Published : 12 Jul 2026, 01:20 AM
বিশ্বসাহিত্যের দুই মহীরুহ লিও তলস্তয় এবং ফিওদর দস্তয়েভস্কি, যাদের নাম ছাড়া রুশ সাহিত্যের ইতিহাস অপূর্ণ। তারা একই সময়ে রাশিয়ায় অবস্থান করেও কেন কখনো একে অপরের মুখোমুখি হননি, তা আজও সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিস্ময়।
এই দুই লেখকের জীবন ছিল যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি তাদের জীবনদর্শন ছিল একে অপরের থেকে আলাদা। অথচ তারা একে অপরের লেখা নিয়মিত পড়তেন এবং মনে মনে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধও পোষণ করতেন। তাদের দেখা না হওয়ার বিষয়টি কেবল কাকতালীয় ঘটনা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে ছিল ভৌগোলিক দূরত্ব, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এবং আদর্শিক সংঘাত।
লিও তলস্তয় ছিলেন অভিজাত রুশ জমিদার পরিবারের সন্তান। ১৮২৮ সালে জন্ম নেওয়া এই লেখক ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ এবং ‘আনা কারেনিনা’র মতো কালজয়ী উপন্যাসের মাধ্যমে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। আভিজাত্যের মধ্যে বড় হওয়া তলস্তয় তার জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন মস্কো থেকে দূরে তার পৈতৃক জমিদারি ‘ইয়াসনায়া পলিয়ানা’তে।
তিনি ছিলেন অনেকটা নিভৃতচারী; লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে কৃষকদের জীবন এবং আধ্যাত্মিক সংকটের সমাধান খুঁজতেই তিনি বেশি পছন্দ করতেন। জীবনের শেষভাগে তিনি এতটাই বৈরাগ্যভাবাপন্ন হয়ে পড়েছিলেন যে, খোদ রাশিয়ার চার্চ তাকে ধর্মচ্যুত করেছিল। তার কাছে ধর্ম ছিল মানুষের যুক্তিবোধ এবং নৈতিকতার প্রকাশ।
অন্যদিকে, ১৮২১ সালে জন্ম নেওয়া ফিওদর দস্তয়েভস্কির জীবন ছিল তলস্তয়ের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি ছিলেন সংগ্রামের প্রতীক। তার জীবনে নেমে এসেছিল ভয়াবহ বিপর্যয়; রাজনৈতিক অপরাধে তাকে সাইবেরিয়ায় বছরের পর বছর কারাদণ্ড ও কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। এমনকি একবার তাকে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নাটকও করা হয়েছিল।
এই কষ্টদায়ক অভিজ্ঞতা তার লেখায় মনস্তাত্ত্বিক রূপ নিয়ে ধরা দিয়েছিল। ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ কিংবা ‘দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ’-এর স্রষ্টা দস্তয়েভস্কি বিশ্বাস করতেন যে, মানুষের মুক্তি কেবল যিশুর প্রতি অটল বিশ্বাস এবং যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে শুদ্ধ হওয়ার মধ্যেই নিহিত। তিনি ছিলেন শহুরে মানুষ, সেন্ট পিটার্সবার্গের অলিগলি ছিল তার গল্পের পটভূমি।
ভৌগোলিক কারণেই এই দুই লেখকের সরাসরি দেখা হওয়ার সম্ভাবনা ছিল ক্ষীণ। তলস্তয় যখন সেন্ট পিটার্সবার্গে আসতেন, তখন দস্তয়েভস্কি হয়তো সেখানে থাকতেন না। আবার তলস্তয় তার জমিদারিতে এতটাই ব্যস্ত থাকতেন যে, যারা তার সঙ্গে দেখা করতে চাইতেন, তাদেরকেই শত মাইল পথ পাড়ি দিয়ে তার কাছে আসতে হতো।
