Published : 17 Aug 2025, 02:47 PM
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-রাকসু নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা হয়েছে। তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৫ সেপ্টেম্বর ভোট গ্রহণের কথা রয়েছে। নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি নিচ্ছে সংগঠনগুলো। তবে এতকিছুর মধ্যেও রয়েছে শঙ্কা।
নির্বাচন কমিশন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অনেক সিদ্ধান্ত সংগঠনগুলোর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর এতেই প্রশ্ন উঠেছে রাকসুও কি তবে রুয়া নির্বাচনের দিকে আগাচ্ছে?
গত ২৬ জুলাই প্রথমবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন-রুয়ার কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনে জামায়াতপন্থিরা অংশ গ্রহণ করলেও বিএনপিপন্থিরা ভোট বর্জন করেছিলেন।
নির্বাচনে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ ও সংরক্ষিত নারী সদস্যসহ মোট ২৭টি পদে প্রার্থীরা বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। যে ২৪টিতে ভোট হয়েছে, তার ২৩টিতেই জামায়াতপন্থিরা জয় পায়।
সেই সময় বিএনপিপন্থি সদস্যরা অভিযোগ করেন, নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়ায় রুয়ার গঠনতন্ত্র ‘লঙ্ঘন’ করা হয়েছে। ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে’ নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্ত এবং পুরোনো সদস্যদের বাদ দিয়ে ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে।
বর্তমানে ক্যাম্পাসে বড় সংগঠনগুলোর মধ্যে ছাত্রশিবির জোটবদ্ধ প্যানেলের পাশাপাশি একক প্যানেলের কথা শোনা গেছে। তবে ছাত্রদল বলছে, নির্বাচন কমিশন সংস্কার না হলে ভোটে যাবেন না তারা।
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ইসলামি ছাত্র আন্দোলন, বাম সংগঠনগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট’, নতুন আত্মপ্রকাশ করা ইউএসডিএফ, রাবি রেঁনেসা, ব্যাকবেঞ্চার, বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের আলাদা আলাদা প্যানেল হতে পারে বলে জানা গেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মুজাহিদ ফয়সাল বলেন, “আমরা একক প্যানেলের কথাই ভাবছি। তবে পরিস্থিতি বুঝে জোট করে প্যানেলে যাওয়ার পরিকল্পনাও আছে। কিন্তু এ বিষয়ে এখনো কারও সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি।”
শিবির ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ একটি জোট গঠনের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। তবে ‘ছায়া প্যানেল’ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অনেকে সমালোচনা করলেও ছাত্রশিবিরের ‘ছায়া প্যানেলের’ অস্তিত্ব নেই। আমরা এমন কোনো প্যানেলের কথা ভাবছিও না।”
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, “আমরা এরই মধ্যে কয়েকটি দাবি জানিয়েছি। প্রশাসন যদি দাবি না মানে তাহলে গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাব। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনে যাওয়ার সুযোগ নেই।
“নির্বাচন কমিশনে এমন অনেকেই রয়েছেন, যারা অতীতে বিভিন্ন রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। কোষাধ্যক্ষের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে সাবেক শিবির নেতাকে বসানো হয়েছে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পরিবেশ নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করতে পারেনি।”
তিনি বলেন, “শিবির কমিশনকে জিম্মি করে রাকসু তফসিল আদায় করে নিয়েছে। নির্বাচন কমিশন ছাত্রদলসহ বাংলাদেশপন্থি কোনো সংগঠনের সঙ্গেই আলোচনা করেনি। তাই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা নির্বাচনে যাব না; প্রয়োজনে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।”
অন্য ছাত্র সংগঠনগুলোও নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের অন্যতম অংশীদার বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের (একাংশ) সভাপতি রাকিব হোসেন বলেন, “বামমনা ছাত্রসংগঠনগুলো নিয়ে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট প্যানেল ঘোষণা করবে। পাশাপাশি আমরা আরও কয়েকটি ছাত্র সংগঠন, আদিবাসী সংগঠন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে কথা বলছি।
