Published : 11 Jul 2026, 11:37 PM
বৃষ্টি অনেকটাই কমেছে। পাহাড়ি ঢলের তীব্রতাও আগের মতো নেই। কিন্তু দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে পানি নামছে ধীর গতিতে।
কোথাও কোথাও মানুষ টানা কয়েকদিন ধরে ঘরবন্দি, সড়ক পানির নিচে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অপেক্ষা যেন দীর্ঘই হচ্ছে।
দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার জন্য শুধু অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলই দায়ী নয়, এমন অভিযোগ এখন স্পষ্টভাবে সামনে আনছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, স্থানীয় প্রশাসন এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।
তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী মাছের ঘের, লবণচাষ ও মাছ ধরার জাল রক্ষার স্বার্থে কোথাও কোথাও ইচ্ছাকৃতভাবে স্লুইস গেইট বন্ধ বা আংশিক বন্ধ করে রাখছে। পাশাপাশি খালের ওপর তৈরি করা হয়েছে অসংখ্য অবৈধ বাঁধ। ফলে ভাটার সময়ও বন্যার পানি স্বাভাবিক গতিতে সাগরে নামতে পারছে না।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বন্যায় জেলার ১০টি উপজেলার অন্তত ১৫০টি গ্রামের তিন লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এর মধ্যে চকরিয়া, পেকুয়া, ঈদগাঁও, রামু, সদর, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। অনেক স্থানে পানি কমলেও নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা রয়ে গেছে।
পানি নামার পথ কোথায় আটকে যাচ্ছে?
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ হলো সাংগু ও মাতামুহুরী নদী। বান্দরবানের পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢল এই দুই নদী হয়ে মহেশখালী চ্যানেল দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে।
নদীর সঙ্গে যুক্ত শত শত খালও এই প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার অংশ। এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হচ্ছে উপকূলীয় স্লুইস গেইট।
এসব গেইটের উদ্দেশ্য হল- জোয়ারের সময় লবণাক্ত সমুদ্রের পানি ভেতরে ঢুকতে না দেওয়া এবং ভাটার সময় উজানের বৃষ্টির পানি দ্রুত বের করে দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) তানজীর সাইফ আহমেদ বলেন, মানুষের তৈরি প্রতিবন্ধকতার কারণে এবারের বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
তিনি বলেন, পাউবোর কর্মীরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে স্লুইস গেইট খুলে দিলেও পরে আবার সেগুলো বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
তার ভাষ্য, “কিছু এলাকায় প্রভাবশালী স্থানীয় গোষ্ঠী কাঠের গুঁড়ি ও তক্তা দিয়ে স্লুইস গেইট আটকে রাখছে, যাতে মাছের ঘের ও লবণক্ষেতে পানি ধরে রাখা যায়। এতে বন্যার পানি দ্রুত নামতে পারছে না।”
তানজীর সাইফ বলেন, শুধু স্লুইস গেইট নয়, মাছ চাষের জন্য অনেক খালের ওপরও অবৈধ বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। ভারি বৃষ্টির সময় এসব বাঁধের কারণে পানি স্লুইস গেইট পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারে না।
কয়েক দিনে প্রশাসনের সহায়তায় এমন অনেক বাঁধ কেটে দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
‘স্লুইস গেইট লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে’
পেকুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. শাফায়েত আজিজ রাজু বলেন, চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী অঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার সঙ্গে স্লুইস গেইট ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের সমস্যা জড়িয়ে আছে।
তার ভাষ্য, “এক সময় প্রতিটি স্লুইস গেইট পরিচালনার জন্য সরকারিভাবে ‘খালাসি’ নিয়োগ দেওয়া হত। তাদের থাকার জন্য আলাদা ঘরও ছিল। কিন্তু সেই ব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ার পর স্থানীয়ভাবে লোক নিয়োগ দিয়ে স্লুইস গেইট পরিচালনা করা হচ্ছে।
“তাদের পারিশ্রমিকের একটি অংশ আসে লবণ চাষিদের কাছ থেকে আদায় করা চাঁদা এবং স্লুইস গেইটে মাছ ধরার জাল বসানোর সুযোগ থেকে।”
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্লুইস গেইটের নিয়ন্ত্রণ একটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে বলে দাবি করেছেন রাজু। তার অভিযোগ, মাছ ধরার সুবিধা পেতে অনেক ক্ষেত্রে স্লুইস গেইটে জাল বসানো হয়, ফলে পানি নিষ্কাশনের গতি কমে যায়।

এতে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং উজানের পুকুর ও মাছের ঘের থেকে ভেসে আসা মাছ ওই জালে আটকা পড়ে বলে জানান সাবেক এই চেয়ারম্যান।