১৮৮০ সালে যখন মস্কোতে মহাকবি আলেকজান্ডার পুশকিনের স্মৃতিসৌধ উন্মোচন করা হয়, তখন রাশিয়ার সব প্রথিতযশা সাহিত্যিক সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। দস্তয়েভস্কি সেখানে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ বক্তৃতাগুলোর একটি দেন। অনেক অনুনয় বিনয় সত্ত্বেও তলস্তয় সেই অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। অনেকের ধারণা, তলস্তয় জানতেন সেখানে দস্তয়েভস্কি থাকবেন, এবং সম্ভবত তিনি সেই মুহূর্তে দস্তয়েভস্কির মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের মুখোমুখি হওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না।
তাদের দেখা না হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় সুযোগটি এসেছিল ১৮৭৮ সালে। সেন্ট পিটার্সবার্গে দার্শনিক ভ্লাদিমির সোলোভিয়েভের একটি বক্তৃতা অনুষ্ঠানে দুজনই একই হলঘরে উপস্থিত ছিলেন। কাছাকাছি দূরত্বে বসে থাকলেও কেউ জানতেন না যে অন্যজন সেখানে আছেন। তাদের দুজনেরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন দার্শনিক নিকোলাই স্ট্রাখভ। স্ট্রাখভ চাইলে তাদের পরিচয় করিয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু রহস্যজনকভাবে তিনি তা করেননি।
পরবর্তীকালে গবেষকরা মনে করেন, স্ট্রাখভ হয়তো নিজেই চেয়েছিলেন এই দুই মহারথীর মাঝে একমাত্র সেতুবন্ধন হয়ে থাকতে। দস্তয়েভস্কির ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি তলস্তয়ের জমিদারিতে গিয়ে দেখা করেননি, কারণ তিনি কিছুটা সংকোচ বোধ করতেন। দস্তয়েভস্কি একবার তলস্তয়ের এক আত্মীয়ার কাছ থেকে তার আধ্যাত্মিক চিন্তার কিছু চিঠি পড়ে শিউরে উঠেছিলেন এবং বলেছিলেন, “না, এমনটা হতে পারে না!” কারণ তলস্তয়ের যুক্তিনির্ভর ধর্মচিন্তা দস্তয়েভস্কির আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল।
দস্তয়েভস্কির মৃত্যুর মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে এই চিঠি পড়ার ঘটনাটি ঘটেছিল। ১৮৮১ সালে যখন দস্তয়েভস্কি মারা যান, তখন তলস্তয় শূন্যতা অনুভব করেন। দস্তয়েভস্কির সঙ্গে কোনোদিন দেখা না হওয়া সত্ত্বেও তলস্তয় তার বন্ধু স্ট্রাখভকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন যে, দস্তয়েভস্কির মৃত্যুতে তিনি বুঝতে পারছেন এই মানুষটিই ছিল তার সবচেয়ে কাছের এবং প্রয়োজনীয় একজন।
তলস্তয় দস্তয়েভস্কিকে কখনও প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবেননি, বরং তাকে ভাবতেন এমন এক আলোকবর্তিকা হিসেবে যার সঙ্গে তার অনেক বিষয়ে অমিল থাকলেও সংযোগ ছিল। দস্তয়েভস্কির মৃত্যুর পর তার স্ত্রী আন্নার সঙ্গে তলস্তয়ের দেখা হয়েছিল এবং সেখানে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে দস্তয়েভস্কির প্রতি তার অনুরাগের কথা জানিয়েছিলেন।
এভাবেই রুশ সাহিত্যের এই দুই নক্ষত্র আকাশপথে একে অপরের সমান্তরালে চলেছেন, একে অপরের আলোয় আলোকিত হয়েছেন, কিন্তু পৃথিবীর মাটিতে তাদের আর করমর্দন করা হয়ে ওঠেনি। বলা হয়, এটি আধুনিক সাহিত্যের ইতিহাসে অন্যতম এক ‘সুন্দর অথচ বিষাদময় অতৃপ্তি’ হয়ে রয়ে গেছে।
সূত্র: গেটওয়ে টু রাশিয়া