে।
শিক্ষার্থী এবং প্রার্থীদের দাবি, এটি নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় হেরফের তৈরি করবে। নির্বাচন কমিশন মনোনয়ন বাছাইয়ের মত একটি বিষয়ে সময় কমিয়ে দেওয়ায় তা নির্বাচনি স্বচ্ছতার জন্য বাধা হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।
ছাত্র অধিকার পরিষদের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, “নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের মাঝে সমন্বয়হীনতা এখন প্রকাশ্য দেখা যাচ্ছে। আমরা জানি না, কোন অদৃশ্য শক্তির চাপে তারা নির্বাচনি সময় ১৫ দিন থেকে কমিয়ে ১১ দিনে নিয়ে আসলো। এখন আমাদের সংশয় হচ্ছে যে, তারা আসলেই যথাযথ একটা নির্বাচন দিতে পারবেন কি-না!”
প্রার্থীদের প্রচারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “চার দিন সময় একটা নির্বাচনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের যারা প্রার্থী আছেন তারা এই সময়টা কাজে লাগাতে পারতেন। আমার মনে হচ্ছে, প্রশাসন নামমাত্র একটি দায়সারা নির্বাচন দিতে চাচ্ছে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সম্ভাব্য প্রার্থী বলেন, “একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী মনোনয়নপত্র বিতরণের তারিখ পেছানো হয়েছে। মনোনয়নপত্র বিতরণ ও ভোটের মাঝে সময় যত সংক্ষিপ্ত হবে, নির্দিষ্ট ওই গোষ্ঠী তাতে বেশি লাভবান হবে। টাকা ছড়ানোসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতির ঝুঁকিও বাড়ছে। বেশিরভাগ প্রার্থী ভোটের মাঠের পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই খেলা শেষ হয়ে যাবে।”
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পিএসসিতে দায়িত্ব
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পিএসসি সদস্য হিসেবে দায়িত্বের বিষয়টি। ২০ অগাস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে রাকসু নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক এম আমজাদ হোসেনকে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সদস্য পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে নির্বাচনের অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী সাংবিধানিক পদ পিএসসির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব নিলে তিনি অন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে থাকতে পারবেন না। তাই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ ঘিরে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি নির্বাচন নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক আমজাদ হোসেন বলেন, “আমি গণমাধ্যম থেকেই নিয়োগের খবর জেনেছি। করণীয় বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করব।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতেখারুল আলম মাসউদ বলেন, “উনি শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার থাকবেন। কবে যোগদান করবেন, তা স্পষ্ট নয়। প্রশাসন এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবে।”
তবে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মাঈন উদ্দিন বলেন, “আমরা আশাবাদী, নির্ধারিত সময়েই রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান নির্বাচন কমিশন পিএসসিতে যোগদান করলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নতুন কাউকে নিয়োগ দেবে।”
আরও পড়ুন:
রাকসু নির্বাচন: 'অংশগ্রহণমূলক' নাকি 'বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতার' পুনরা
রাকসু নির্বাচন: 'অনিবার্য কারণে' মনোনয়নপত্র বিতরণ স্থগিত
রাকসু নির্বাচন: চূড়ান্ত তালিকায় ভোটার ২৪ হাজার ৮৯২ জন
রাকসু নির্বাচন: সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ১০ প্রস্তাব