“এর মধ্যে অনেকেই আমাদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। আমাদের বিশ্বাস, আমরা একটি বৃহত্তর জোটের দিকে এগোচ্ছি। অন্তত সাত থেকে আটটি ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা প্রথমে আন্দোলনকেন্দ্রিক জোট হিসেবে শুরু হয়ে পরবর্তীতে নির্বাচনকেন্দ্রিক জোটে রূপ নিতে পারে।”
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক সমন্বয়ক মেহেদী সজীব বলেন, “জুলাই-অগাস্টে যারা আন্দোলনে ছিলেন, পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে জোট করে প্যানেল ঘোষণার পরিকল্পনা করছি।
“আর যারা হলে নির্বাচন করতে ইচ্ছুক তাদের নিয়ে হল প্যানেল গোছানোর প্রক্রিয়া চলছে। চলতি সপ্তাহে প্যানেল ঘোষণার কথা আছে, না হলে আগামী সপ্তাহে ঘোষণা করা হবে।”
এদিকে নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র আবাসিক হলের পরিবর্তে একাডেমিক ভবনে করার দাবি জানিয়েছে গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট, ছাত্র ফেডারেশন, ছাত্র অধিকার পরিষদ, ইসলামি ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্রদলসহ বেশিরভাগ ছাত্র সংগঠন।

বৃহস্পতিবার এ দাবিতে গণঅনশনের ডাক দিয়েছিল কয়েকটি ছাত্রসংগঠন। গণঅনশনে বেশ কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থীও অংশ নেন। পরে নির্বাচন কমিশনারের আশ্বাসে অনশন প্রত্যাহার করলেও দাবি না মানলে রোববার থেকে কর্মসূচির ঘোষণা দেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, “লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে উদ্বেগ জানালেও কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বরং শিক্ষার্থীদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। প্রশাসন বরাবরই একটি গোষ্ঠীকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে, যা রাকসু নির্বাচনের পরিবেশকে বিঘ্নিত করবে।”
নির্বাচন নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীর মাঝেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ মনে করছেন- রাকসু হলে সমস্যার সমাধানে নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে, আবার কেউ শঙ্কা করছেন নতুন করে অস্থিরতা ও সংঘাতের।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চাওয়া সাবেক সমন্বয়ক আকিল বিন তালেব বলেন, “যদিও রাকসুর মেয়াদ মাত্র এক বছর, তবুও এটি সচল রাখা গেলে এবং প্রতিবছর নিয়মিত নির্বাচন হলে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে।”
তিনি বলেন, “কিছু রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছে, দাবি মানা না হলে যেকোনো উপায়ে নির্বাচন ঠেকাবে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, ক্ষমতাশালী মহল মাঝে মাঝে এ ধরনের নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা করেন। এসব প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলায় সাধারণ শিক্ষার্থী ও প্রশাসনের ঐক্য জরুরি।”
নির্বাচনে অংশ নেবেন না এমন শিক্ষার্থীদের মাঝেও রয়েছে অনিশ্চয়তা। কেউ মনে করছেন রাকসুর মাধ্যমে রাজনীতির নামে দখলবাজি ও সহিংসতা ফিরে আসতে পারে, যা শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত করবে।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সোহেলি মুত্তাকি বলেন, “ছাত্রদের নেতৃত্ব থাকা দরকার, কিন্তু সেটা যদি দলীয় নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনো লাভ হবে না। আমরা কোনো সংঘাত চাই না, শুধু প্রতিনিধিত্ব চাই।”
রাকসুও রুয়ার মত হবে কি-না জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ফরিদ খান বলেন, “রুয়া প্রাক্তনদের প্ল্যাটফর্ম, রাকসু বর্তমান শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকাশের জায়গা। দুটোই অরাজনৈতিক হলেও বাস্তবতা হচ্ছে রাজনীতি ঢুকে যায়। যেকোনো যৌক্তিক দাবি বিবেচনা করা হবে, তবে নিয়ম বহির্ভূত দাবি মানা হবে না।”
রাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার অধ্যাপক আমজাদ হোসেনের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনও মন্তব্য করেননি।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার তিন বছর পর প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৫৬-৫৭ সালে। সেই সময় এই সংসদের নাম ছিল ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (রাকসু)। ১৯৬২ সালে ‘কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ’ নামে যাত্রা শুরু করে। এরপর রাকসু নির্বাচন হয়েছে ১৬ বার। সবশেষ নির্বাচন হয়েছিল ১৯৮৯ সালে।