তিনি দাবি করেন, স্লুইস গেইট ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ধাপে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজু সাতটি সুপারিশ তুলে ধরেছেন। এগুলো হলো- স্লুইস গেইট ব্যবস্থাপনায় সংস্কার, পুরোনো ও অকার্যকর স্লুইস গেইট পুনর্নির্মাণ, সংশ্লিষ্ট খাল পুনঃখনন, খালের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, খালে বর্জ্য ফেলে ভরাট বন্ধ, সরকারি খালে অবৈধ জাল বসানো বন্ধ এবং টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ।
ডেমশিয়ার স্লুইস গেইটে যা দেখা গেল
মাতামুহুরী এলাকার সাংবাদিক আলাউদ্দিন আলো শুক্রবার রাতে চকরিয়ার বদরখালী ইউনিয়নের ডেমশিয়া এলাকার একটি পাঁচ ভেন্টের স্লুইস গেইটে গিয়ে যা দেখেছেন, তা এই অভিযোগকে আরও জোরাল করেছে।
তার বর্ণনায়, পাঁচ ভেন্টের গেইটটির নিচের চার ফুট এবং ওপরের চার ফুট কাঠের তক্তা দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। মাঝখানে মাত্র চার ফুট খোলা রাখা হয়। উদ্দেশ্য ছিল পানির স্রোত কমিয়ে গেইটের সামনে বসানো মাছ ধরার জাল অক্ষত রাখা।
আলাউদ্দিন আলোর দাবি, মাত্র তিন ঘণ্টায় ওই গেইট থেকেই প্রায় নয় লাখ টাকার মাছ ধরা হয়েছে।
তিনি বলেন, “মাছের জন্য পানি আটকে রাখা হচ্ছে। কিন্তু এর মূল্য দিচ্ছে উজানের লাখো মানুষ। তাদের ঘরে এখনও হাঁটু কিংবা কোমরসমান পানি।”
তার অভিযোগ, শুধু এই একটি গেইট নয়, আশপাশের আরও কয়েকটি খালের স্লুইস গেইটও একইভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
প্রশাসনের অভিযানের পর আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে গেইট
চকরিয়া ও মাতামুহুরী এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহীন দেলোয়ার বলেন, অভিযোগ পেলেই প্রশাসন ঘটনাস্থলে গিয়ে স্লুইস গেইট খুলে দিচ্ছে।
তবে সরকারি কর্মকর্তারা চলে যাওয়ার পর আবারও কিছু মানুষ গেইট বন্ধ করে দিচ্ছে বলেও স্বীকার করেন তিনি।
তিনি বলেন, “স্লুইস গেইট পরিচালনার একটি নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। জোয়ারে বন্ধ থাকবে, ভাটায় খুলে দিতে হবে। কিন্তু ব্যক্তি স্বার্থে সেই নিয়ম ভঙ্গ করা হচ্ছে।”
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম (ইউএনও) বলেন, উপকূলের তিনটি ইউনিয়নে সাধারণত দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকে না।
“এবার কিছু এলাকায় স্লুইস গেইট বন্ধ থাকায় পানি নামতে দেরি হচ্ছে। আমরা নিয়মিত নজরদারি করছি।”

এমপির নির্দেশনা: স্লুইস গেইট বন্ধ রাখলে প্রশাসনকে জানান
বন্যার পানি নিষ্কাশনের পথে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে স্লুইস গেইট বন্ধ রাখলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন কক্সবাজার-৩ (সদর–রামু–ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুতফুর রহমান কাজল।
তিনি বলেন, “কেউ যদি পানি বের হওয়ার স্লুইস গেইট বন্ধ রাখে, প্রশাসন অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানান। জলাবদ্ধতা নিরসনে স্লুইস গেইট অবশ্যই খোলা রাখতে হবে।”
তবে স্থানীয়দের মতে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গত দুই দশকে নানা কারণে দুর্বল হয়েছে।
খাল ভরাট ও দখল, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, মাছের ঘের তৈরির জন্য খালের ওপর বাঁধ, অপরিকল্পিত বসতি, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ অবকাঠামো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি- সব মিলিয়ে এই অঞ্চলের বন্যা এখন আগের চেয়ে বেশি স্থায়ী হচ্ছে।
তাদের মতে, স্লুইস গেইটগুলো যদি প্রকৌশলগত নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত না হয়, তাহলে পুরো নিষ্কাশন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে।
দুর্ভোগের মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ
চকরিয়া, পেকুয়া, ঈদগাঁও, মহেশখালী ও সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় এখনও হাজার হাজার পরিবার ঘরে ফিরতে পারেনি। বীজতলা হারিয়েছেন কৃষক, ভেসে গেছে চিংড়িঘের, দোকানপাট বন্ধ, অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই তারা মেনে নেন। কিন্তু যদি মানুষের সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিস্বার্থের কারণে পানি আটকে থাকে, তাহলে সেই দুর্ভোগ মেনে নেওয়া কঠিন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং প্রশাসনের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট, শুধু অতিবৃষ্টিই নয়, পানি নামার পথে মানুষের তৈরি বাধাও এবারের জলাবদ্ধতাকে দীর্ঘ করেছে।
এখন প্রশ্ন উঠছে, যেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ব্যক্তি স্বার্থে স্লুইস গেইটের স্বাভাবিক পরিচালনায় হস্তক্ষেপ করছে কিংবা খালের ওপর অবৈধ বাঁধ নির্মাণ করছে, তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
কারণ দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বর্ষা আবার আসবে। কিন্তু প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ যদি চলতেই থাকে, তাহলে পরবর্তী বন্যাতেও একইভাবে পানিতে আটকে পড়তে পারে লাখো মানুষ।